ডা. আশিকুর রহমান রুপম

ডা. আশিকুর রহমান রুপম

জেনারেল ফিজিশিয়ান ও স্বাস্থ্য কলামিস্ট। 


১৫ নভেম্বর, ২০২১ ১০:০২ এএম

যেভাবে আলোর মুখ দেখলো ইনসুলিন

যেভাবে আলোর মুখ দেখলো ইনসুলিন
এক কিশোরকে বেন্টিং-ম্যাক্লোয়েডদের তৈরি ইনসুলিন দিয়ে শুরু করা হল চিকিৎসা এবং আশ্চর্যজনকভাবে সেই রোগীর সুগার কমে এলো একেবারে স্বাভাবিক মাত্রায়। ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে একশ' বছর আগের কথা। তখন ইনসুলিন আবিষ্কার হয়নি। ওই সময়টায় প্রচুর মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যেতো। ডায়াবেটিস বলে কোনো রোগ আছে তা তারা বুঝতোই না। আর এতে রক্তের সুগার বেড়ে গিয়ে কিংবা নানা রকম জটিলতার শিকার হয়ে অবশেষে মৃত্যুমুখে ধাবিত হতো মানুষ। 

ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, ১৯২১ সালের আগে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে মানুষ বেশিদিন বাঁচতো না। চিকিৎসকদেরও বেশি কিছু করার ছিল না। তখন মানুষকে একটাই চিকিৎসা দেওয়া হতো, তা হলো না খাইয়ে রাখা। বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার কম দেওয়া হতো। এতে হয়ত কিছুদিন বেশি বাঁচতো, কিন্তু শেষ রক্ষা হতো না।

একশ' বছর আগে ফিরে যাওয়া 

১৮৮৯ সালে জার্মানির দুইজন বিজ্ঞানী অস্কার মিনোস্কি এবং জোসেফ ভন মেরিং কুকুরের উপর একটা গবেষণা শুরু করেন। তারা দেখলেন, যখন কুকুরের অগ্নাশয় বা প্যানক্রিয়াস কেটে ফেলে দেওয়া হলো, তখনই তাঁর ডায়াবেটিসের লক্ষণ-উপসর্গ দেখা দেওয়া শুরু করল। তখন তারা একটা সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করলেন যে, প্যানক্রিয়াস থেকে এমন একটা কেমিকেল বের হয়, যা ব্লাড সুগার কমিয়ে রাখে। তারা এটার নাম দিলেন ‘প্যানক্রিয়াটিক সাবস্ট্যান্স।’

১৯১০ সালের দিকে স্যার এডুয়ার্ড এলবার্ট শার্পি শাফের মত দিলেন, প্যানক্রিয়াসের কোনো একটি উপাদান একাই রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাঁদের দেহে সেই উপাদান অনুপস্থিত থাকে। তিনিই প্রথম সেই উপাদানের নাম দিলেন ‘ইনসুলিন’। ল্যাটিন শব্দ ‘ইনসুলা’ থেকে এসেছে এই ইনসুলিন। ইনসুলা অর্থ আইল্যান্ড বা দীপ। অগ্নাশয়ের ভেতরে যে বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়, তাঁর এক গুচ্ছ হয়ে দীপপুঞ্জের মতো হয়ে থাকে বলে ওই কোষ সমাহারকে বলে আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স (ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দীপ)।

এরপর কি হল? এর পর যা ঘটল, এক কথায় অভাবনীয়, ম্যাজিক্যাল বা মিরাকল কোনো ঘটনা।

১৯২১ সালে কানাডার একজন তরুণ সার্জন ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং তাঁর সহকারী চার্লস বেস্ট দেখালেন, কুকুরের অগ্নাশয় থেকে কিভাবে ইনসুলিন নির্গত হয়। তারা দুইজন মিলে একটা জটিল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কুকুরকে তাঁদের তৈরি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রায় ৭০ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হলেন। পরে সেই কুকুরটি মারা গেল, যখন তাঁর শরীর থেকে আর এক বিন্দুও ইনসুলিন নির্গত হলো না। পরবর্তীতে এই চিকিৎসা পদ্ধতির সাফল্যের পথ ধরে আরো দুইজন সহকর্মী জেমস কলিপ এবং জন ম্যাক্লোয়েডকে সঙ্গে নিয়ে কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর প্যানক্রিয়াস থেকে আরো পরিশুদ্ধ এবং উন্নত মানের ইনসুলিন তৈরি করতে সক্ষম হন তারা।

১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে টরোন্টো হাসপাতালে ১৪ বছরের একটা ছেলে লিওনার্দ থমসন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে মরতে বসেছিল। অনেক হাই ছিল তাঁর ব্লাড সুগার। কিছুতেই কমছিল না। তখন সেই রোগীকে বেন্টিং-ম্যাক্লোয়েডদের তৈরি ইনসুলিন দিয়ে শুরু করা হল চিকিৎসা এবং আশ্চর্যজনকভাবে সেই রোগীর সুগার কমে এলো একেবারে স্বাভাবিক মাত্রায়।

দুই বিজ্ঞানীর নোবেল জয় 

টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে করা তাঁদের এই গবেষণার সাফল্য অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীব্যাপী। আর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯২৩ সালে ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং জন ম্যাক্লোয়েড মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কার তাঁরা অন্য দুই সহকর্মীর সঙ্গেও ভাগাভাগি করেন।

এর পরপরই আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ইলি-লিলি বিরাট বাজেটে এই ইনসুলিন উৎপাদন শুরু করে। ১৯৩৬ সালে প্রথম ইনসুলিন বাজারে আনে নভো নর্ডিস্ক ফার্মা।

প্রথম দিকে গরুর এবং শুকরের ইনসুলিন দিয়ে তৈরি হতো ইনসুলিন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল এই ইন্সুলিনে কারো কারো এলার্জি বা হাইপারসেন্সিটিভিটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। তাই পরবর্তীতে আরো গবেষণা করে মানুষের ইন্সুলিন দিয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ই. কোলাই ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে ইনসুলিন তৈরি শুরু হয়। এবং এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭৮ সালে প্রথম ‘সিন্থেটিক হিউম্যান ইনসুলিন’ তৈরি হয় এবং তাঁর চার বছর পর ১৯৮২ সালে সেই ইলি-লিলি ফার্মা কোম্পানিই তা বাজারজাত করে। যেহেতু মানুষ থেকে এটা তৈরি হয়, এর নাম দেওয়া হয় হিউমুলিন।

প্রথম দিকে এই ইনসুলিন তৈরি হয়েছিল স্লো-এক্টিং বা ধীরে কাজ করবে এমন। সেটা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করত। তবে কালের পরিক্রমায় প্রয়োজনের তাগিদে এই ইনসুলিনের এখন বিভিন্ন রূপ দেওয়া হয়েছে। রেগুলার, র‍্যাপিড, শর্ট এক্টিং, ইন্টারমিডিয়েট, লং এক্টিং, মিক্সড ইত্যাদি। এছাড়াও এখন এটা নেওয়ার জন্য কত সুন্দর সুন্দর ডিভাইস বাজারে এসেছে। যেমন: পেন, পাম্প ও প্যাচ ইত্যাদি।  

পরিশেষে, একশ বছর আগের মিনোস্কি, জোসেফ, স্যার এডুয়ার্ড, বেন্টিং, বেস্ট, ম্যাক্লোয়েড, কলিপদের ওই অসামান্য অবদানের জন্য আজ পৃথিবী ডায়াবেটিস চিনেছে, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা পেয়েছে। মানব জাতির সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা সকল চিকিৎসক-বিজ্ঞানীদের জানাই, বিনম্র শ্রদ্ধা।

আমাদের দেশের সকল মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানুন এবং মানুন। তবেই সুস্থ-সুন্দর জীবন আমাদের সবাই নিশ্চিত করতে পারবো।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ইনসুলিন
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও