২৬ জানুয়ারী, ২০২২ ০৩:২৩ পিএম

মেডিকেল খোলা রেখে সংক্রমণ বাড়িয়ে লাভ নাই: অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী

মেডিকেল খোলা রেখে সংক্রমণ বাড়িয়ে লাভ নাই: অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনে মেডিকেল কলেজ ছয় মাস বন্ধ থাকুক। এই সময়ে তাত্ত্বিকগুলো অনলাইনে এবং প্রতিষ্ঠান খোলার পর একটি সময় নির্ধারণ করে হাতে-কলমের কাজগুলো সম্পন্ন করা যেতে পারে।

মো. মনির উদ্দিন: করোনা সংক্রমণ রোধে নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য মেডিকেল কলেজগুলো বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী লেখক-গবেষক অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। তিনি বলেন, সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে। জীবানুকে বিস্তারের সুযোগ দিলে তত বেশি ধরন তৈরি হবে। তাই কিছু দিন সশরীরে ক্লাস বন্ধ রেখে অনলাইনে তাত্ত্বিক এবং পরে ক্লাস খোলার পর প্রায়োগিক বিষয়গুলো পড়ানো যেতে পারে। শিক্ষার চেয়ে জীবন অনেক বড় বলেও মনে করেন শিক্ষাবিদ।

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী বলেন, ‘এটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। এখন মূলত স্পাইক প্রোটিনের মতো এর জেনেটিক পরিবর্তনগুলো হচ্ছে। যত বেশি মানুষের মধ্যে ছড়াচ্ছে ততোই ধরন বাড়ছে। এটাই বৈজ্ঞানিক হিসাব। অর্থাৎ একটি জীবানুকে যত বেশি বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হবে, তত বেশি ধরন তৈরি হবে। এ কারণেই ভ্যাকসিন না নেওয়া ও স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ তোয়াক্কার অভাবে এই ধরনগুলো বাড়ছে। করোনার ধরন আরও আগেই কমে যেতো, যদি আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতাম।’

এ অবস্থায় প্রাথমিকভাবে এক-দুই সপ্তাহ মেডিকেল কলেজ বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক এ অধ্যক্ষ বলেন, ‘শিক্ষার চেয়ে মানুষের জীবনটা অনেক বড়। মেডিকেল কলেজ এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহের জন্য যদি বন্ধ করি, এতে যদি সংক্রমণ হারটা কমানো যায়..., কারণ এই মুহূর্তে জরুরি হলো, সংক্রমণ রোধ করা। এটি করা গেলে অমিক্রনের মৃত্যু ঘটবে। এখন মেডিকেল কলেজ খোলা রেখে, সংক্রমণ বাড়িয়ে দিয়ে চলমান মহামারীকে যদি প্রলঙ্করী আকার দেওয়া হয়, তাহলে কী লাভ হবে? এর চেয়ে বরং ছয় মাস বন্ধ থাকুক। এই সময়ে অনলাইনে চলুক। যেসব কাজ হাতে-কলমে করতে হবে, সেগুলো আপাতত ঝুলে থাকুক। তাত্ত্বিকগুলো আগে অনলাইনে সম্পন্ন করে ফেলুন। এজন্য পড়াশোনাকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যে সময় অনলাইন চলবে, সেই সময়ে থিওরিটিক্যাল পার্টটা সম্পন্ন করা যেতে পারে। ভিডিও-অডিও—এসব মাধ্যমে কিছু জিনিস সম্পন্ন করে ফেলতে হবে। হাতে-কলমের কাজগুলো যখন প্রতিষ্ঠানের খোলার সিদ্ধান্ত হবে, তখন একটি সময় নির্ধারণ করে সম্পন্ন করা যেতে পারে। এটা অন্যতম একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। এটা করা যেতে পারে। কারণ সকল শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় নিয়ে এলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।’

তবে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ কোনো সমাধান নয় বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা গেলেও হাসপাতাল অংশ তো আর বন্ধ করা যাবে না। এটা একেবারেই সত্য। চিকিৎসকের কাজ তো বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাহলে রোগী কোথায় যাবে? হাজারও ঝুঁকি দেখা দিলেও চিকিৎসা বন্ধ করা যায় না।’

এ সময় বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যানে বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্য সেবার পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। বিকল্প চাকরিতে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছে, নার্সরা তাদের নার্সিং ছেড়ে দিয়েছে। এ রকম সংকট অন্যান্য দেশে হচ্ছে। এ কারণে জার্মানিতে দক্ষ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দক্ষ জনবল থাকলে বহু বাংলাদেশিকে সেখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতো।’

শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মমুখী করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাটা কর্মমুখী না। আমাদের শিক্ষা তত্ত্বনির্ভর। বিশাল বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বিরাট বিরাট ডিগ্রি। বিএ, এমএ, পিএইচডি। তার পর কী, মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। জুলুজিতে এমএ সম্পন্ন করে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। ব্যাগ নিয়ে নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে চেম্বারে গিয়ে স্যার, স্যার করছে। অথচ সে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করা। তাহলে লাভটা কী?’

তিনি বলেন, ‘একইভাবে মেডিকেল শিক্ষার মানও ভালো করতে হবে। লেখাপড়া ভালো করতে হবে, কোর্সটা ঢেলে সাজাতে হবে। কারিকুলামটা সমসাময়িক করতে হবে, যুগোপযোগী করতে হবে। আমাদের কারিকুলামটা সমসাময়িক না।’

বিদ্যমান মেডিকেল শিক্ষায় কিছু শূন্যতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি জিনিস মেডিকেল কলেজে নাই। এর মধ্যে অন্যতম হলো: কমিউনিকেশন স্কিল, এটির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। রোগীর সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হবে, কিভাবে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হবে, সেটার ঘাটতি আছে। পাশাপাশি ইথিক্যাল বিষয়গুলো, যেমন: আমি কোনটা পারবো, কোনটা না। কোনটায় থেমে যেতে হবে, রোগীদেরকে একটি বিষয় ব্যাখ্যা করবো—এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজগুলোতে পেশাদারিত্বও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে শেখানো হচ্ছে না।’  

চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কের অবনতি কিংবা চিকিৎসক নিগ্রহের জন্যও অনেকাংশে বোঝাপড়ার দুর্বলতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটিই মনে হয়। মূল কারণই এটি। আমার কাছে অনেক রোগী অনেক কথা বলেন। দেখা যায়, অন্য দেশের একজন চিকিৎসক পেশাদার। চিকিৎসা দিচ্ছেন, পয়সা নিচ্ছেন। কিন্তু এতো বেশি মধুর ব্যবহার করেন যে, মানুষ তাঁকে ভালোবেসে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু আচরণ সুন্দর না হওয়ায়, আমাদের এখানকার চিত্র পুরোপুরি উল্টো। এখানে চলে কথায় কথায় ধমক। এতে রোগী সন্তুষ্ট হন না। তাদেরকে সময় দিতে হবে।’ 

‘অনেকে বলেন, আমার এতো রোগী, আমি করবো কী? এমন হলে রোগী দেখবেন না। দেখেন কেন? রোগী দেখার দায়িত্ব তো একজন চিকিৎসকেরই। কিন্তু তিনি দিনে তিনশ’ রোগী দেখবেন কেন? তিনি পরিষ্কার বলে দেবেন, আমি ত্রিশজন রোগীর বেশি দেখতে পারবো না। তাহলে পেশার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ একজন রোগীকে কমপক্ষে ১৫ মিনিট সময় দিতে হবে। এটা দিতে হলে আমার সময়ে মধ্যে এই পরিমাণ রোগী দেখতে পারি, এর বেশি পারবো না। এটা বললে কে প্রতিবাদ করবে? এটা বললে হয় তো বলবে, তাহলে আরেকজন দিই। ঠিক আছে, আপনি এ চাকরি ছেড়ে দেন, অন্য কিছুতে মনোনিবেশ করুন। নীতির প্রশ্নে অটল থাকার মতো সাহস আমাদের থাকতে হবে। আমার ডাক্তারি বিদ্যা সফলভাবে প্রয়োগ করার জন্য রোগীর কাছে আমি যেন ভুয়া প্রতিপন্ন না হই। সেটা করার জন্য আমি চাকরি ছেড়ে দিতে পারি। চিকিৎসকরা আত্মমর্যাদা রক্ষার এ চর্চা শুরু করলে বিদ্যমান বাজে পদ্ধতিগুলো পরিবর্তনে বাধ্য হবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আসলে তারা ইচ্ছা করেই তিনশ’ রোগী দেখছেন, কেন দেখছেন? আমার কথা হচ্ছে, রোগীকে সময় দিতে হবে, রোগীর কথা শুনতে হবে। নিজের মতো করে রোগীকে পরীক্ষা করুন। রোগী অর্ধেকই ভালো হয়ে যায়, এসবের মাধ্যমে। বাকি অর্ধেক ওষুধে,’ যোগ করেন অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী।

তিনি বলেন, চিকিৎসক প্রতি পরামর্শ হলো, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে এটা স্বজনদের বলতে হবে। রোগীর পরিণতির বিষয়ে তাদের আগেই বুঝিয়ে দিতে হবে। যেন পরে অপ্রীতিকর কিছু না ঘটায়।

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি