০২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৫:০৬ পিএম

অনিশ্চয়তার অন্ধকারে রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতা

অনিশ্চয়তার অন্ধকারে রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতা
নবীন চিকিৎসকদের খেদোক্তি, তাদের অর্থকষ্টে রেখে বিএসএমএমইউকে সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত করার চিন্তা কেবলই কল্পনাবিলাস।

মো. মনির উদ্দিন: জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা মিটিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স রেসিডেন্সিতে অধ্যয়নরতদের জন্য ভাতা চালু করে কর্তৃপক্ষ। শুরুতে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর তা বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার

এতেও চিকিৎসকদের জীবন নির্বাহ করে কোর্সে পূর্ণ মনোযোগী থাকা দুরুহ হয়ে পড়ায় ভাতা বাড়ানো অনিবার্য হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বরে তা বৃদ্ধি করে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই সময় জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নির্বাহী বডি সিন্ডিকেটে পাস হওয়ার পরের মাস থেকেই বর্ধিত এ ভাতা পাবেন চিকিৎসকরা।

কিন্তু এর প্রায় দেড় বছর পরও আলোর মুখ দেখছে না রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতা। অথচ দীর্ঘ ১৬ মাসে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুহু করে বেড়েছে জীবন নির্বাহের ব্যয়। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত টাকায় নিজের জীবন ও সংসার পরিচালনা করে চিকিৎসকদের পক্ষে কোর্সে মনোনিবেশ করা হয়ে উঠেছে চরম চ্যালেঞ্জের। কিন্তু কোর্সের বাইরে প্রাইভেট প্রাকটিস নিষিদ্ধ থাকায় অস্বাভাবিক জীবনে আটকা পড়েছেন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনের সন্ধান দেওয়া এসব চিকিৎসক, মুষড়ে পড়ছেন হতাশায়। 

তাঁদের খেদোক্তি, নবীন চিকিৎসকদের অর্থকষ্টে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বিএসএমএমইউ) সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত করার চিন্তা কেবলই কল্পনাবিলাস। 

ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় হতাশ রেসিডেন্ট

বর্ধিত ভাতা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশার কথা তুলে ধরে একজন রেসিডেন্ট মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বর্ধিত যে টাকা দেওয়ার কথা ছিল, তা কবে দেওয়া হবে বা আদৌ হবে কিনা, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা এটা নিয়ে অনেক হতাশ। যেহেতু এটা সিন্ডিকেট মিটিংয়ে দেড় বছর আগে পাস হয়েছে, তাই এটি অনেক আগেই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে, সেটাই আশা করেছিলাম। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ তখন বলেছিলেন, সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পাস হওয়ার পরের মাস থেকেই এ ভাতা চালু হয়ে যাবে। তাদের এ কথা যে মিথ্যা ছিল অথবা ভুল আশ্বাস ছিল..., তারা জেনে অথবা না জেনে, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষার্থীদেরকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলেন। এটা রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই কষ্টের কারণ।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়কে তাঁরা সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত করবেন। তাঁরা কাদের নিয়ে সেন্টার অব এক্সিডেন্ট করবেন? নিজেরা একক প্রচেষ্টায় এ অসাধ্য সাধন করবেন? এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব না। আমরা মনে করি, বিএসএমএমইউর মূল চালিকাশক্তি এখানকার শিক্ষার্থী এবং রেসিডেন্টরা। তাদেরকে অসন্তুষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় রেখে, প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবেই সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত হতে পারবে না।’

‘প্রত্যেক রেসিডেন্ট, বিশেষ করে বেসরকারি রেসিডেন্টদের প্রত্যেকেই বঞ্চিত। তাদের বঞ্চিত হওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। মাসে ২০ হাজার করে ভাতা দেওয়া হয়, যা দিয়ে মেসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। উপরন্তু এই টাকা নিয়ে মাঝে মাঝে অনেক ফ্যাকাল্টি খোটামূলক আচরণ করেন। একজন শিক্ষার্থী তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় বা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে অসন্তুষ্টি নিয়ে পার করছেন। তাদেরকে এ অবস্থায় রেখে বিএসএমএমইউর অগ্রগতি সাধন সম্ভব না’, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘যে সময়টাতে একজন চিকিৎসক বিশেষ করে বেসরকারি চিকিৎসকের সর্বোচ্চ জ্ঞানার্জনের কথা, পড়াশোনা-গবেষণায় আত্মনিয়োগ করার কথা, সেই সময়ে তাকে অর্থকষ্টে রেখে, পরোক্ষভাবে পেশার প্রতি একটি বিতৃষ্ণা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।’  

এর সঙ্গে জড়িত অন্য কোর্সের ভাতার বিষয় 

বিএসএমএমইউতে অধ্যয়নরত আরেক রেসিডেন্ট বলেন, ‘বিএসএমএমইউর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দেশে উচ্চশিক্ষায় চলমান অন্যান্য কোর্সের ভাতা বর্ধনের বিষয়টিও জড়িত। তারা বর্ধিত ভাতা কার্যকর করলে এ সিদ্ধান্তের আলোকে এফসিপিএস চিকিৎসকদের ভাতার পরিমাণও বাড়বে, পরবর্তীতে ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের ভাতা বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। রেসিডেন্সিতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে, কিন্তু এটাই যে যথেষ্ট, বিষয়টি কিন্তু এমনও না। একজন রেসিডেন্ট চিকিৎসক ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে ২০/৩০ হাজার টাকায় নিজে চলবেন, পরিবার দেখবেন, গভীর মনোযোগ নিয়ে পড়াশোনা করবেন এবং গবেষণায় ভূমিকা রাখবেন—এতগুলো অস্বাভাবিক চিন্তা এক সঙ্গে বাস্তবায়ন অসম্ভব।

কোর্সবহির্ভূত কাজে সম্পৃক্ততায় ব্যাহত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ 

ওই নবীন চিকিৎসক আরও বলেন, ‘বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ রেসিডেন্ট, চিকিৎসক ও মেডিকেল অফিসারদের পেশার বাইরে বিভিন্ন কাজে যুক্ত করান। একজন রেসিডেন্ট এসেছেন একটি কোর্সে, কিন্তু তাকে দিয়ে কোভিড ডিউটি করানো হয়। তাকে দিয়ে করানো হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা। যিনি রেডিওলজি পড়তে এসেছেন, এনাটমি পড়তে এসেছেন তাকে দিয়েও কোভিড ডিউটি করানো হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, কোর্সবহির্ভূত এসব কাজে যুক্ত করার পর কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল, তাদেরকে প্রণোদনা দেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। এজন্য বারবার তালিকা চাওয়া হয়েছে, বারবার তা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয়নি। সামনে আবার ওমিক্রন আসছে। তখন কর্তৃপক্ষ হয় তো আবার চতুর্থবার একটি তালিকা চাইবেন, সেটা তৈরিও হবে। কিন্তু প্রণোদনার বিষয়টি কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। যদি একটি ইনস্টিটিউট তার চিকিৎসকদের সঙ্গে এ রকম অবজ্ঞা-অবহেলামূলক আচরণ করে, সেখানে কর্মরত চিকিৎসকরা তো প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের বলে মনে করেন না। তারা অপেক্ষায় থাকেন, কবে-কখন এখান থেকে বের হতে পারবেন। এই রকম মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা সময় পার করছেন। চিকিৎসা পেশায় তারা কিভাবে নিজেদের আত্মানিয়োগ করবেন? আমার মনে হয়, বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের উচিত, বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে দেখা। তাঁদের জীবনমানের উন্নতি ছাড়া, শিক্ষা-গবেষণায় উন্নতির আশা করা হলে বাস্তবে তা সম্ভব না। বিএসএমএমইউর একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষা-গবেষণার মনোন্নয়নের সাথে সাথে—যাদের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন হবে, তাদের জীবনযাত্রা উন্নয়নের বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। 

ভাইস চ্যান্সেলরের প্রচেষ্টাতেই মিলতে পারে সমাধান 

রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা বলেন, বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিএসএমএমইউর প্রতিটি কাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

তারা আরও বলেন, ‘বর্তমান ভিসি একজন ডাইনামিক ভিসি। তাঁর প্রচেষ্টাতেই ডিপ্লোমা-এমফিল চিকিৎসকরা ভাতা পেয়েছেন। তিনি যদি আরেকটি উদ্যোগ নেন, আন্তরিকভাবে আরেকবার চেষ্টা করেন, তাহলে রেসিডেন্টদের ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিএসএমএমইউ ভিসি একটি জিনিস চাইবেন আর তা বাস্তবায়ন হবে না, এটি অসম্ভব-অকল্পনীয় ব্যাপার।’

যা বললেন বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ  

চলতি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এ বছরও রেডিসেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতা প্রদান করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন বিএসএমএমইউ ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘রেডিসেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতা এ বছর হবে না। এটা পরে দেওয়া হবে। এই বাজেটে হবে না, পরের বাজেটে দেখবো। জোর চেষ্টা থাকবে, তবে এটা নিশ্চিত না। সরকার দিচ্ছে না। আমার চেষ্টা অব্যাহত আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘টাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হয়ে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয় দিলে তখন হয়। নিয়ম অনুযায়ী, আমরা প্রস্তাব পাঠাই। ওরা দিলে ভাতাটা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো দেয়নি বলেই রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা এখনো পাননি। আমরা চেষ্টা করছি। ওরা যখন দেবে তখন পেয়ে যাবে।’ 

তারা কবে নাগাদ পেতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো ডিসেম্বর মাস। আগামী অর্থবছর ছাড়া তো সম্ভব না। আগামী অর্থ বছর যদি দেয়, তাহলে জুলাই থেকে পাবে।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হিসাব ও অর্থ) মো. আবদুস সোবহান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভিসি মহোদয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছা আছে, তিনি অবশ্যই পদক্ষেপ নেবেন। বিষয়টি তাঁর ভাবনায় আছে, তিনি এটি এগিয়ে নেবেন। রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের বর্ধিত ভাতার বিষয়টি বাস্তবায়নের পর নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের জন্য পদক্ষেপ নেবেন। আমি পরিচালক (অর্থ) হিসেবে তাঁর প্রতিটি আদেশ বাস্তবায়ন করে যাবো। চিকিৎসকদের সুবিধা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবা কিভাবে আরেকটু ভালো করা যায়, সে লক্ষ্যে দিন-রাত কাজ করছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, বিএসএমএমইউকে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তর বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।’ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ভাতা
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি