ডা. জোবায়দা সুলতানা সুসান

ডা. জোবায়দা সুলতানা সুসান

কনসালটেন্ট, গাইনি ও প্রসূতি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


২৯ মার্চ, ২০২২ ০৪:৫৮ পিএম

জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি ও গর্ভধারণে সচেতনতা

জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি ও গর্ভধারণে সচেতনতা
স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ একই হলে গর্ভধারণে এবং গর্ভের শিশুর ত্রুটি হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই। ছবি: সংগৃহীত।

প্রাপ্ত বয়স্ক নবদম্পতি বিয়ের পরবর্তী যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে স্ত্রী গর্ভধারণ করতে পারেন। এতে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক কোনো সমস্যা হয় না। তবে শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতির জন্য নবদম্পতির কিছু সময় নেওয়া লাগতে পারে। এ সময় একটি উপযুক্ত জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। তাতে পরবর্তীতে সংসার জীবন সুন্দর ও গোছালো হবে।

বিয়ের পরই গর্ভধারণ করা উত্তম

প্রান্তিক পর্যায়ে বিয়ের পরপর নবদম্পতিদের ওপর পারিবারিক এবং সামাজিক একটি চাপে থাকে গর্ভধারণের জন্য। সেক্ষেত্রে কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, নব দম্পতির বয়স কিরকম, বিশেষ করে স্ত্রী; যিনি ভবিষ্যতে মা হবেন তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক কিনা, এ বিষয়টি দেখতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণত মেয়েদের ১৮ বছরের উপরে হলে প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে ধরা হয়। এজন্য ১৮ বছরের উপরে হলে স্ত্রীকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে তিনি একা নয়, সঙ্গে তার পরিবার, স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির পরিবার তাকে সহযোগিতা করতে হবে। 

দ্বিতীয়ত, স্ত্রীকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নতুন একজন স্ত্রী নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে। যখন মনে করবে, তিনি মানিয়ে নিতে পেরেছেন বা তিনি একান্নবর্তী পরিবারে থাকছেন ও সমর্থন আছে, এ পরিস্থিতিতে তিনি গর্ভধারণ করতে পারেন। কিন্তু যদি তার মানিয়ে নিতে সময় লাগছে, এখন আবার একজন সন্তান গর্ভধারণ করে তার নিজের পরিচর্যা ও পরবর্তীতে শিশুর যত্ন ঠিকভাবে নিতে পারবেন না, সেক্ষেত্রে তিনি সময় নিতে পারেন। সাধারণত ছয় মাস থেকে ২ বছর সময় নিলে কোনো সমস্যা নেই। তবে বিয়ের পাঁচ বছর পর গর্ভধারণ করলে জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘ বিরতি এবং বয়স বাড়ার কারণে, তখন গর্ভবতী মা ঝুঁকিপূর্ণ মায়ের তালিকায় চলে যায় । তাই বিয়ের পরই গর্ভধারণ করা উত্তম। 

পরামর্শ 

গর্ভধারণের পূর্বে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে হবে। আমাদের দেশে অধিকাংশ ভবিষ্যত মায়েদেরে রক্তশূন্যতা খুব চরম আকার ধারণ করে। যেটা অজানা থেকে যায়। গর্ভরাধণের পর মাকে যখন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় তখন ধরা পড়ে। এ পর্যন্ত যা হওয়ার তা হয়ে যায়। গর্ভধারণের পর মা যেনো সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক থাকে। এজন্য রক্ত, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে রক্তশূন্যতার বিষয়ে। আমাদের দেশে বর্তমানে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মেলিটাস (জিডিএম) চরম আকার ধারণ করেছে। এ ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। কারণ, সচেতনতার মাধ্যমে এ রোগ নিরাময় করা সম্ভব। 

জন্মবিরতিকরণ

মহিলাদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন নামের এক জাতীয় পদার্থ রয়েছে। এ প্রোজেস্টেরনের মাত্রা একেক জনের শরীরে একেক রকম থাকে, এটি নারীদের মাসিকের ওপর প্রভাব ফেলে। স্বল্পমাত্রার বড়িতে কিছু পরিমাণ ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন থাকে। ইনজেকশন ইমপ্ল্যান্ট মধ্যেও প্রোজেস্টেরন থাকে। ইনজেকশন ইমপ্ল্যান্ট নেওয়ার পর অনেক মায়েরা এসে অভিযোগ করেন, মাসের মাঝখানে একটু একটু করে রক্তপাত হচ্ছে, ওজন বেড়ে যাচ্ছে, মাথা ঘোরাচ্ছে, এ সামন্য সমস্যাগুলো হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসকরা কাউন্সিলিং করে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এগুলো খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক বিষয়। সাধারণ চিকিৎসার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা যায়। এর জন্য গর্ভনিরোধক বড়ি বা ইনজেকশন পরবর্তীতে জন্মবিরতিকরণ ও গর্ভধারণেও কোনো রকম অসুবিধে হবে না। এক্ষেত্রে কাউন্সিলিং একটি বড় ভূমিকা পালন করে। 

একেক জন দম্পতির জন্য একেক পদ্ধতি উত্তম। যেমন: স্বামী বিদেশ থাকেন বা একসঙ্গে থাকছেন না, তিনি হয়তো দুই-তিন বছর পরপর আসছেন, এক্ষেত্রে স্বল্পমাত্রার বড়ি এবং কনডম ব্যবহার সবচেয়ে উপযুক্ত। যারা নিয়মিত একসঙ্গে থাকেন তাদের জন্য তিন বছর বা পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ইমপ্ল্যান্ট’উপযুক্ত পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।

দম্পতির সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জন্মবিরতিকরণের সঠিক পদ্ধতির সম্পর্কে জ্ঞানদান করতে হবে। যেটি চিকিৎসক সমাজ ,পরিবার পরিকল্পনা ও চিকিৎসাসেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান করে থাকেন। জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি দুই প্রকার। যথা-১.স্বল্প মেয়াদি ২. দীর্ঘমেয়াদি। নবদম্পতিদের স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি ব্যবহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন: আমাদের দেশে সাধারণত বেশি ব্যবহার হয় জন্মবিরতিকরণ পিল। এটি খুব প্রচলিত রয়েছে। যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় এবং সেবনের পদ্ধতি সঠিকভাবে বুঝতে পারে তাহলে এর চেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি আর নেই। 

দ্বিতীয়ত, আরেকটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি হলো-কনডম ব্যবহার। এটিও খুব ভালো একটি পদ্ধতি। এটির সুবিধা হলো-প্রতিদিন ওষুধ গ্রহণের বিড়ম্বা নেই। এ ছাড়া আরও আছে বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন ‘ইমপ্ল্যান্ট। এর মধ্যে খুব স্বল্পমাত্রার একটি হরমোন দেওয়া থাকে। যেটি জন্ম নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এসকল পদ্ধতি যখন দম্পতি গর্ভধারণ করতে চাইবেন তখন বন্ধ করে দিলে সাথে সাথে গর্ভধারণ করতে পারবেন। এতে গর্ভধারণ ও গর্ভধারণ পরবর্তীতে কোনো অসুবিধা হবে না। এসব বিষয়ে নিয়ে নবদম্পতির সঙ্গে আলাপ করে পরমার্শ দিতে হয়। তাহলে বিরতিকরণ সমস্যা হয় না।  এজন্য কাউন্সিলিংয়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

স্বামী-স্ত্রীর একই রক্তের গ্রুপ সমস্যা নয়

বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে সকলের জ্ঞান থাকা উচিত। স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ একই হলে গর্ভধারণে এবং গর্ভের শিশুর ত্রুটি হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই। মানুষের রক্তে একটি প্রোটিন থাকে, যার নাম হলো ডিঅ্যান্টিজেন। এটি যার শরীরে থাকবে তাকে বলা হয় পজিটিভ রক্তের গ্রুপ, যার শরীরে থাকবে না তাকে বলা হয় নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ। গর্ভবতী মা যদি নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের হন আর স্বামী যদি পজিটিভ রক্তের গ্রুপের হন, তাহলে গর্ভের শিশু ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এক্ষেত্রে গর্ভবতীকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী বলা হয়। স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে গর্ভের শিশুর কোনো ত্রুটির আশঙ্কা নেই। 

স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ আর স্বামীর পজেটিভ হয় এবং গর্ভের শিশুর রক্ত যদি পজিটিভ হয় তাহলে তার রক্তে আরেকটি প্রোটিন তৈরি হয়, যেটি পরবর্তীতে মা যদি গর্ভধারণ করেন, তখন সে শিশু ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতা অনেক বেশি জরুরি। যদি স্ত্রীর নেগেটিভ হয় আর  স্বামীর রক্তের গ্রুপ কি জানা না যায়, এক্ষেত্রে প্রথম শিশুর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে নিতে হবে।  যদি শিশুর পজেটিভ হয় তাহলে পরবর্তীতে  সমস্যা হতে পারে। সবসময় হবে তা ১০০ভাগ সত্য নয়। ৭০ভাগ সত্য হয়। এজন্য পরবর্তী গর্ভধারণের পূর্বে মায়ের একটি রক্ত (টাইটার) পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি ফলাফল স্বাভাবিক থাকে তাহলে সে খুব স্বাভাবিক গর্ভধারণ উপভোগ করবে। আর যদি টাইটার বেশি থাকে সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎকসকের পরামর্শ নিতে হবে। এতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, দেশে স্বল্প খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসা করা হলে গর্ভের শিশুর কোনো রকমের ত্রুটি হয় না।  

গর্ভবতী মায়ের ত্রুটির কারণে শিশুর জন্মগত ত্রুটি দেখা দেয়, যেমন: শরীর ফুলে যায়, দেহের অস্বাভাবিক গঠন হয়, মাথায় পানি জমে যেতে পারে এবং গর্ভে শিশু মৃত্যুবরণও করতে পারে। এ ছাড়া জন্ডিস নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে। পরবর্তীতে শিশুর চিকিৎসা খুব জটিল আকার ধারণ করতে পারে, শিশুর পরবর্তী বিকাশ বিলম্ব হতে পারে। যারা আর্থিকভাবে স্বচ্চল তারা হয়তো চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন তবুও পর পরবর্তীতে কিছু সমস্যা শিশুকে বহন করতে হয়। এসব রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পরবর্তীতে ত্রুটিপূর্ণ গর্ভধারণের ঝুঁকি থাকে না।

থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা

বিয়ের আগে একটা অসুখ নিয়ে মানুষ চিন্তিত থাকে, সেটি হলো থ্যালাসেমিয়া। থ্যালাসেমিয়া একধরনের বংশগত রক্তরোগ। এর কারণে রক্তের শূন্যতা হয়। যদি মাইনর হয় তাহলে বিয়ের পূর্বে মেয়েটির সামন্য রক্তশূন্যতা ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের দেশে ৯০ভাগ মেয়েরা এ রোগে ভোগেন। হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা মাইনর নির্ণয় করা হয়। অল্প খরচে এ পরীক্ষা করা যায়। পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, রক্তশূন্যতার কারণ। স্বামী-স্ত্রী দু’জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হলে গর্ভের শিশুর  সমস্যা হয়। স্বামী-স্ত্রীর দু’জনের হিমোগ্লোবিনের পরীক্ষা করা থাকলে বিবাহ পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সম্ভব। আমাদের দেশে সচরাচর পরীক্ষাগুলো করা হয় না। বিদেশে এগুলো করা হয়। ঐখানে কোনো মেয়ের থ্যালাসেমিয়া মাইনর হলে একজন স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন পুরুষের সঙ্গে যাতে বিয়ে হয় সেজন্য পূর্বে থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত