২৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৬:৫৪ পিএম

দেশে এইচআইভি রোগীর ২০ ভাগ অভিবাসীকর্মী

দেশে এইচআইভি রোগীর ২০ ভাগ অভিবাসীকর্মী
সভায় জানানো হয়, প্রতি বছর কয়েক হাজার অভিবাসীকর্মী বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসেন। তাদের কোনো স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয় না, ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করতে থাকেন, যা আরও একটি ভয়ের কারণ।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভি-এইডস রোগ শনাক্ত হয়। এর পর থেকে এই পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ শনাক্ত হয়েছেন। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত মানুষের প্রায় ২০ ভাগই অভিবাসী কর্মী। এর পরই রয়েছে শিরায় মাদকসেবী, যৌনকর্মী, হিজড়া, এমএসএম এবং পিএলএইচআইভি।

আজ বুধবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর গার্লস গাইড এসোসিয়েশন অডিটোরিয়ামে নাগরিক সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

এইচআইভি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে (পিএলএইচআইভি) সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্তি ও তাদের মানবাধিকার নিশ্চিতের দাবিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এইডস রোগের বিস্তার, প্রতিরোধে করণীয়সহ নানা দিক তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে এইডস নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনএইডসের উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তারা জানান, এইচআইভি-এইডস বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভি রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার মানুষ।

সংস্থাটি জানিয়েছে, যদিও বাংলাদেশে এর ঝুঁকি .০১%, তবুও প্রতিবেশী দেশগুলোর উচ্চ সংক্রমণ কিছুটা হলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২১ সালে এনএসপি’র তথ্য মতে, নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৭২৯ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮৮ জন। মারা গেছেন ২০৫। এইচআইভিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অভিবাসী কর্মী, শিরায় মাদকসেবী, যৌনকর্মী, হিজড়া, এমএসএম এবং পিএলএইচআইভি।

সরকারি তথ্যমতে, গত বছর নতুন করে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে প্রায় ২০ ভাগই হচ্ছে অভিবাসী কর্মী এবং তাদের স্পাউস বা সন্তান। বাকিদের মধ্যে ৯ ভাগ এমএসএম জনগোষ্ঠী,৮ ভাগ মাদকসেবী, ৯ যৌনকর্মী জনগোষ্ঠী, ২৬ ভাগ করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ সরকার এইচআইভি আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। সরকারের বিভিন্ন এয়ারটি সেন্টার থেকে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, পিএলএইচআইভি জনগোষ্ঠী সঠিক কাউন্সেলিং সুবিধা পাচ্ছেন না। বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার জন পিএলএইচআইভি ও অন্যান্য চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।

আরো প্রায় ছয় হাজার জন চিকিৎসা সেবার বাইরে রয়ে গেছেন। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়াও প্রতি বছর কয়েক হাজার অভিবাসীকর্মী বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসেন। তাদের কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না, যার ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করতে থাকেন, যা আরও একটি ভয়ের কারণ। উল্লেখ্য যে, শিরায় মাদকসেবীদের মধ্যে উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকি (৩.৯%) বিদ্যমান রয়েছে।

যেহেতু এইচআইভি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে সমাজ এখনো ভালোভাবে গ্রহণ করে না, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের সংক্রমণের কথা গোপন করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা এইচআইভি আক্রান্ত তারা সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে কখনোই এ অবস্থাটি প্রকাশ করেন না। তারা বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, এইচআইভি আক্রান্ত জনগোষ্ঠী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা, চাকরি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্ত জায়গা-সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত এবং নির্যাতনের শিকার হন।

গত দু'বছর ধরে পুরো বিশ্ব করণা সংক্রমণে জর্জরিত। এর ফলে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মত পিএলএইচআইভি জনগোষ্ঠীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। করোনাকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব শোচনীয়। তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সীমার নিচে বসবাস করেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এমতাবস্থায় এইচআইভি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর (পিএলএইচআইভি) করুণ বাস্তবতা বিবেচনা করে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা সকল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর (কেএপি) পক্ষ থেকে নিচের দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরছি। 

দাবিসমূহ

১. পিএলএইচআইভি জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করে, প্রত্যেককে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা, 
২. ওষুধের পাশাপাশি তাদের অন্যান্য চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য ও বৈষম্যহীন করা, 
৩. সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আরো দায়িত্বশীল আচরণ,
৪. পিএলএইচআইভিদের সঙ্গে যে কোনো ধরনের হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করা, 
৫. তাদের জন্য বৃত্তিমূলক ও মানানসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ব্যবস্থা করা,
৬. তাদেরকে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসা, 
৭. নতুনভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা, 
৮. তাদের জন্য সহজ শর্তে লোনের ব্যবস্থা করা, 
৯. প্রত্যেকটি ‘কেএপি’ জনগোষ্ঠীকে এইচআইভি সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা, 
১০. অধিবাসীগণ বিদেশ যাওয়ার পূর্বেই এইচআইভি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া ও 
১১. সর্বোপরি আক্রান্ত ব্যক্তিকে একজন মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া। 

আয়োজকরা বলেন, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশ এখন মধ্যআয়ের দেশ। সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ৯৫-৯৫-৯৫ টার্গেট ইত্যাদি বিভিন্ন বৈশ্বিক ও জাতীয় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এইচআইভি/এইডস নিমূলে সচেষ্ট।’

‘আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা (অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম, আশার আলো সোসাইটি ও পিএলএইচআইভি নেটওয়ার্ক) সকল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী পক্ষে সংশ্লিষ্ট সকল অংশিজনকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে পিএলএইচআইভি জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করার অনুরোধ জানাই। সকলের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে তাঁরা সমাজে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকবে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস’, যোগ করেন তারা। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : এইচআইভি
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি