০৮ এপ্রিল, ২০২২ ০৩:৫৯ পিএম

‘ইন্টারমিডিয়েট থেকে মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু’

‘ইন্টারমিডিয়েট থেকে মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু’
২০২১-২২ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় চতুর্থ সাদিয়া তাসনীম।

২০২১-২২ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে জাতীয় মেধায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছেন টাঙ্গাইলের মেয়ে সাদিয়া তাসনীম। বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বর্তমান অবস্থান রাজশাহী শহরে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী কলেজ থেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন সাদিয়া। মেডিভয়েসের সঙ্গে ফলাফলের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শোনালেন ভর্তি পরীক্ষায় বাজিমাত করার কৌশলের কথা। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, নিজের ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্যসেবা ঘিরে পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন। 

অনুভূতি

আলহামদুলিল্লাহ। খুবই ভালো লাগছে। মেডিকেল ভর্তিতে জাতীয় মেধায় চতুর্থ স্থান অধিকার। আমার স্কোর ৯১.২৫। ভালো কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, সঙ্গে ছিল নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা। সেটা করতে পেরেছি, সেজন্য স্রষ্টার প্রতি অনেক কতৃজ্ঞতা। প্রথম যখন ফলাফল শুনতে পাই, তখন আসলে...। অনেক বেশি খুশি ছিলাম। যেমনটা করতে চেয়েছিলাম, তেমনটা করতে পেরেছি।

সাফল্যের পেছনে 

সত্যিকার অর্থে আমার আমার সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। প্রথমত আমার বাবা-মা এবং আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।তারা আমার জন্য প্রতিনিয়ত দোয়া করেছেন। আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর পর শিক্ষকবৃন্দ, যাদের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে হয় তো কখনোই এ রকম একটি ফলাফল করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। অবদান রয়েছে আমার সহপাঠীদের। তারা সব সময় উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছে, সহযোগিতা করেছে। পড়াশোনায় যেসব সমস্যা হতো, তা ওদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের সহযোগিতায় নানা বিষয় শিখেছি। যে কোনো সংশয়ে পড়লেই আমরা পরস্পরকে আলোচনা করতাম। ওদের প্রতি আমি অনেক কতৃজ্ঞ।

ইন্টারমিডিয়েটেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু

এইচএসসির পড়া যখন শুরু করি, অর্থাৎ প্রথম বর্ষের পড়া; তখন ভাবতাম, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেবো এবং এতগুলো বই মনে গেঁথে নিয়ে পরীক্ষার হলে যেতে হবে। ভাবতাম, এ সাধ্য কিভাব সাধন করবো? এই চিন্তা চলমান থাকতে থাকতেই ভাবি, আমি যদি বুঝে না পড়ি, প্রতিটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকে, পাশাপাশি আমার বেসিক যদি মজবুত না হয়, তাহলে এতোগুলো বই মুখস্থ করে হলে যাওয়া সম্ভব না। তখন থেকেই বুঝে পড়ায় অভ্যস্ত হই। এই চর্চা থেকে যখন যে বিষয় পড়েছি, চেষ্টা করেছি, বুঝে পড়ার এবং সেখান থেকে মূল শিক্ষাটা সঞ্চয় করার। এভাবে প্রথম বর্ষ থেকেই মূলত ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিটা নেওয়া। আসলে একাডেমিক পড়াগুলো যদি ভালোভাবে বুঝে পড়ি, তাহলে ভর্তি পরীক্ষার অনেকটাই সম্পন্ন হয়ে যায়। সুতরাং এভাবে আমার প্রস্তুতি প্রাণবন্ত হয়।

মেডিকেলে পড়ায় অনুপ্রাণিত হওয়ার গল্প

ছোটবেলায় আমার ইচ্ছা ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো। খুব ছোটবেলায় বলে বেড়াতাম, আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবো। বড় হওয়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর আমার গন্তব্য কোথায় হবে? এটা আমার ব্যর্থতা, আমি এর উত্তর খুঁজে পেতাম না যে, তার পর কী করবো? বিপরীতে মেডিকেলে পড়ার পর কী করবো? এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে পরিষ্কার ছিল। জীবনের পুরো সময়টা কী করবো, তা নিজের কাছে পরিষ্কার করতে পেরেছিলাম। সে কারণেই এ চিকিৎসা পেশা বেছে নেওয়া।

এ ছাড়াও বিগত কয়েক বছরে আমার বেশ কয়েকজন স্বজনকে হারিয়েছি, যারা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আমার চাচা-চাচী মারা গেছেন ক্যান্সারে। এসএসসি পরীক্ষার পর ফুফু মারা যান। তিনি জটিল রোগী ছিলেন। আমার নানাকে হারিয়েছি, যিনি হার্টের রোগী ছিলেন। এ ধরনের কিছু কষ্ট নিজের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে মেডিকেল পড়ার ইচ্ছা।

ভর্তি পরীক্ষার সাফল্য ধরে রাখা

জীবনে প্রথম ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। সুতরাং এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে এ বিশ্লেষণটা করা সম্ভব না যে, কেউ কেউ কেন সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে পারে না? আমি সব সময় চেষ্টা করেছি, প্রত্যেকটা অর্জনকে একটি শূন্য হিসেবে ভাবতে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের একটি অধ্যায় সূচনা করতে যাচ্ছি এবং জীবনের আসল পড়াশোনা হয় তো এখন শুরু হবে। সাফল্যের ধারাটা ধরে রাখতে নিরন্তর চেষ্টা থাকবে। এজন্য আমি সবার কাছে দোয়া প্রার্থী।

মেডিকেল পড়ায় আগ্রহীদের প্রতি পরামর্শ

মেডিকেলে ভর্তিচ্ছু ছোট ভাই-বোনদের বলবো, যারা ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের পড়াশোনা শুরু করেছো, তোমরা সব সময় বুঝে ও গুছিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। যখন যে বিষয়টা পড়ছো সেটা বুঝে ফেলবে। পাশাপাশি সেটাকে গুছিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে, যাতে সংক্ষিপ্ত সময়ে এটা রিভিশন দিতে পারো। আর নিজের ওপর আস্থাশীল থাকো, স্রষ্টার প্রতি ভরসা রাখো। ইনশাল্লাহ, ভালো কিছু হবে।

চিকিৎসা পেশায় নিজেকে যে জায়গায় দেখতে চান

মানবদেহ বেশ রহস্যময়। এর যে কোনো বিভাগ নিয়েই কাজ করা হোক না কেন, সেখানেই ভালো কিছু করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার আগ্রহ হচ্ছে, অনকোলজি আর নিওরোসার্জারিতে। এর মধ্যে সার্জারি আমার অনেক বেশি পছন্দের। যেহেতু আমার পরিবারের অনেক সদস্যকে ক্যান্সারের কারণে হারিয়েছি, সেহেতু ইচ্ছা আছে এই সেক্টরটাতে কাজ করার।

স্বাস্থ্যসেবা ঘিরে আগামী দিনের পরিকল্পনা

আমরা সবাই মিলে দেশে একটি কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবো, যাতে রোগীরা বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করেন। আমরা যেন তাদের প্রয়োজনীয় সকল সেবা নিশ্চিত করতে পারি, কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দিতে পারি।

বেড়ে ওঠার গল্প

সাদিয়া তাসনীমের জন্ম রাজশাহীতে। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। বাবার চাকরির সুবাদে জীবনের কিছুটা সময় কেটেছে কুড়িগ্রামে। এর পরের সময় কেটেছে শেরপুরে।

শৈশবের কথা জানিয়ে জানিয়ে সাদিয়া বলেন, ‘ছোটবেলার বলতে স্মৃতি হাতড়ে শেরপুরই পাই। ওখানকার স্মৃতিগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। এর পর তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত রাজশাহীর গভমেন্ট পি এন গার্লস হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছি। তার পর রাজশাহী কলেজে পড়েছি।’

অবসর কাটে যেভাবে

সাদিয়া তাসনীম বলেন, গত কয়েক বছরে অবসর খুব কমই পাওয়া গেছে। অবসর বের করে নিতে হতো। এ সময়ে নির্ধারিত কোনো কাজ নেই। গল্পের বই পড়া, বিশেষ করে গোয়েন্দা কাহিনী, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীধর্মী বই ও শিক্ষামূলক বই, জীবনী পড়া। অ্যানিমেশন মুভি দেখা, গান শোনা, দাতব্য কাজের সম্পৃক্ত হওয়া। এভাবেই আমার অবসর কাটে।

সহপাঠ্যক্রমে সরব পদচারণা

স্কুল জীবন থেকেই নানা সহপাঠ্যক্রমে সরব সাদিয়া তাসনীম স্কুল এবং কলেজ জীবনেই একাধারে বিতর্ক, অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সমান সিদ্ধহস্ত। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত