ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


২৬ নভেম্বর, ২০১৬ ০২:২২ পিএম
সময় কথন

একই সুতোয় বাঁধবে বলো কে ?

একই সুতোয় বাঁধবে বলো কে ?

ইদানিং ডা. অশোকের কেমন দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে। জীবনটাকে বইতে কষ্ট হচ্ছে তার। খুব কষ্ট। পরিবারের কাছে নিজেকে কেমন বোঝা মনে হয়।

বয়স আটাশ হয়ে গেল। এখনও পরিবারের হাল ধরতে পারছে না সে। গতকাল মা বারবার বাবার ওষুধ কিনতে বলেছিলেন। সে ভুলে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে নিয়ে যায়নি সেদিন।

অথচ তার ঠিকই মনে ছিল। কিন্তু সে টাকা জোগাড় করতে পারেনি। দুই-তিন হাজার টাকা পরিমাণে খুব বেশি না। কিন্তু একজন অনারারী চিকিৎসকের কাছে পরিমাণটা বেশ বড়।

সারাদিন হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়। বিকালে বড় স্যারের চেম্বারে সহকারী হিসেবে কাজ করে পুরো মাসে যা আয় হয় তাতে হয়তো নিজে চলা যায়। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত বাবার পরিবারের ঘানি টানবে অতটা সাধ্য কই? 

ছোটভাই সপ্তাহখানেক আগেই স্কুলের বেতন চেয়েছিল। আগামী মাসে লেট ফি সহ দেয়া হবে এই প্রতিশ্রুতিতে আশায় রাখা হয়েছে ওকে।

জীবনটা ক্রমেই হতাশায় ভরে উঠছে তার। কবে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন হবে, বিসিএসের শিকে ছিঁড়বে কপালে- সে জানে না।

এখন মনে হয় এর চেয়ে বরং অন্য কোন পেশায় গেলে জীবন এতটা দুর্বিষহ হত না। নয়টা-পাঁচটা অফিস করে অন্তত পরিবারকে সময় দেয়ার সময়টুকু থাকত।

উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে বছরের পর বছর বিনাবেতনে খাটতে হতো না।

আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আর মানবতার সেবা শব্দগুলো তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের মতো তাকে কটাক্ষ করে। তার চোখের ছলছলে জল ভবিষ্যত কি বর্তমানকেই দেখতে দেয় না!

এই কাতর চোখে স্বপ্ন দেখা সম্ভব না। বিয়ে করে টোনাটুনির সংসার গড়ার সুখস্বপ্ন দেখা তো বাদ দিয়েছে অনেক আগেই।

এখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ যোগানোই দায়। জীবনের কোন বৃহত্তর অর্থ তাকে আর টানে না।

তার কাছে এখন জীবন মানে রিডিং রুম, হাসপাতালের করিডোর, পরীক্ষায় ক্রমাগত ব্যর্থতা আর বৃদ্ধা মায়ের একের পর এক করুণ অনুযোগ।

এই কষ্টগুলো একান্তই তার। এমন হাজারো অশোকের। এই করুণ আর্তনাদগুলো কখনো প্রতিধ্বণিত হয় না কর্তাব্যক্তিদের হৃদয়ে।

তারা অনারারীদের সম্মান দিয়েই সন্তুষ্ট। জীবিকার প্রয়োজন যে তাদেরও আছে; তাদেরকেও পরিবার নিয়ে ভাবতে হয়- এই বোধটুকু নেই চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব করা বড় বড় নেতাদের।

এদেশ অনারারীদের হাতে নিজেদের সম্ভ্রমের সবটুকু তুলে দিয়ে নির্লজ্জের মতো সম্ভ্রমহীনভাবেই থাকতে হয়তো বেশি ভালোবাসে।

তাই দেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলো সত্তর শতাংশের বেশি চিকিৎসককে বিনা পয়সায় খাটিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

কেউ একটু ভেবেও দেখছে না তা কিভাবে চলছে। এতো ভাবাভাবির সময় কারো নেই। সবাই নিজের আখের গোছানে ব্যস্ত।

ডা. পলাশ সার্জারিতে এম.এস করেছেন গতবছর। এছাড়াও তার ঝুলিতে আছে এম.আর.সি.এস এর মতো লোভনীয় ডিগ্রী।

তবুও হাসপাতালের একটি ইউনিটের রেজিস্ট্রার হিসেবে আছেন বছর চারেক হলো। পদোন্নতির কোন সম্ভাবনাই দেখছেন না তিনি।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি ভালো লাগতো না তার। তাই সবসময় একশো হাত দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন যেকোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের।

কর্তৃপক্ষের সাথে প্রমোশনের ব্যাপারে যোগাযোগ করলে তারা বলেন বড় কোন রাজনৈতিক নেতার সুপারিশসহ যেতে।

কিন্তু তিনি কার কাছে যাবেন। তার পরিচিত তো কেউ নেই। তাহলে কি তাকে থমকে যেতে হবে এখানেই।

একটা পথ খোলা আছে। বিদেশ যাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যেই দুইটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কথা হয়েছে।

তারা খুবই আগ্রহী।

কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই ‘আর যাই হোক দেশে থেকেই দেশের জন্য কিছু করবো’ এই শপথের কি হবে?

তিনি ভাবেন, কোনটা এখন তার জন্য ভালো। নানা অনিশ্চয়তা আর নিগ্রহের মধ্যে মুখবুজে এদেশে পড়ে থাকা?

নাকি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে স্বার্থপরের মতো বিদেশ চলে যাওয়া?

তিনি যদি দেশে থাকতেই চান তার এই অকৃত্রিম দেশপ্রেমের মূল্যায়ন কি কেউ করবে? 

ডা. অনন্যার রাতে ঘুম হয়না অনেকদিন। গত বছর বিবাহ বার্ষিকীর ঠিক পরদিন মারুফ হাসিমুখেই বিদায় নিয়েছিল তার কাছ থেকে।

ও যখন চলে যাচ্ছিল, বিদায় দিতে মোটেই ইচ্ছা ছিল না তার। তবু পেশাগত দায়িত্বের জন্যেই তাকে যেতে দিতে হয়েছিল সুদূর পল্লীতে।

এর পরদিন মারুফের মৃত্যু সংবাদ এলো। মারুফকে পাওয়া গেল পাশের পুকুরে ভাসমান অবস্থায়।

এরপর অনেক সময় কেটে গেছে। চিকিৎসক নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যবস্থা হয়নি।

মিডিয়া এবং তার সহকর্মীরা একসময় বেশ মাতামাতি করেছিল। পরে ঠিকই ভুলে গেছে।

শুধু সে-ই ভুলতে পারেনি। জীবনটাকে এখন খুব অর্থহীন ও অস্বস্থিকর মনে হয় তার। আশেপাশের কাউকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না।

বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা জাগেনা অভিভাবকত্বের ধামাধরা কর্তাব্যক্তিদের প্রতি। সবাইকে শুধুই স্বার্থপর মনে হয়।

ডা. অশোক, পলাশ, অনন্যার জীবনের সমস্যাগুলো শুধুমাত্র তাদের সমস্যা নয়। এমন অগণিত সমস্যায় জর্জরিত আমরা চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের কর্মস্থলে নির্যাতিত হওয়া; এলাকার স্যাকমো, এল.এম.এ.এফ ও  হাতুড়ে ডাক্তারদের অপ-চিকিৎসার বিপরীতে জিম্মি হয়ে থাকা ও ক্লিনিক মালিকদের নানা অন্যায় কর্মকাণ্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এর প্রতিরোধে প্রয়োজন সবার ঐক্য। সকল রাজনৈতিক মতবাদের ঊর্ধে¦ গিয়ে নিরপেক্ষ অভিভাবকত্ব।

যারা কোমলভাবে মাথায় হাত বোলাবেন অনুজদের আর শক্তহাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন সকল দূর্নীতি আর চিকিৎসকদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে।

সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হবে একটি ঈর্ষণীয় ভারসাম্যর্পূ দূর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

কিন্তু সে ঐক্য কই? দৃশ্যপটটা তো এমন ছিল না। আমাদের ঐক্যের ইতিহাসতো খুব দূর্লভ নয়।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে, একাত্তরের রক্তঝরা সময়গুলোতে এমনকি একানব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে চিকিৎসকদের ঐক্য ছিল ঈর্ষণীয়।

তারা একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে গেছেন। ত্বরান্বিত করেছেন ঈপ্সিত বিপ্লব।

শহীদ মিলনের পবিত্র রক্ত যেমনি করে ত্বরান্বিত করেছিল স্বৈরাচারের পতন।

শাসকের রক্তচক্ষু তাদেরকে কখনোই দমাতে পারেনি। কিন্তু এখন তা কেবলই ছেলে-ভোলানো গল্প।

যেদিকে অশিক্ষিত পরিবহন শ্রমিকেরা নিজেদের ভালোটা বোঝে, ন্যায় হোক, অন্যায় হোক যে কোন সুবিধা আদায়ের জন্য একজোট হয়ে যায় নির্দ্বিধায়, সেখানে আমরা এতোটা শিক্ষিত হয়েও কিভাবে নিজেদের ভালোটা বুঝতে পারিনা?

কোন আন্দোলন শুরু হওয়া মাত্রই রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে আন্দোলনকে পথে বসিয়ে দিই। এতোটা অবুঝ কেন আমরা? 

একজন ডাক্তার খুন হন, আমরা মুখ বুজে থাকি।

একজন ডাক্তার লাঞ্ছিত হন, আমরা উটপাখির মতো বালির মধ্যে মাথা গুজে থাকি।

ভাবি, আমিতো ভালো আছি।

জুনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতালে ধর্মঘট করেন, লাভ হয় সিনিয়র ডাক্তারদের।

তাদের চেম্বারে রোগীর চাপ বাড়ে। তারা আন্দোলনে যোগ দেবেন; জুনিয়রদের সাথে গলা মেলাবেন; কোন সাহসে?

যদি এতো সাধনায় পাওয়া পোস্টিং হুমকির মুখে পড়ে!

এর চেয়ে বরং চুপ থেকে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে যাওয়াই ভালো।

ডাক্তারদের অল্পকিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে একের পর এক দূর্নীতি করে চলেছে ক্লিনিক মালিকেরা।

জিম্মি করে রাখছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। অথচ সব দোষ চাপছে ডাক্তারদের কাঁধে।

তরুণ ডাক্তাররা এই অন্যায় কোনভাবেই সহ্য করতে চায় না।

কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কিছুই করতে পারে না।

হয়তো সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে, কিন্তু এতে এক চুলও ক্ষতি হচ্ছে না ওইসব দূর্নীতিবাজদের।

কিন্তু বিশাল ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে এই দেশের। যেসব তরুণ চিকিৎসকেরা এই সিস্টেমকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার কথা তাদের আত্মবিশ্বাসের পারদ ভূমিকে স্পর্শ করছে।

তারা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিচ্ছে। গা ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রচলিত সুবিধাবাদী ধারায়।

অথচ একটু সহনশীল, আন্তরিক ও দায়িত্ববান নেতৃত্ব পেলেই তারা ছিনিয়ে আনতে পারতো সম্ভাবনার সূর্যের আলো সকল হতাশার বাঁধা ঠেলে।

এটা তাদের জন্য মোটেও কঠিন নয়।

কিন্তু তেমন নেতৃত্ব কই?

 

(প্রকাশিত :  সংখ্যা : ৪; বর্ষ ২; জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী ২০১৫)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত