০৮ মার্চ, ২০২২ ১০:৫৮ পিএম

এক সপ্তাহে ছয় চিকিৎসকের বিদায়

এক সপ্তাহে ছয় চিকিৎসকের বিদায়
অধ্যাপক আল মামুন ফেরদৌসী, অধ্যাপক এএফএম আমিনুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল মতিন খান, অধ্যাপক আতাউল হক টিপু (বাম দিক থেকে)

মেডিভয়েস রিপোর্ট: গত এক সপ্তাহে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বিশেষজ্ঞসহ ছয়জন চিকিৎসক। গত এক মার্চ থেকে সাত মার্চ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা ও হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন রোগে মারা যান তাঁরা।

এসব ঘটনায় শোক জানানোর পাশাপাশি অল্প সময়ের ব্যবধানে এতো অধিক সংখ্যক চিকিৎসকের বিদায়ে এ পেশার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা।

চিরবিদায় নেওয়া চিকিৎসকরা হলেন: ম্যাক্সিলো-ফেসিয়াল সার্জন অধ্যাপক ডা. আল মামুন ফেরদৌসী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এএফএম আমিনুল ইসলাম, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুল মতিন খান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানীর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আতাউল হক টিপু, গাজীপুর সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. মো. মোশারফ হোসেন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের (বিএমসি) নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. সাইদুর রহমান।

গত ৩ মার্চ মারা যান দেশের কিংবদন্তি ম্যাক্সিলো-ফেসিয়াল সার্জন অধ্যাপক ডা. আল মামুন ফেরদৌসী। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে নিজ কর্মস্থল ঢাকা ডেল্টা মেডিকেল কলেজে রোগীকে অস্ত্রোপচারের সময় ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়ে মারা যান তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। 

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আনুমানি আশি (৮০) বছর।

ওই দিন বেলা ২টায় ডেল্টা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অধ্যাপক মামুন ফেরদৌসীর মৃত্যুর বিষয়টি একই দিন মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর বুলবুল। তিনি বলেন, অধ্যাপক মামুন ফেরদৌসীর মৃত্যুতে চিকিৎসা পেশায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। দেশের এ প্রথিতযশা চিকিৎসকের মৃত্যুতে ডেন্টাল বিভাগে বিশাল এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল এ সার্জন ছিলেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এক সময় যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ডেন্টাল অনুষদে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। 

অধ্যাপক মামুন ফেরদৌসীর মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় গত ৬ মার্চ বিদায় হয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এএফএম আমিনুল ইসলাম। ওই দিন দুপুর পৌনে একটায় চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ৯২ বছর হয়েছিল। তিনি পাঁচ কন্যা, এক ছেলে, নাতী-নাতনী, আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে যান।

ডা. এএফএম আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। ৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে চমেক থেকে অবসর নেন তিনি।

মেডিসিন বিভাগের এই অধ্যাপক মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে একজন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক ছিলেন। দেশের মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সমসাময়িক স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নে তাঁর অবদান সর্বজনস্বীকৃত।

পর দিন ৭ মার্চ সকাল সাড়ে ৯টায় জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে মরহুমের প্রথম জানাজা এবং একই দিন বাদ জোহর মীর্জাখিল কুতুবপাড়া মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

গত ৬ মার্চ রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুল মতিন খান। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অধ্যাপক ডা. আব্দুল মতিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিবার। 

এ ছাড়াও একই দিন মারা যান গাজীপুর সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. মো. মোশারফ হোসেন। রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

এদিকে গত ১ মার্চ রাতে মারা যান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানীর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আতাউল হক টিপু। রাত সাড়ে তিনটার দিকে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন তিনি। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা ডা. আতাউল হক টিপু ছিলেন ঢামেকের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

সর্বশেষ সিরাজগঞ্জ খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজে এনাটমির বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৫৪ বছর।

সন্ধানীর সাবেক সভাপতির মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন পোস্টে তাঁর মৃত্যুতে শোক জানানোর পাশাপাশি আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেছেন বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহকর্মীরা।

শোক প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। নিজের টাইমলাইনে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয়, ভদ্র, বিনয়ী, ঐ সময়ে (১৯৯২) সন্ধানী কেন্দ্রীয় সভাপতি আতাউল হক টিপুর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক। মহান আল্লাহ ওঁকে বেহেস্ত নসীব করুন।’

তাঁর এক দিনের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের (বিএমসি) নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. সাইদুর রহমান। গত ২ মার্চ সন্ধ্যায় গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে প্যারাগন কারখানার সামনে মারা যান তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ডা. সাইদুর রহমান গাজীপুরে মির্জাপুর ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে প্রাকটিস করতেন। সন্ধ্যায় দায়িত্ব শেষে অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। রাজেন্দ্রপুরে চৌরাস্তার পাশে প্যারাগন কারখানার সামনে পৌঁছলে পেছন থেকে আসা একটি ট্রাক এটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।

তাঁর বাড়ি গাজীপুরের বাংলাবাজারের ফিজিক্যাল স্কুল এলাকায়। তিনি ভাওয়াল মির্জাপুর হাজী জমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেন।

মির্জাপুর ডায়াগোনস্টিক সেন্টারের চেয়ারম্যান ও পরিচালক মো. রাকিবুল ইসলাম মেডিভয়েসকে জানান, ডা. সাইদুর রহমান অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত। তার ছোট্ট একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁর একজন সহকর্মী মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন, এফসিপিএস প্রথম পর্ব পরীক্ষায় একাধিকবার অনুত্তীর্ণ হওয়ায় খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। এ কারণে বেশ কিছু দিন ধরে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এ চিকিৎসক। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসকের মৃত্যু
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি