ডা. সাদাব সাউদ সানী

ডা. সাদাব সাউদ সানী

মেডিকেল অফিসার (৩৩তম বিসিএস), ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (২০০৫-০৬)


০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০৬:৫১ পিএম

বাত ব্যথার কারণ ও প্রতিকার

বাত ব্যথার কারণ ও প্রতিকার
বাত ব্যথা বলতে আমরা বুঝি, গিটে, জয়েন্টে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, বাঁকা হয়ে যাওয়া, কাজ করতে সমস্যা হওয়া। জয়েন্টের আশপাশে মাংসপেশীতে ব্যথা এবং টেন্ডো ও লিগামেন্টে ব্যথা। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাত ব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা। মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের মধ্যে এ রোগটির প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। এটি একটি সিস্টেমিক ডিজিজ অর্থাৎ যা কিনা পুরো শরীরে প্রভাব ফেলে। অস্থিসন্ধিতে ইউরিক এসিড জমা হয়ে এ রোগের উৎপত্তি হয়। রোগটি প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যাভাস ও জীবনযাপনে আদর্শ মানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। 

বাত ব্যথা

বাত ব্যথাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে রিউমাটোলজি। এ রিউমাটোলজির অন্তর্গত একটি বিষয় হলো বাত ব্যথা। এছাড়া আরো কিছু রোগ আছে, যেগুলোকে বলে সিস্টেমিক অটোইমিউন ডিজিজ। যেখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের শরীরের বিরুদ্ধে কাজ করে। বাত ব্যথা বলতে আমরা বুঝি, গিটে, জয়েন্টে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, বাঁকা হয়ে যাওয়া, কাজ করতে সমস্যা হওয়া। জয়েন্টের আশপাশে মাংসপেশীতে ব্যথা এবং টেন্ডো ও লিগামেন্টে ব্যথা। আর সিস্টেমিক অটোইমিউন ডিজিজ বলতে বোঝায়, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের শরীরের বিরুদ্ধে কাজ করে। এসব রোগের ব্যাপ্তিগুলো ব্যাপক। এসব রোগে আমাদের গিটে ব্যথা হতে পারে। চোখ, ত্বক ও কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি লিভার, পাকস্থলি, ব্রেন ও নার্ভাস আক্রান্ত হতে পারে।

লক্ষণ ও উপসর্গ 

বাত ব্যথার সাধারণ লক্ষণগুলো হলো: গিটে ব্যথা, গিট ফুলে যাওয়া, হাত-পা নাড়তে সমস্যা। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠার পর গিটে জ্যাম জ্যাম লাগা। এছাড়া স্কিনে রেশ আসা, মাথার চুল পড়ে যাওয়া, মুখের ভেতর ঘা হওয়া, হাত-পা জিম জিম করা ও চোখ লাল হয়ে যায়। সাধারণত এ ধরনের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

কারণ 

কয়েকটি কারণে রোগটি হতে পারে। তার মধ্যে একটি হলো: জেনিটিক, যেমন: কারো বাবা-মা ও রক্তসম্পকীয় আত্মীয়দের মাঝে যদি এ রোগের ইতিহাস থাকে। তাহলে পরবতী প্রজন্ম রোগটিতে আক্রান্ত হতে পারে। পরিবেশগত কারণেও রোগটি হয়ে থাকে। যেমন: কিছুদিন আগে আমাদের দেশে চিকুনগুনিয়ার পর অনেকের বাত ব্যথা হয়েছে। আরেকটি হলো, জীবন অভ্যাসের পরিবর্তন। যেমন: আমরা কায়িক পরিশ্রম কম করে থাকি। এতে স্থুলতা বৃদ্ধি পায় অথাৎ শরীরের ওজন বৃদ্ধির ফলে হাঁটুর গিটে অতিরিক্ত একটা চাপ পড়ে। সেখান থেকেও বাত ব্যথা হয়ে থাকে। আবার অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণেও বাত ব্যথা হতে পারে। যেমন: খেলোয়াড় বা শ্রমিকের মাংশপেশী বেশি ব্যবহার হয়। সেক্ষেত্রেও বাত ব্যথা হতে পারে। বয়সজনিত কারণে বয়স্কদের অনেকের, বিশেষ করে মহিলাদের ম্যানোপোজের পরে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। এছাড়াও বাত ব্যথার আরো অনেক কারণ রয়েছে। 

বোঝার উপায় 

বেশি পরিশ্রম করার পর, যেমন: দৌঁড়াদড়ির পর যখন ব্যথা অনুভব হয়। এ ছাড়া ঘুম থেকে উঠার পর বেশ কিছুক্ষণ জয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হয়, কিন্তু কাজ করার পর কমে যায়। হাতের গিটগুলোতে ব্যথা ও ফুলে যাওয়া, মহিলাদের ক্ষেত্রে হাঁটুতে ব্যথা, পায়ের মাংসপেশীতে ব্যথা, বসা থেকে উঠতে কষ্ট হওয়া এবং সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হলে বুঝতে হবে আপনি রোগটিতে আক্রান্ত।

বাচ্চারাও এ রোগে আক্রান্ত হয়

বাচ্চারা খেলাধুলা করতে গিয়ে অনেক সময় পায়ের লিগামেন্টে স্প্রেড হয়। এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। তারপর বিভিন্ন রকম অটোইমিউন ডিজিজ হয়, যেটাকে বলা হয় জেআইএ। যেটি বাচ্চাদের মারাত্মক ধরনের বাত রোগ বলা হয়ে থাকে।  লিকুমিয়া, থ্যালাসেমিয়া ও বিভিন্ন ধরনের রক্ত ক্যান্সার এগুলো থেকেও বাত ব্যথা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এজন্য সচেতন হওয়া খুবই গুরুত্বপূণ। কারণ, বাচ্চাদের বাত রোগ দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব পড়ে। এ কারণে ভবিষ্যতে তাদের কর্মক্ষমতা অনেকাংশ কমে যায়।

শীতকালে বাত ব্যথা

শীতকালে দিনের চেয়ে রাত প্রলম্বিত হওয়ায় মানুষ বেশি সময় ধরে নিষ্ক্রিয় থাকে। আর বাত রোগের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, যখন মানুষ কম সক্রিয় থাকে, তখন প্রদাহজনিত বাত বেড়ে যায়। শীতকালে সূর্য একটু বাঁকা হয়ে কিরণ দেয়। ফলে ভিটামিন ডি মানুষের শরীরে কিছুটা কম তৈরি হয়। এছাড়া শীতকালে মানব দেহের বিভিন্ন কোষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ নিঃস্বরণ হয়। ফলে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।

বাতজ্বর ও বাত ব্যথার পার্থক্য

বাচ্চাদের যদি গিটে ব্যথা হয় বা গিট ফুলে যায়, অথবা বাচ্চা যদি হাঁটতে না পারে, তখন সবাই মনে করে বাচ্চাটির বাতজ্বর হয়েছে। যেটি আসলে একটি ভুল ধারণা। বাচ্চাদের অনেক রকমের বাত ব্যথা হয়ে থাকে। বাত জ্বরের বৈশিষ্ট্য ও প্রদাহজনিত বাত—এ দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন: বাতজ্বরে বাচ্চার জয়েন্ট ফুলবে না। শুধু জয়েন্টে ব্যথা অনভূত হবে। খুড়িয়ে হাঁটবে না। হয়তো বলবে, হাঁটুতে ব্যথা করছে। বাত জ্বরের ব্যথা একটা জয়েন্ট থেকে আরেকটা জয়েন্টে মাইগ্রেট করে। কখনো বলবে হাটুতে ব্যথা আবার কখনো বলবে হাতের কব্জিতে ব্যথা। আর প্রদাহজনিত বাত ব্যথায় জয়েন্টগুলো ফুলে যাবে। হাঁটতে কষ্ট হবে। গোড়ালি ফুলে যাবে। অনেক সময় পিঠে ব্যথা করবে। চোখ লাল হতে পারে। জ্বর আসতে পারে। এক্ষেত্রে একজন রিউমাটোলিজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া খুবই গুরুত্বপূণ। প্রদাহজনিত বাত একটা বাচ্চার জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

কিডনিসহ অন্য যেসকল অংশের ক্ষতি হয়

বাত ব্যথা নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যথার ওষুধ সেবন করার ফলে কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়। এজন্য ব্যথার ওষুধ থেকে যতদূর সম্ভব রোগীকে দুরে রাখা উচিত। কিডনি ছাড়াও ব্যথার ওষুধ সেবনে লিভারের রোগ হয়। উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টে সমস্যাসহ অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত হয় রোগীরা। এজন্য রিউমাটোলিজিস্টের তত্ত্বাবধানে থেকে ওষুধ সেবন করতে হবে। তাহলে রোগ নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম হবে।

চিকিৎসা

বাতকে দমিয়ে বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক উন্নত ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে। এক্ষেত্রে রিউমাটোলিজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া অত্যাবশ্যক। কিডনি রোগ বা ডায়াবেটিস হলে যেমন সারা জীবন ওষুধ খেতে যেতে হয়, তেমনি বাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ওষুধ খেতে হয়, তবে সেটি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে। তখন ব্যথার ওষুধ কম খেতে হবে। কারণ, ব্যথার ওষুধ শরীরের অনেক ক্ষতি করে। ওষুধ হচ্ছে বাত রোগ চিকিৎসার একটি অংশ। কিন্তু এর বাইরেও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যেমন: সুষম খাবার গ্রহণ করার সঙ্গে শরীরের ওজন ঠিক রাখতে হবে। সুবিধামতো সময়ে ব্যয়াম করা। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে একটু স্বস্তি-আরামে থাকা। হাঁটাহাঁটি করা। তবে ব্যায়ামগুলো অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। এছাড়া খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা, যেমন: শর্করা জাতীয় খাবার কম খাওয়া। শাকসব্জি ও ফলমূল নিয়মিত খাওয়া। প্রচুর পানি পান করা।

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত