০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০১:০৩ পিএম

ওষুধের মান ও দামে নিয়ন্ত্রণ নেই প্রশাসনের

ওষুধের মান ও দামে নিয়ন্ত্রণ নেই প্রশাসনের

রাজধানীর মিটফোর্ড রোডে সারি সারি কেমিক্যালের দোকান। বেশির ভাগই ওষুধ তৈরির কাঁচামালের।

 

কোথাও বা ফুটপাতের ওপর পসরা সাজিয়ে বসেছে বিক্রেতারা। ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ—কোনো ওষুধের কাঁচামালের কমতি নেই। আর এসব কাঁচামালের ক্রেতা বিভিন্ন ওষুধ তৈরির ছোটবড় কারখানা। শুধু তাই নয়, এখানে অবাধে মেলে ভেজাল ও নকল ওষুধ।

 

র‌্যাব-পুলিশ আর ঔষধ প্রশাসনের কদাচিৎ অভিযানে অবৈধ কাঁচমাল বা ভেজাল ওষুধের রমরমার প্রমাণ মেলে। পুরান ঢাকার ওই অঞ্চল বাদ দিলেও দেশের অন্যান্য  স্থানের  ফার্মেসিতে থাকা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন চারদিকে। রোগ থেকে বাঁচার জন্য ওষুধ খেতে গিয়ে ওই ওষুধই এখন মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

বিষাক্ত প্যারাসিটামলে ২৮ শিশু হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা থেকে সম্প্রতি রিড ফার্মার সব আসামি খালাস পাওয়ার পর শুধু ওষুধের মান নিয়েই নয়, ঔষধ প্রশাসনের বহুমুখী ব্যর্থতার চিত্র নতুন করে ফুটে উঠেছে।

 

দেশের ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন করতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনীর উদ্দীন পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। বললেন, ‘এককথায় বলতে গেলে কিছুই দেখে না ঔষধ প্রশাসন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘কোন ওষুধ বানাতে চান আপনি? সবই পাবেন হাতের নাগালে। কাঁচামালের অভাব নেই ঢাকার মিটফোর্ড মার্কেট কিংবা ফুটপাতের ছোটখাটো দোকানে! কিভাবে এসব কাঁচামাল মিটফোর্ডে যায়?’

 

ড. মুনীর জানান, ঔষধ প্রশাসন এতটাই অকার্যকর যে কোন কম্পানি কোন আইটেমের কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন নেয় আর কতটুকু আমদানি করে কিংবা আমদানীকৃত কাঁচামালের কতটুকু নিজেরা ব্যবহার করে, কতটুকু চোরাপথে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়, এর কোনো হিসাব নেই। কোনো মনিটরিং নেই।

 

ওষুধ কম্পানির পক্ষ থেকে ঔষধ প্রশাসনের কাছে যে কাগজ ধরিয়ে দেয়, সেটাই সব। ফলে এক শ্রেণির অসাধু ওষুধ কম্পানি বিভিন্ন ওষুধ তৈরির লাইসেন্স নিয়ে বিদেশ  থেকে কাঁচামাল এনে নিজেরা নামমাত্র ওষুধ বানায়, বাকি  কাঁচামাল অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে ওই কাঁচামালে ভেজাল মিশিয়ে অনেকেই তৈরি করে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। ওই ভেজাল কাঁচামাল আবার প্রকাশ্যে বিক্রিও হয়।

 

ওই ওষুধ বিশেষজ্ঞের এমন তথ্যের সঙ্গে সহজেই মিলে যায় চিকিৎসকদের মতামতও। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়েই বললেন, ‘ওষুধে কাজ না হলে মানুষ দোষ দেয় আমাদের, ডাক্তারের; কিন্তু ওষুধের মান যদি ঠিক না থাকে, তাহলে ডাক্তারের কী করার আছে, ডাক্তার কি আর ওষুধ বানিয়ে দেয়?’

 

কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিচু গলায় বলেন, ‘ভাই, আমার নামটা লেইখেন না। বোঝেন তো সরকারি চাকরি করি, আর অল্প কিছুদিন চাকরি আছে, ওষুধ কম্পানির লোকেরা এতটাই প্রভাবশালী যে তারা আমাকে চাইলে যেকোনো ক্ষতি করে ফেলতে পারে। ’

 

একই কক্ষে বসা আরেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গলা বাড়িয়ে বলেন, ‘আপনারা তো কথায় কথায় বলেন—কেন আমরা বেশি বেশি ওষুধ লিখি আর বেশি পাওয়ারের ওষুধ দিই! আরে ভাই, কম ওষুধে কাজ হতে চায় না। মানুষ উপকার পায় না। ওষুধের মান যদি ঠিক রাখা না যায়, তবে বেশিসংখ্যক আর বেশি পাওয়ারের ওষুধ না দিয়ে উপায় থাকে না। ’

 

প্রায় একই ধরনের কথা বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য।

 

তিনি সরকারের ওষুধ প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার বিষয়ে নজরদারি যদি সংসদীয় কমিটির করতে হয়, তবে সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাজ কী!’ তিনি আরো যোগ করলেন, ‘আমাদের গঠিত বিশেষজ্ঞ টিমের সদস্যরা যেসব তথ্য বের করে এনেছেন তাতে তো মনে হয় ওষুধ কম্পানিগুলোর চেয়ে বেশি সমস্যা আসলে ওষুধ প্রশাসনের ভেতরে।

 

ওই প্রতিষ্ঠানের লোকজনই একশ্রেণির ওষুধ কম্পানিকে নিম্নমানের ওষুধ প্রস্তুতে প্রশ্রয় দিয়েছেন। নয়তো এসব কম্পানি কী করে বছরের পর বছর ধরে এমন ভয়াবহ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে?’

 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ফাইল ঘেঁটে বলেন, ‘বছরের পর বছর কেবল কি নিম্নমানের ওষুধ বানানোর প্রশ্রয়ই দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর? কতগুলো কম্পানির লাইসেন্সের মেয়াদ বহু আগে শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো নবায়ন হয়নি।

 

কিন্তু তারা ঠিকই ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাত—সব কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। কোনোটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১০ বছর আগে আবার কোনোটির শেষ হয়েছে দুই-তিন বছর বা দুই-তিন মাস আগে। আর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেবল সেগুলোতে লাল কালিতে চিহ্নিত করে দায়িত্ব শেষ করছে। ’

 

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্সের লাল তালিকা ধরে দেখা যায়, নামকরা ওষুধ প্রস্তুতকারী কম্পানি একমি স্পেশালাইজড ফার্মার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৩ সালের ১৭ মে। গত তিন বছরে তাদের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটি ঠিকঠাক মতোই চালাচ্ছে তাদের উৎপাদন, বিপণনসহ সব কাজ। বিধি অনুসারে দুই বছর পর পর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করার কথা।

 

একমি একাই নয়, অ্যালোপেথিক ওষুধের মোট লাইসেন্সপ্রাপ্ত ২৬৬ কম্পানির তালিকা রয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হাতে। তবে চালু আছে ২২০টি ওষুধ কম্পানি। বাকিগুলোর মধ্যে ৪২টি কম্পানিই মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে সম্প্রতি আদালতের নির্দেশ ও সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ বিভিন্ন কারণে লাইসেন্স বাতিল করা আরো ৪০টি কম্পানির লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে আরো আগেই।

 

জানতে চাইলে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একটি ওষুধ কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনেকেই লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়নের আবেদন করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধ প্রশাসনের লোকজন আমাদের নানা হাতিঘোড়া দেখায়। পরিদর্শনের নামে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পার করে দেয়। আর এর দায় পড়ে আমাদের ওপর। বিভিন্ন অজুহাতে ঝুলে থাকতে হয় আমাদের। ’

 

আরেকটি ওষুধ কম্পানির এক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরে বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো কিছু ওষুধ কম্পানি আমাদের কাছে কাঁচামাল নিয়ে আসে। অনেক কম দামে অফার দেয়। খোঁজ নিয়ে দেখি—ওই কম্পানির সেই কাঁচামালের কোনো ওষুধই মার্কেটে নেই। অর্থাৎ ওই কম্পানিটি ওষুধ তৈরি নামে কেবল কাঁচামাল এনে তা বিক্রির ব্যবসা করে।

 

কিন্তু এসব বিষয়ে ওষুধ প্রশাসনকে কখনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখিনি। ’

 

এদিকে ২৮ শিশুর হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা থেকে সম্প্রতি রিড ফার্মার সব আসামি আদালতে খালাস পাওয়ার পর ওষুধ প্রশাসনের ব্যর্থতার আরেক নজির মিলে যায়। আর আদালত থেকে এমন ব্যর্থতার কথা তুলে ধরায় অন্যান্য ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে এটাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টি এখন এটি বড় প্রশ্নবোধক হয়ে উঠেছে।

 

এর সঙ্গে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আগে থেকেই রয়েছে। এমনকি খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণহীন থাকায় বারবারই বিরক্তি প্রকাশ করছেন।

 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব বলেন, ওষুধে দেশ যতটা এগিয়েছে এর সাফল্য দেশের মানুষ ঠিক ওই মাত্রায় ভোগ করতে পারছে না ওষুধ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবে।

 

ওষুধ কম্পানিগুলো ওষুধকেও অন্য সব পণ্যের মতোই শুধু মুনাফার উপায় হিসাবে দেখে। তাদের এই মানসিকতার জন্যই আজ দেশের ওষুধের মান নিয়ে এত প্রশ্ন। সেই সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও।

 

সৌজন্যে: দৈনিক কালের কন্ঠ।

 

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি