ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

চিকিৎসক ও সরকারী চাকুরিজীবী। 


২০ নভেম্বর, ২০১৬ ২১:৪৬

শহীদ ডা. আবু বারেক মোহাম্মাদ নূরুল আলম

শহীদ ডা. আবু বারেক মোহাম্মাদ নূরুল আলম

মুক্তিযুদ্ধ। একটি নাম একটি ইতিহাস। আর এই ইতিহাস যারা সৃষ্টি  করেছেন নিজের জীবন দিয়ে তাঁদের অবদান কোন কালে ভোলার নয়।তাঁরা চির স্মরনীয়,চির অম্লান। এমনি একজন ব্যক্তিত্ব শহীদ ডা.আবু বারেক মোহাম্মদ নূরুল আলম।তিনি ১৯২৯ সালে দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত ধনতলা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। মা-বাবার ১৩ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন এবং বগুড়া জেলার আদমদীঘি থানার সান্তাহার রেলওয়ে হাসপাতালের সহকারী সার্জন হিসেবে কাজে যোগদান করেন।

৭১-এর মার্চ মাসের প্রথমার্ধে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। আন্দোলনে তিনিও মনেপ্রাণে সোচ্চার। সেই সময় নওগা থেকে প্রতিদিন ছোটবড় মিছিল সান্তাহারে আসতো। একদিন লোকোসেডে অবাঙালিরা মিছিলের ওপর বোমা মারে; এতে অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে যায়। তিনি তাদের আন্তরিকভাবে সুচিকিৎসা করেন; এতে অবাঙালিরা ডাক্তার সাহেবের ওপর মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

একটা বাঙালি ছেলে একজন অবাঙালি কর্মকর্তার বাসায় কাজ করতো। সেই অবাঙালি কর্মকর্তা এমন এক জায়গায় বোমা রেখেছিল যেখানে কাজ করতে গিয়ে ছেলেটি বোমায় গুরুতরভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে যায়। ডাক্তার সাহেব তার সুচিকিৎসা করেন এবং তাকে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে পাঠান। এভাবে ডাক্তার বাঙালিদের সেবা করতেন।

অবাঙালিরা আরো হিংস্র হয়ে ওঠে; বাঙালিদের মারতে শুরু করে; বহু বাড়িঘরে পেট্রোল দিয়ে আগুন দিতে থাকে। হাসপাতালেও আগুন দিতে আসে এবং বলে, ‘ডাক্তারের বন্দুক-রাইফেল আছে; থাক এখন আগুন দিব না। দেখি পরে কী করা যায়? এভাবে মাঝে মধ্যেই তারা হাসপাতাল আক্রমণ করতে আসে, আবার ফিরে যায়। হাসপাতালে কর্মচারী ও রোগীসহ প্রায় ৬০-৭০ জন ছিল। ডাক্তার তাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আমি থাকতে আপনাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।

২৫ মার্চ। ভয়াবহ কালরাত্রি  সান্তাহারের অবাঙালিরা হত্যালীলায় মেতে ওঠে। সে রাতে ডাক্তার হাসপাতালে কর্মচারী ও রোগীদের সাথে ছিলেন। খাওয়া ও নামাজের জন্য রাত ১২টার সময় বাসায় আসেন। এমন সময় এক কর্মচারী এসে খবর দেন নওগাঁ থেকে পুলিশসহ আরো কর্মকর্তারা হাসপাতালে এসেছেন; ডাক্তার সাহেবকে ডাকছেন। তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করে জানান যে হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের প্রয়োজন। তখন তারা চারজন পুলিশ রাতে পাহারার জন্য নিয়োজিত করে।

কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে অবাঙালিদের ধ্বংসলীলাও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, পুলিশ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে ভয়ে পালিয়ে চলে যায়। কিন্তু ডাক্তার তখনও হাসপাতালে তার কর্তব্যে অবিচল। আগের রাতের ভয়াবহতার রেশ পরদিন ২৬ মার্চের সকালেও কাটল না। অবাঙালিদের যুদ্ধংদেহী প্রস্তুতি দেখে বাঙালিরা যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে থাকে।

এমন সময় তার এক সহকর্মী ডাক্তার এসে খবর দিলেন যে তিনি সপরিবারে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আরও বললেন, আপনি খুব সাবধানে থাকবেন, বিহারিরা আপনার ওপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। যে কোনো মুহুর্তে হামলা করতে পারে। এমতাবস্থায় ডাক্তার সাহেব তাঁর পরিবারবর্গ, সহকর্মী এবং রোগীদের নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান নেন। কারো মুখে আর কোনো কথা নেই শুধু আল্লাহ, আল্লাহ। মানুষের মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে যেমন হয় ঠিক তেমনই অনুভব।

চারদিকে অরাজততা বাড়তে থাকে। আর এই সময়ও তিনি  গ্রামবাসী, আহত মুক্তিযোদ্ধা ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর চিকিৎসা করতেন যার কারনে পাক-বাহিনী তাঁকে হত্অযা করার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। যেখানেই তাঁকে পাওয় যাবে, সেখানেই  তাকে হত্যা করা হবে। এ খবরে ডাক্তারের পরিবার দিশেহারা হয়ে যায়।

ডাক্তার সাহেব ভারতে যাওয়ার চিন্তা করলেন  কিন্তু অন্যরা বললেন, “আপনি যেতে পারবেন না; থানায় থানায় আপনার নাম আছে। আপনি বিপদে পড়বেন। আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করছেন, তাই আপনার বিপদ। তারা সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন। এক সময় তিনি শহর হতে গ্রামে যান।

কিন্তু ডাক্তার সাহেবের মন ছটফট করছিল। স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছিলেন না। কারন দেশের জন্য কিছু করতে পারছেন না। অস্থিরচিত্তে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান করতে থাকেন। এমতাবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন এক লোক তাকে বললেন, আপনি যদি যেতে চান ব্যবস্থা করে দেব; আপনি ডাক্তার; কিছু ওষুধপত্র আর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে প্রস্তুত থাকবেন; পার করে দেব।

মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা,দেশের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে  তিনি রাজশাহী শহরে যান। সেখানে ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনলেন। এমন সময় এক পুলিশ এসে বললো, “আপনি ডাক্তার! আপনাকে থানায় যেতে হবে। তিনি থানায় গেলেন। তাকে বলা হলো যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ আছে। তারা তাকে আটকে রাখলেন। 

তিনি ১৯৫২ সালে  ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ভাষা আন্দোলনেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পুলিশের লাঠিচার্জ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তিনি সংস্কৃতিমনা ছিলেন। মেডিকেল কলেজে নাটকে-অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। মানুষের সেবা মনপ্রাণ দিয়ে করতেন। অনেক গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতেন অপারেশন করতেন। সমাজের উন্নতির কাজে তাঁর ছিল খুব আগ্রহ।

আটকের ক'দিন পর তাঁকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে স্থানান্তর করা হয়। এভাবে আরও অনেককে আটক করা হয়। প্রতি রাতেই  দখলদার পাক আর্মিরা কাউকে না কাউকে ডেকে নিয়ে যেত। সেই যে তারা যেত। আর ফিরত না। ২০ নভেম্বর রাত ১২টার পর ঐ কক্ষ থেকে ডাক্তার সাহেবের নাম ধরে ডাক পড়ে। আর ডাক্তার সাহেব এ ডাকে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেন নি।

এমনকি তার লাশটিও খুজে পাওয়া যায় নি। আর এভাবেই দেশ একজন চিকিৎসককে হারালো। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হারালো। একজন বুদ্ধিমানকে হারালো। 

 

সংকলনে : মেডিভয়েস।

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) 

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত