ডা. আশিকুর রহমান রুপম

ডা. আশিকুর রহমান রুপম

জেনারেল ফিজিশিয়ান ও স্বাস্থ্য কলামিস্ট। 


২৩ অক্টোবর, ২০২১ ১২:০৩ পিএম

ডায়াবেটিসের ওষুধ আবিষ্কারের ইতিহাস

ডায়াবেটিসের ওষুধ আবিষ্কারের ইতিহাস
ছবি: প্রতীকী

ভাবতে খুবই অবাক লাগে, এক ডায়াবেটিসের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ডায়াবেটিসের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের সীমাহীন পরিশ্রমের ফলে আজ আমরা ঘরে বসে রেডিমেড সব ওষুধ পাচ্ছি। উন্নত বিশ্বে, যেমন: আমেরিকাতে যে ওষুধ পাওয়া যায় তার প্রায় সবই আমাদের দেশে পাওয়া যায়। এখনও গবেষণা চলমান। এই সকল বিজ্ঞানীদের জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা।

তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার রাখার জন্য হলেও আমার মনে ডায়াবেটিসের রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়া উচিত। কি কঠিন জীবন ছিল ১৯২০ এর আগে। ডায়াবেটিসের কোনো ওষুধই ছিল না।

প্রথম ইনসুলিন আবিষ্কার হয় ১৯২১ সালে, রোগীদের উপর প্রয়োগ শুরু হয় ১৯২৩ সাল থেকে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত একে একে মোট ৭ প্রকারের ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। বেশিদিন আগের কথা নয়। এই তো ২০১৩ সালেও নতুন এক রকমের ওষুধ এসেছে দুনিয়াতে।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ইনসুলিন ব্যবহার কেন হয়, তা আপনারা প্রায় সবাই জানেন। আমাদের দেহের অগ্নাশয়ের বিটা কোষ ইনসুলিন ঠিক মতো তৈরি করতে পারছে না (পারলেও দুর্বল প্রকৃতির), সে জন্য বাইরে থেকে একই ইনসুলিন দেওয়া হয়। সুই ফুটাতে হয় বলে এটা কোনোকালেই জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে এখন ইনসুলিন পেন, ইনসুলিন পাম্প বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে উচ্চবিত্তদের মাঝে ‘পাম্প’ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।   

এক টুকরো তথ্য

ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ওষুধ মূলত সাত রকমের হয়ে থাকে। এগুলো কাজ করে আমাদের কিছু অঙ্গের উপর। অঙ্গসমূহ হলো: অগ্নাশয়ের বিটা কোষ, ক্ষুদ্রান্ত্র, লিভার, কিডনি, মাংস পেশি, চর্বি।

মুখে খাওয়ার পর ওষুধ গুলোর মধ্যে রয়েছে, 

১. কেউ কেউ সরাসরি অগ্নাশয়ের বিটা কোষকে গিয়ে বল প্রয়োগ করে/চাপাচাপি করে সেখান থেকে এক প্রকার জোর করে ইনসুলিন বের করে। যেমন: সালফোনাইলিউরিয়া (গ্লিবেনকামাইড, গ্লিমিপেরাইড, গ্লিপিজাইড, গ্লিক্লাজাইড) এবং গ্লিনাইড (রিপাগ্লিনাইড)। সালফোনাইলিউরিয়া আবিষ্কার ১৯৪৫ এবং বাজারে এসেছে ১৯৫০ এর দশকে। গ্লিনাইড এসেছে ১৯৯৭ সালে। এগুলো খুব সুন্দরভাবে খাবারের আগে এবং পরের সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে এগুলো যেহেতু বিটা কোষগুলোকে বল প্রয়োগ করে বা চাবুক চালায় বেশি বেশি ইনসুলিন বের করা জন্য, বিটা কোষগুলো এক সময় ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন আর সরবরাহ করতে পারে না। তাই রোগীকে একটানা না দেওয়াই ভাল। কিছুদিন সেবনের পর খাদ্যাভাস এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের মাধ্যমে চেষ্টা করতে হবে, অন্য গ্রুপের ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার।

২. এর পর কিছু ওষুধ আছে যারা মাংসপেশির মধ্যে সুগার ঢুকিয়ে দেয় (ফলে সুগারের ক্যালরি বার্ন হয়), লিভার থেকে গ্লুকোজ আসতে দেয় না এবং খাবার খাওয়ার পর অন্ত্র থেকে সুগারকে রক্তে বেশি যেতে দিতে চায় না। এরা হলো: মেটফরমিন। ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ডায়াবেটিসের সব চেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রচলিত ওষুধ। এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। যদিও বর্তমানে একে ‘ওজন নিরপেক্ষ’ ওষুধ বলা হয়।

এরা ক্ষুদ্রান্ত্রেও কাজ করে, ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে সুগার রক্তে যেতে দিতেও বাধা দেয়, ফলে রক্তের সুগার ঢোকার পরিমাণ কমে যায়। তবে এতে অনেকে এসিডিটি এবং বদ হজম হতে পারে।

৩. এ রকম মাংস পেশি এবং চর্বির মধ্যে গ্লুকোজ ঢুকিয়ে দেওয়া আরেকটা ভাল ওষুধ আছে, তা হল ‘গ্লিটাজন’ (থায়াজলেডিনেডিওন)। যেমন: পাইওগ্লিটাজন। এরা ১৯৯৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। এরা ইন্সুলিন রেজিস্ট্যান্ট কমাতে সাহায্য করে। তবে এরা অনেকের বিশেষ করে যাদের হার্ট দুর্বল (হার্ট ফেইলিয়রের রোগী) ফ্লুইড রিটেনশন করে অর্থাৎ রক্তে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা হার্টের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তবে হার্টের রোগী নয়, এমন ডায়াবেটিক রোগীদের অল্প ডোজে দিলে তেমন কিছু হয় না।

এবারে আসা যাক, ক্ষুদ্রান্ত্রে। ক্ষুদ্রান্ত্র হল আমাদের পেটের ভেতরের নাড়িভুড়ি। এখানে কাজ করে বেশ কয়েকটা ওষুধ।

৪. সবার আগে বলা যাক, আলফা গ্লুকোসিডেজ ইনহিবিটর নিয়ে। এদের আবিষ্কার ১৯৯৫ সালে। এরা ক্ষুদ্রান্ত্রের এনজাইমকে (আলফা গ্লুকোসিডেজ) বাধা দেয়, কারণ এটাই ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে রক্তের মধ্যে সুগার পাঠায়। এদেরকে বাধা দিলে যখনই শর্করা বা কার্বোহাইড্রেড জাতীয় খাবার আমাদের অন্ত্রে আসে, সেগুলোকে আর রক্তে যেতে পারে না। ফলে রক্তে কম সুগার যায়। যেমন: একারবোস, ভোগ্লিবোস, মেগ্লিটল ইত্যাদি।

৫. এরপর আসি, ডিপিপি-৪ ইনহিবিটর নিয়ে। আমাদের সবারই ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে কিছু হরমোন বের হয়। যেমন: জিএলপি-১, জিআইপি। এই দুইটাকে বলে ইনক্রেটিন। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা যখন খাবার খাই, সেই খাবার পেটে পৌঁছালে এই দুই জন ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে অগ্নাশয়ে গিয়ে ইনসুলিন নিঃসরণের জন্য তাগিদ দেয়, ফলে ইনসুলিন বের হয় এবং খাবারের পর সুগার কমে। কিন্তু এখানে বাঁধ সাধে এক ভিলেন, তার নাম হলো ডিপিপি-৪ এনজাইম। এই ডিপিপি-৪, ওই দুইজনকে নষ্ট করে দেয়। ফলে ভাল কাজটা আর করা হয় না। এই জন্য ভিলেনকে মারার ওষুধ হলো ডিপিপি-৪ ইনহিবিটর সংক্ষেপে বলে ‘গ্লিপ্টিন’। এটা গিয়ে ভিলেনকে আটকে রাখে, আর ওই দুইজন গিয়ে ইনসুলিন বের করায়। এরা কিন্তু খুব বেশি দিন হয়নি আবিষ্কারের। ২০০৬ সালে আসে বাজারে। এদের নাম হল সিটাগ্লিপ্টিন, লিনাগ্লিপ্টিন, ভিল্ডাগ্লিপ্টিন ইত্যাদি। কিডনির রোগীদের শুধুমাত্র লিনাগ্লিপ্টিন দেওয়া যায়। বাকিগুলো যায় না।

৬. এদের বের হবারও এক বছর আগে অর্থাৎ ২০০৫ সালে আবিষ্কৃত হয় ওই দুইজনের সরাসরি একজনের মত কৃত্রিম হরমোন, যার নাম জিএলপি-১ এনালগ। ভিলেন যখন সত্যিকারে ওই দুই হরমনকে আটকাতে ব্যস্ত, এই কৃত্তিম জিএলপি-১ গিয়ে ইনসুলিন বের করায়। তবে এটা এখনও আমাদের দেশে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। এটাও ইঞ্জেকশনে পাওয়া যায়। মুখে খাবার ওষুধও আছে। কিন্তু সব জায়গায় পাওয়া যায় না।

৭. এরপর আসা যাক, কিডনির উপর কাজ করে সুগারকে মূত্রের মাধ্যেম শরীর থেকে বের করে দেয়, এমন কিছু ওষুধ। যেটা সবচেয়ে সাম্প্রতিক সময়ের আবিষ্কার, যেটা এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কারণ এটা হার্টকে ভাল রাখতে সাহায্য করে, কিডনি ভাল রাখতে সাহায্য করে, যাদের নাম হলো এসজিএলটি-২ ইনহিবিটর বা ‘গ্লিফ্লোজিন’। ২০১৩ সালে এটা আবিষ্কৃত হয়। এম্পাগ্লিফ্লোজিন, কানাগ্লিফ্লোজিন ও ড্যাপাগ্লিফ্লোজিন হলো এই গ্রুপের ওষুধ।

বুঝতেই পারলেন, ওষুধগুলো একদিনে পৃথিবীতে আসেনি। দীর্ঘ গবেষণা এবং মানুষের উপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফসল। এক ওষুধ সবার জন্য নয়, আবার একই মানুষের জন্য একটা ওষুধই চিরকাল খেয়ে যেতে হবে, এমনটাও নয়। সময়ের আবর্তে, সুগার কেমন কন্ট্রোলে থাকে এর উপর নির্ভর করে ওষুধ পরিবর্তন করতে হয়। কারণ একই মানুষের সময়ের পরিক্রমায় লাইফ স্টাইল, খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং অন্যান্য রোগের আগমন হতে পারে। আর সে জন্যই ডায়াবেটিসের রোগীদের নিয়মিত চেক-আপ বা ফলো-আপে থাকতে হয়।

আমি ডাক্তার হবার সুবাদে নিজের বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস মনিটরিং নিজেই করতে পারি, আলহামদুলিল্লাহ। তবে সারাদেশে সবার জন্য একটা সমিতি করে, প্রত্যেকটা বিভাগে, এমন কি জেলাতে যে মহান মানুষটা ডায়াবেটিস হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, যে সকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারাদিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবাদান, গবেষণা, ট্রেনিং দেওয়া হয়, সেই ক্ষণজন্মা মানুষটার নাম হলো অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। দেশে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় বারডেম হাসপাতালের এই প্রতিষ্ঠাতার অবদান অতুলনীয়। চিকিৎসা পেশার এ দিকপালকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত