ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু
চেয়ারম্যান, শিশু নিউরোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০৪:৪৫ পিএম
মৃগী রোগ: শিশুদের হঠাৎ খিঁচুনি হলে করণীয়
মৃগী নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুবিক রোগ, যাতে খিঁচুনি হয়। এই রোগের প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও জিনগত কারণকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়। এ ছাড়া আঘাত, স্ট্রোক, মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও জন্মগত ত্রুটি প্রভৃতিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সত্তর থেকে আশির ভাগ রোগীকে ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বাকি বিশ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জটিল।
মৃগী রোগ
নিউরোন হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের সেল। ১০০ বিলিয়ন নিউরোন সেল নিয়ে মস্তিষ্ক গঠিত হয়। এসব সেল দিয়ে একটি নিউরোন আরেকটি নিউরোনের সাথে বাঁধাই করে। মস্তিষ্কের তড়িৎ প্রবাহ একটি নিউরোন থেকে আরেকটি নিউরোনের মধ্যে যায়। একটি নিউরোন আরেকটি নিউরোনের সাথে বাঁধাইয়ের স্থানকে বলা হয় সিন্যাপ্স। এ সিন্যাপ্সের মধ্য দিয়ে যখন তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হয়, তখন কখনো কখনো অত্যধিক তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হয়। এ সময় সংযোগস্থলে অনেক বেশি তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হওয়ার জন্য একটি বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়। এ অস্বাভাবিক তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হওয়ার জন্য যে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয় এবং সেটার জন্য শরীরে যে ঝাঁকুনি হয়, সেটিকে বলা হয় খিঁচুনি। শিশুদের এই খিঁচুনি যদি চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই বা ততোধিকবারে হয়, তাহলে সেটিকে মৃগী রোগ বলে।
সারা শরীরে খিঁচুনি হলে সাধারণ মৃগী রোগ বলা হয়। যদি শরীরের একপাশে খিঁচুনি হয়, সেটাকে বলে ফোকালেপসি। খিঁচুনি কখনো কখনো শরীরের এক অংশ থেকে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের শরীরজুড়ে খিঁচুনি ও একপাশের খিঁচুনির মধ্যে বড় একটি তফাৎ রয়েছে। সারা শরীরে খিঁচুনি দ্রুত চিকিৎসা করলে সহজে নিরাময় হয়। অন্যদিকে একপাশের খিঁচুনি ওষুধ দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
লক্ষণ
* শরীর জুড়ে ঝাঁকুনি।
* শরীরের এক অংশে ঝাঁকুনি দিয়ে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া।
* হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে বমি করা, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অনেক বেশি লালা পড়া শুরু হওয়া।
শিশুর খিঁচুনি আর বয়স্কদের খিঁচুনির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে ছোট একটি ঝাঁকুনি হয়। এতে শিশুর হাঁটা-চলায় সমস্যা হয়। বুদ্ধি-জ্ঞানের বিকাশে সমস্যা হয় এবং কথা-বার্তা বলা কমতে থাকে। খিঁচুনির আকার ছোট হলেও প্রতিক্রিয়া হয় অনেক বেশি।
শিশুদের খিঁচুনির কারণ
* জিনগত কারণে হয়।
* পরিবারে কারও ইতিহাস থাকলে পরবর্তীতে অন্যদের হতে পারে।
* ভূমিষ্ঠের পর যদি কোনো কারণে দেরিতে কান্না করে।
* জন্মগত ত্রুটি, যেমন: জন্মের সময় এক থেকে দেড় কেজি ওজনের শিশুর খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।
* জন্মের এক থেকে দুই দিনের মধ্যে জন্ডিস বেশি আকারে হলে।
* শিশুর মস্তিষ্কে জীবানু দিয়ে সংক্রমিত হয়েও খিঁচুনি হতে পারে।
হঠাৎ খিঁচুনি হলে করণীয়
* রোগীকে শক্ত জায়গা থেকে নরম জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।
* রোগীর পাশে দা, ছুরি, বটি ও ধারালো অস্ত্র থাকলে সেগুলো সরাতে হবে।
* অক্সিজেনের যাতে ঘাটতি না থাকে এজন্য চারপাশে ভিড় করা যাবে না। প্রয়োজনে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে।
* বিপজ্জনক স্থান থেকে, যেমন-আগুন, পানি ইত্যাদির কাছ থেকে রোগীকে সরিয়ে নিয়ে আসতে হবে।
* আঁটসাট কাপড় পরা থাকলে সেটি খুলে দিতে হবে।
* শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। তবে অনেকে মুখ খুলতে যায়, মুখে পানি দেওয়ার চেষ্টা করে, এটি করা যাবে না।
* সব খিঁচুনি দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ খিঁচুনিটা চলমান খিঁচুনিতে রূপ নিতে পারে।
* জুতা বা অন্যকিছু মুখে দেওয়া যাবে না। এটির মাধ্যমে জীবানু ভেতরে প্রবেশ করবে। এতে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হবে।
নির্ণয়
রোগীর ইতিহাস জেনে রোগটি নির্ণয় করা যায়। রোগীর বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে শুনে রোগটি সম্পর্কে জানা যাবে। ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যেমন-ইজিজিই, ব্রেনের এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ধরা পড়ে।
শিশুদের যেসব ক্ষতি হয়
মৃগীর রোগের কারণে শিশুর হাঁটা-চলা করতে অসুবিধে হয়। বুদ্ধির বিকাশ কম হয়। আচার-আচারণে সমস্যা তৈরি হয়।
রোগটি ছোঁয়াচে নয়
এটি বংশগত রোগ, ছোঁয়াছে নয়। সক্রেটিস, চার্লস ডিকেন্সসহ এ রকম অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেনে। এ রোগ হলে কারো বাসায় যাওয়া যাবে না, এটি সঠিক নয়। অনেকে মৃগী রোগীর সঙ্গে মিশতে চায় না। এতে রোগী হতাশ হতে পারে। তবে ভিষন্নতার কারণ নেই। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।
সতর্কতা
খিঁচুনির রোগীর সাথে পানির কোনো সম্পর্ক নাই। তবে পুকুর, সুইমিংপুল এসবে নামলে সতর্ক থাকতে হবে। বাইসাইকেল চালানো যাবে না। ঝুঁকিপূর্ণ কলকারখানায় যাওয়া যাবে না। এ ধরনের রোগী বাথরুমে গেলে সিটকানি না লাগালে ভালো হয়।
চিকিৎসা
আগের দিনে খিঁচুনি হলে জীনে ধরেছে বলে ফকির বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যেত। এখন এটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। ওষুধের মাধ্যমে এটি নিরাময়যোগ্য। সত্তর থেকে আশি ভাগ খিঁচুনি ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। খিঁচুনির ওষুধ দীর্ঘ সময় খাওয়াতে হয়। হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করা যায় না। প্রতিদিন ওষুধ খাওয়াতে হয়। একদিন বাদ পড়লে পরের দিন বেশি আকারে খিঁচুনি হতে পারে। ওষুধ খাওয়ানোর ফলে যদি একনাগাড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর খিচুনি বন্ধ থাকে। তখন খিচুনির সাথে সাথে ইজিজিই এবং এমআরআই পরীক্ষা করা হয়। এতে যদি দেখা যায় যে, ব্রেনের মধ্যে কোনো অসুবিধে নাই এবং কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অর্থাৎ অজানা কারণে খিঁচুনি হচ্ছে তখন তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে খিচুনির ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে বন্ধ করা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমআরআইতে ব্রেনে কোনো জন্মগত জটিলতা দেখা যায়, সেক্ষেত্রে খিঁচুনির ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। ফলোআপ করে আজীবন ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ শতাংশ খিঁচুনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জটিল। এক্ষেত্রে ইমিউনো থেরাপি দেওয়া হয়। এবং কিছু কিছু ওষুধ আছে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে অন্যকাজে ব্যবহার হয়। কিন্তু এ রোগের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া খাবার দিয়েও এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। যেসব খাবারের ৯০ ভাগ ফ্যাট জাতীয়। যেমন: ঘি, মাখন, বাটার এ রকম খাবার। অপারেশনের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে আমাদের দেশে এখনও অপারেশন করার মতো ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়নি।