অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।


০৩ জুন, ২০২২ ০৫:৪৯ পিএম

শিশুর চিকিৎসা করতে হলে নিজেকেই শিশু হয়ে যেতে হয়

শিশুর চিকিৎসা করতে হলে নিজেকেই শিশু হয়ে যেতে হয়
একজন ডাক্তারের দুটি বিশেষ দিক আছে, সে একজন গবেষক ও একজন শিক্ষক। ছবি: মেডিভয়েস

কিছু কিছু ঘটনা একজন চিকিৎসক তথা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মাইলফলক হয়ে থাকে। তেমনই কয়েকটি ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমি তখন নিওন্যাটালজির বিভাগীয় প্রধান।

ওই বছরের ২৩ জুলাই মাগুরায় এক মহিলা গুলিবিদ্ধ হন। তিনি তখন ছিলেন গর্ভবতী। তার ইমারজেন্সি সিজার অপারেশন করা হয়। কিন্তু তার কন্যাসন্তানও ছিল গুলিবিদ্ধ। বুলেট শিশুটির ডান কাঁধ ভেদ করে ডান চোখও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। প্রচণ্ড জন্ডিস আর সেপসিস নিয়ে শিশুটি পৃথিবীতে এলো। শিশুটি যে বাঁচবে তা মাগুরার ডাক্তাররা আশা করেননি। শেষ ভরসা হিসেবে তাকে পাঠানো হল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঘটনাটি দেশে বিদেশে বেশ আলোড়ন তৈরি করে। 

শিশুটির জন্য নবজাতক ওয়ার্ডে বিশেষ বেডের ব্যবস্থা করা হলো। শুধু নিওন্যাটালজি বিভাগই নয়, পেডিয়াট্রিকস সার্জারিসহ পুরো পেডিয়াট্রিকস বিভাগ তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করলো শিশুটিকে বাঁচাতে। দুজন নার্স নিয়োগ করা হলো, যাদের কাজ ছিল শুধু ওকে পর্যায়ক্রমে সার্বক্ষণিক মনিটর করা। 

আমি প্রতিদিন ভোর ৬টায় হাসপাতালে চলে যেতাম। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ফলোআপ নিতাম। রাতে বাসায় যাবার আগে আরেকবার ফলোআপ নিয়ে যেতাম। যেই কয়দিন শিশুটি আমাদের চিকিৎসাধীন ছিল,আমি একটা রাতও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। 

চাঞ্চল্যকর ঘটনা হওয়ায় ওর ওয়ার্ডের সামনে সারাদিন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার আর সাংবাদিকের ভিড় লেগেই থাকতো। সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও আসতেন। 

ওর বেডের চারপাশে আমি তিন হাত রেডিয়াসের একটা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিলাম, যাতে কেউ খুব কাছে না চলে আসে। তারপরেও যেকোনো সময় ইনফেকশন হয়ে যাবার একটা ভয় থেকেই যেত। 

দীর্ঘ ২ সপ্তাহ যমে-মানুষে টানাটানি চললো এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরাই জিতে গেলেন। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকেরা এমন একটি কাজ করে দেখালেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। প্রায় এক মাস পর আমরা শিশুটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হলাম। তার নাম রাখা হলো ‘সুরাইয়া’।

এই ঘটনার প্রায় এক মাস পরে আমি আরেকটি স্মরণীয় কেস পাই। ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের কাছে কয়েকটা বাচ্চা খেলা করার সময় দেখে, একটা ঝোপের মধ্যে কয়েকটা কুকুর একটা বস্তা নিয়ে টানাটানি করছে। কৌতূহলের বশে দেখতে গেলে বস্তার মধ্যে তারা এক নবজাতক কন্যা শিশুকে পায়। 

কুকুরগুলো বাচ্চাটার শরীরের জায়গায় জায়গায় খুবলে খেয়ে নিয়েছিল। ঢাকা মেডিকেলে আনার পর বাচ্চাটিকে ঠিক সেই বেডেই রাখা হয়, যেখানে এক মাস আগে সুরাইয়া ছিল। বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচারের পর আমরা শিশুটিকে বাঁচাতে সক্ষম হই। ওর নাম আমরা দেই ‘ফাইজা’, যার অর্থ হলো বিজয়ী। 

বাচ্চাটার মা-বাবাকে পাওয়া যায়নি, আমরা ওকে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করি। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ফাইজা ওর নতুন মা-বাবাকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।

একটা বাচ্চার চিকিৎসা করা অনেকাংশেই একজন প্রাপ্তবয়স্কের চাইতে কঠিন। বাচ্চারা তাদের সমস্যার কথা ঠিক মতো বুঝিয়ে বলতে পারে না। অনেকেই আবার ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পায়। তাই একটি শিশুর চিকিৎসা করতে হলে নিজেকেই শিশু হয়ে যেতে হয়। আমার কাছে যে বাচ্চারা আসে, তাদের সাথে আমি প্রায়ই মাটিতে বসে যাই। তাদের সাথে খেলি, দুষ্টামি করি। এতে করে তাদের যেমন ভয়টা কেটে যায়, তেমনি আমার সাথে তাদের একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে ওঠে।

একজন ডাক্তারের দুটি বিশেষ দিক আছে, সে একজন গবেষক ও একজন শিক্ষক। ইন্টার্নশিপের সময় থেকেই আমাকে গবেষণার নেশা পেয়ে বসে। ইন্টার্নশিপ শেষ করার পরপরই আমার প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়  ‘বাংলাদেশ জার্নাল অফ চাইল্ড হেলথ’ এ। রিসার্চটা করি ‘ক্যাট স্ক্র‍্যাচ ডিসিস’ এর উপরে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমার প্রথম রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হয় সৌদি আরবের রয়্যাল কিডনি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড ট্রান্সপ্লানটেশন বুলেটিনে,বিষয় ছিল পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস। এরপর ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, কয়েক মাস পর পর একটা করে পেপার না বের করলে আমার ভালো লাগতো না। এ পর্যন্ত দেশী বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে আমার প্রায় নব্বইটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। জনসাধারণের জন্য বাংলায় স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখা মোট ৫টি। মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও বই লিখেছি দুটো। এ পর্যন্ত স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীদের গাইড করার জন্য লেখা থিসিস/ডিসারটেশনের সংখ্যা ৫০ এর অধিক। ২০১৪ সালে আমার সৌভাগ্য হয় জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হারের ওপর একটি পেপার রিড করার।

একজন চিকিৎসকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, শিক্ষক হিসেবে ভবিষ্যৎ চিকিৎসক তৈরি করা। বাংলাদেশের যারা মেডিকেলে পড়তে আসে, তারা সবাই কমবেশি মেধাবী। সমস্যা হলো, আমাদের চর্চার জায়গায়। বই থেকে আমরা যা পড়ি তা হলো পরোক্ষ জ্ঞান। বই থেকে কোন কিছু শেখার পর সেটা নিয়ে অবশ্যই নিজেদের মতো করে চিন্তা করতে হবে, ব্রেইনস্টর্মিং করতে হবে ও তার প্রয়োগ থাকতে হবে। এভাবেই তৈরি হবে- ‘ফরমেটিভ লার্নিং’। 

শিক্ষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল শিক্ষার্থীদের মৌলিক গবেষণায় উৎসাহিত করা। এই দিকটি আমাদের মননে এখনো অবহেলিত। মৌলিক গবেষণা ও প্রকাশনা বাড়লে আমাদের নিজস্ব ডাটা তৈরি হবে, বিদেশের ডাটার উপর নির্ভরশীলতা কমবে। গবেষণায় আমাদের শিক্ষার্থীদের যে অনাগ্রহ, তা দূর করার দায়িত্ব শিক্ষকদেরই নিতে হবে। শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, জ্ঞান তৈরিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। এভাবেই তৈরি করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের, যাতে বৈশ্বিকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠে তারা।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত