১৬ এপ্রিল, ২০২২ ০৪:২৭ পিএম

ইন্টার্নশিপের সুযোগ বঞ্চিত কেয়ার মেডিকেলের ৩৬ চিকিৎসক, গভীর উৎকণ্ঠায় জীবন

ইন্টার্নশিপের সুযোগ বঞ্চিত কেয়ার মেডিকেলের ৩৬ চিকিৎসক, গভীর উৎকণ্ঠায় জীবন
ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তারা। পাচ্ছেন না কারও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা। এখন তাদের কান্না ছাড়া ভাষা নেই।

সাখাওয়াত হোসাইন: ছোটবেলা থেকে তুখোড় মেধাবী সবুজের (ছদ্মনাম) কিশোর বয়স থেকে স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। চমৎকার ফলাফল নিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করার পর অংশ নেন ২০১৫-১৬ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায়। তবে সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ না হওয়ায় ১৫ লাখের বেশি টাকা দিয়ে ভর্তি হন রাজধানীর বেসরকারি কেয়ার মেডিকেল কলেজে। পড়াশোনা কিছু দূর এগুনোর পর জানতে পারেন কলেজটির বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদন নেই।

এর পর থেকে তার দুই চোখে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। নিজের অসহায়ত্বের কথা জানাতে গিয়ে সবুজ মেডিভয়েসকে জানান, ‘বিএমডিসির অনুমতি না থাকায় গত অক্টোবরে এমবিবিএস পাস করেও ইন্টার্ন শুরু করতে পারছেন না। তার মতো কেয়ার মেডিকেল কলেজের ১৫-১৬ সেশনের মোট ৩৬ জন শিক্ষার্থী ইন্টার্ন করতে পারছেন না। ছয় মাসেরও বেশি সময় দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাচ্ছেন না কারও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা। এখন তাদের বোবা কান্না ছাড়া কিছুই নেই।

শিক্ষার্থীরা জানান, বিএমডিসির শর্ত অনুযায়ী, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, রোগী ও চিকিৎসক। কলেজটিতে ব্যাপক শিক্ষক সংকট, কলেজ থেকে হাসপাতালের দূরত্ব অনেক। কলেজ হাসপাতালটিতে ২৫০ শয্যা থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৭৯ শয্যা, সংকট রয়েছে আরও ৬১টি শয্যার। এসব কারণে বিএমডিসির অনুমোদন পাচ্ছে না কলেজটি। 

শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রতিষ্ঠার আট বছরেও এসব সংকট কাটানোর কোনো উদ্যোগও নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

তারা জানান, ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করার সুযোগ পেলেও শুরু থেকেই মেলেনি বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন। যদিও ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থীদেরকে করোনাসহ বিশেষ মানবিক দিক বিবেচনায় ২০২০ সালে ইন্টার্ন করার সুযোগ দিয়েছিল বিএমডিসি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিএমডিসির অনুমোদন না থাকার কথা জানার পর পরই অভিভাবকদের নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন তারা। কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দেন, এমবিবিএস শেষ হতে হতে তারা বিএমডিসির অনুমোদন পেয়ে যাবেন। কিন্তু মাস গিয়ে বছর গড়ায় তারপরও তারা অনুমোদন পায়নি। শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, হয় অনুমোদন না হয়, অন্য কলেজে মাইগ্রেশনের ব্যবস্থা করে দিবেন কর্তৃপক্ষ এবং এসব বিষয়ে তাদেরকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই অবস্থা থেকে সরে এসেছে কর্তৃপক্ষ। তারা এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাত্তাই দিচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বারবার কলেজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থানা পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এতে ৩৬ জন শিক্ষার্থীর মনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বিএমডিসি অনুমোদিত চিকিৎসক হওয়া নিয়ে।

এদিকে অনুমোদন বা মাইগ্রেশন নিশ্চিতের দাবি নিয়ে কলেজের চেয়ারম্যান বা অধ্যক্ষের কাছে গেলে তারা শিক্ষার্থীদের নানাভাবে এড়িয়ে চলছেন। তাঁরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, আবার ব্যস্ততার কথা বলে অন্যত্র চলে যান।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমস্যা সমাধানের জন্য অনুমোদন বা অন্য কলেজে মাইগ্রেশনের জন্য বিএমডিসি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে গেলে তাদেরকে বলা হয় বিএমডিসিতে যেতে, আবার বিএমডিসিতে গেলে বলে পরামর্শ দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে যাওয়ার। কিন্তু নানাজনের নানা পরামর্শে একেকবার একেক দিকে গেলেও কোনোভাবেই মিলছে না সমাধান। এমন ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন ইন্টার্ন প্রত্যাশী এসব নবীন চিকিৎসক।

দায় সাড়াভাব কলেজ কর্তৃপক্ষের

এসব বিষয় জানতে কেয়ার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. পারভীন ফাতেমার কাছে ফোন করা হলে তাঁর নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে কলেজটির অধ্যক্ষ ডা. ফারহানা সালামকে ফোন করলে মুঠোফোন রিসিভ করে প্রশ্ন করার সাথে সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। দুই দিন চেষ্টার পরও তাদের বক্তব্য সংগ্রহ করা যায়নি। 

পরে বিষয়টি নিয়ে কেয়ার মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. গোলাম মোর্শেদ সুমনকে ফোন দেওয়া হলে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, কেয়ার মেডিকেলের অনুমোদন নিয়ে বিএমডিসি সিদ্ধান্ত নিবে। আশা করি, ঈদের আগে সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। এটা বিএমডিসির অধীনে, সুতরাং সিদ্ধান্ত তারাই দিবে। বিএমডিসিই অনুমোদন দিবে। আলোচনা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাইতেই ফোন কেটে দেন ডা. সুমন।

মাইগ্রেশনের সম্ভাবনা ক্ষীণ 

জানতে চাইলে অন্য মেডিকেলে তাদের মাইগ্রেশনের সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এএইচ এম এনায়েত হোসেন। তিনি বলেন, বিএমডিসির নীতিমালা অনুযায়ী অন্য মেডিকেলে মাইগ্রেশন পাওয়ার যোগ্য হলে পাবে, আর না হয় তাদের কোনো মাইগ্রেশন হবে না। আর ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় পাস করে মাইগ্রেশন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যেহেতু তাদের বিএমডিসির অনুমোদন নেই, সেহেতু সেখান থেকেই অনুমোদন নিতে হবে। 

বিএমডিসির সঙ্গে সংযোগ নেই কেয়ার মেডিকেলের

অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অনুমোদনের জন্য তারা কখনোই আমাদের কাছে আসেনি। কেয়ার মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে বিএমডিসির কোনো সংযোগ নেই। এ নিয়ে তারা যোগাযোগও রাখছে না। কয়েকবার তাদের কলেজে অডিট করার জন্য পাঠানো হয়েছিল, রিপোর্ট ভালো আসেনি। অনুমোদনের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে আমাদের কাছে আবেদন করতে হবে। বিএমডিসিতে এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন করেনি তারা। কাউকে সেধে সেধে অনুমোদন দেওয়া যায় না। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভেবে দেখবো, অনুমোদন দেওয়া যায় কিনা।’

তিনি আরও বলেন, যাদেরকে বিএমডিসি সাময়িকভাবে অনুমোদন দেয়, তাদের নিয়ে এ সপ্তাহে সভা রয়েছে। তখন বোঝা যাবে কেয়ার মেডিকেলের ৩৬ শিক্ষার্থী বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন পাবে কিনা।

ডা. রওশন আরা বলেন, ‘শুনেছি এই মেডিকেল কলেজটি সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে, তারপর হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এখন শিক্ষার্থীরা সেখানে কেন ভর্তি হয়? শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল খোঁজ-খবর নিয়ে ভর্তি হওয়া।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি