২৫ জানুয়ারী, ২০২২ ০৯:২২ পিএম

করোনা উত্তাপ ছড়ালেও নতুন বছরে স্বস্তিদায়ক ডেঙ্গু

করোনা উত্তাপ ছড়ালেও নতুন বছরে স্বস্তিদায়ক ডেঙ্গু
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক মানুষ সংক্রমিত হলে ফিল্ড হসপিটাল করা যেতে পারে। ছবি: প্রতীকী

আসাদুল ইসলাম দুলাল: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে নতুন ধরন অমিক্রনের শনাক্তের হার বেড়েই চলেছে। ঊর্ধ্বমুখী এই ধারা অব্যাহত থাকলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। তবে চলতি বছর অমিক্রনে শনাক্তের হার বৃদ্ধি পেলেও দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান স্বস্তিদায়ক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাসটিতে এখনো প্রাণহানি ঘটেনি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলতি মাসে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট যেভাবে হুহু করে বাড়ছে। ঠিক একইভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারতো। করোনার ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, বিষয়টা সামাল দেওয়া হবে রীতিমত চ্যালেঞ্জিং। 

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ও বিএসএমএমইউ সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় অমিক্রন বাড়ছে ৩১ দশমিক ২৯ ভাগ। এটা অমিক্রন না ডেল্টা তা উল্লেখ করা হয়নি। এটা অমিক্রন আন্দাজ করছি। তবে খুব বেশি লোক এখনও হাসপাতালে যাচ্ছে না। 

সংক্রমণ বাড়লে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংক্রমণ বাড়লে সামাল দিতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগকে। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে, হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা করতে হবে। যদি অনেক মানুষ সংক্রমিত হয়। তাহলে ফিল্ড হসপিটাল করা যেতে পারে।

করোনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, সবাইকে মাস্ক পড়তে হবে। সবার টিকা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া হাত না ধুয়ে চোখে-মুখে হাত দেওয়া যাবে না। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় হাত ধুয়ে নিতে হবে।  

বাংলাদেশে গত বছরের জুন, জুলাই এবং আগস্টে করোনার সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃত্যু দেখেছে দেশবাসী। তবে আগস্টের শেষ দিকে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যু হার কমতে থাকে। একই বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালে সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ভর্তির পাশাপাশি মারা যায়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সে সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে কমে এসেছে। 

ভয়াবহ রূপ নেবে অমিক্রন!

অন্যদিকে গেল বছরের শেষের দিকে করোনা শনাক্তের হার কমলেও চলতি বছরের শুরু থেকে করোনার নতুন ধরন অমিক্রন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা সামনের মাসগুলোতে অশনি সংকেত হিসেবে রূপ নেবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের আগস্ট থেকে করোনা বাড়তে শুরু করলেও ডিসেম্বরে কমে যায়। তখন সংক্রমণের হার দুইয়ের নিচে ছিল। আর ২০২০ সালে ছিল ৪-৫ ভাগ। গত বছরের সংক্রমণের হারকে এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। 

সামনের দিনগুলোতে কি হারে বাড়বে বলে আভাস পাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, এটা অনেক বাড়বে বলে ধারণা হচ্ছে। দেখা যাক, ৩০-৪০% কোথায় গিয়ে ঠেকে।’

ভাইরাসের শক্তিমত্তা নির্ণয়ে দরকার গবেষণা 

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে গবেষণা দরকার। আন্দাজে কিছু বলা যাচ্ছে না। অক্টোবর নাগাদ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এটা ভাইরাসের ব্যাপার। ভাইরাসের একটা সমাজ আছে, অনেকগুলো ভাইরাস আমাদের দেশে আছে। একটা ভাইরাস ঢুকলে আরেকটা ভাইরাস ঢুকতে পারে না। আবার এমন ভাইরাস আছে, একটা ঢুকলে আরেকটা ভাইরাস ঢুকলে অসুবিধাও করে না। এখানে বিভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশ আছে। কে যে কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হবে, এটা বলা বোঝা মুশকিল। এজন্য গবেষণা করা দরকার। গবেষণা না করলে উত্তর পাওয়ার উপায় নেই, আমরা এ রকম উত্তর খুঁজছি। 

‘সংক্রমণ কোন সময় বাড়বে, এটা তো বলা যায় না। ডিসেম্বরে শেষ সময় পর্যন্ত সংক্রমণের হার কম ছিল। জানুয়ারিতে এসে বাড়া শুরু করলো। গতকাল শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ, তার আগে ছিল ২৮ দশমিক ০২ শতাংশ। এ ধারায় বাড়ছে। এখন এটি আমরা দেখছি’, যোগ করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতি ৩-৪ দিনের ব্যবধানে নতুন রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। দেশে করোনায় আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়াকে ‘অশুভ ইঙ্গিত’বলে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম। 

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের সংবরণ না করি, এটাকে প্রতিহত করার চেষ্টা শক্তিশালী না করি তবে পরে বিপদের বড় আশঙ্কা আছে।’ 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনায় সাত হাজার ৫৫৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়। একই সময়ে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ৫১০ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ৫১৩ জনের মৃত্যু হয়, এর মধ্যে জানুয়ারিতে ছিল ৫৬৮ জন। ২০২১ সালের ২৮ জুলাই সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জন রোগী শনাক্ত হয়। একই বছরের ২৪ জুলাই সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৪০ শতাংশ।

কমতে পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ 

এদিকে গত ১-২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সর্বমোট ১২২ জন। তবে এ সময়ে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জন মৃত্যুবরণ করেছে। একই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সর্বমোট ২৮ হাজার ৪২৯ জন। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। তবে সে বছর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৭৯। ২০২০ সালে ডেঙ্গুতে এক হাজার ৪০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছরে ডেঙ্গু সন্দেহে ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য আইইডিসিআরে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ডেঙ্গুর কারণে ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাব ইনচার্জ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা লিমা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে এপ্রিল-মে মাস থেকে। কারণ এ সময় বর্ষাকাল শুরু হয় এবং বৃষ্টি থাকে। আর এটা এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে। এই সময় মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা একটু কম। চার বছর ধরে ডেন থ্রি রি-ইমার্জ করছে। অর্থাৎ ডেনভি থ্রি সার্কুলেট করছিল ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত। যেহেতু ডেনভি থ্রি সার্কুলেট করছিল এবং অলরেডি ডেনভি ১, ডেনভি-২ সার্ককুলেটিং ভাইরাস। সেক্ষেত্রে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ কম হতে পারে।’

প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু টেস্ট চালু হয়নি। আমাদের এলিজা মেশিনটা নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘ দুই বছর ব্যবহার করা হয়নি এবং এটা ১২ বছর আগের মেশিন ছিল, যা আমরা ঠিক করতে পারিনি। ফলে ডেঙ্গু টেস্টের জন্য এন্টিজেন টেস্ট করতে পারবো। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর এন্টিজেন টেস্ট শুরু হয়নি। আমাদের ল্যাবে শুধুমাত্র কোভিড টেস্ট হচ্ছে। এপ্রিল মাস পর্যন্ত করোনার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।’

তিনি আরও বলেন, করোনা যদি এভাবে বাড়তে থাকে। তাহলে ওই সময় ডেঙ্গু টেস্ট কঠিন হয়ে পড়বে। ডেঙ্গুর টেস্ট শুরু হলে স্যাম্পল দেওয়ার লোকজন এসে ভিড় করবে। সম্পূর্ণ জায়গাটা দূষিত হয়ে যাবে। কারণ যারা ডেঙ্গুর স্যাম্পল দিতে আসবে, তারা কোভিড পজিটিভ নয়, সেটা তো বলা যাবে না।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি