অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ (টাবলু)

অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ (টাবলু)

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নিওনেটাল সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,
প্রকল্প পরিচালক, ন্যাশনাল চিলড্রেন হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট


২২ অক্টোবর, ২০২১ ০৬:৪৩ পিএম

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার সম্মানে বিনা পারিশ্রমিকে ১০০১ কিডনি প্রতিস্থাপন অধ্যাপক কামরুলের

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার সম্মানে বিনা পারিশ্রমিকে ১০০১ কিডনি প্রতিস্থাপন অধ্যাপক কামরুলের
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের বন্ধু অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার সম্মানে বিনা পারিশ্রমিকে ১০০১ কিডনি প্রতিস্থাপন ও ফ্রি মাসিক ফলোআপ করেছেন। আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৪০তম ব্যাচের ফাস্ট বয় কামরুল ইসলাম, এফসিপিএস (সার্জারি), এফআরসিএস (ইডিন), এমএস (ইউরোলজি)। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ পাকশী ইক্ষু গবেষণা ইস্টিটিটিউটের আরনোমিস্ট ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আমিনুল ইসলামের চার পুত্রের মধ্যে দ্বিতীয় কামরুল ইসলাম।

ডা. কামরুল ইসলাম চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ পাকশি থেকে ১৯৮০ সালে এসএসসিতে মেধা তালিকায় ১৫তম স্থান অর্জন করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। পরে এইচএসসিতে দশম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন আটটি মেডিকেল কলেজের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালের ৬ এপ্রিল আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে এক সাথে ক্লাস শুরু করি।

কামরুলের বাবার অপরাধ ছিল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাসায় রাতে মিলিত হতেন। ফলশ্রুতিতে, একরাতে বিহারি ও রাজাকারেরা এসে তাঁর বাবাকে হত্যা করে। তাঁর শহীদ বাবার সম্মানে স্বাধীনতার পর ঈশ্বরদীর সেই এলাকার নামকরণ করা হয় আমিনপাড়া। স্বামীহারা এসএসসি পাস মা, চার ছেলেকে মানুষ করার জন্য ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আবার পড়াশোনা শুরু করেন। এইচএসসি পাস করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সমাজবিজ্ঞানে প্রথম স্থান অধিকার করে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে খালাম্মা অধ্যাপিকা রহিমা খাতুন লালমাটিয়া মহিলা কলেজে যোগদান করেন।

আমরা ঢাকা মেডিকেল থেকে ১৯৮৯ সালে পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষ করি। ১৯৯০ সালে পরবর্তীতে একাদশ বিসিএসে ১৯৯৩ সালের ১ এপ্রিল স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদান করি। ডা. কামরুল পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ট্রেনিং পদে যোগ দেন এবং সার্জারিতে এফসিপিএস ও এডিনবরা রয়েল কলেজ থেকে এফআরসিএস পাস করেন। পরবর্তীতে ইউরোলজিতে ৫ বছর মেয়াদি এমএস প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন এবং জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি (নিকডু) হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন।

২০০৭ সালে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু করেন। পরবর্তীতে আমাদের বন্ধু, কামরুল সরকারি হাসপাতালে কাজের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ২০১১ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন এবং শ্যামলীতে স্বল্পমূল্যে কিডনি রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য নিজস্ব কিডনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেজ অ্যান্ড ইউরোলজি বা সংক্ষেপে সিকেডি অ্যান্ড ইউরোজজি। লালের মধ্যে সাদা নিয়ন সাইন রাস্তার উপর চোখে পরে।

ডা. কামরুল শহীদ বাবার সম্মানে কিডনি প্রতিস্থাপন করার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না। পাশের দেশেও যেখানে ২৫-৩০ লাখ টাকা করচ হয়; সেখানে কামরুলের হাসপাতালে খরচ মাত্র দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। সে বাদে তার ১২ সদস্যের টিমের সদস্যদের ওষুধপত্র ও অপারেশনের আনুসাঙ্গিক খরচ, থাকা-খাওয়া।

কিডনি ডোনারের শরীর থেকে নিয়ে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপনের আগে যে, কম মূল্যের প্রেজারভেটিভ সলিউশন (preservative solutions) এ রাখে তাও তার আবিষ্কার এবং এ জন্য ইউরোলজিস্টদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জন্সস তাঁকে গোল্ড মেডেল দিয়ে যথার্থ সম্মান জানায়।

তাঁর হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১০০  রোগী সেবা নিতে আসে এবং খুবই কম মূল্যে সার্জারিসহ সেবা পান। আমাকে একবার এক ছোট ভাই ইউরোলজিস্ট বললো, টাবলু ভাই আপনার বন্ধুর জন্য আমরা প্র্যাকটিস করতে পারবো না! আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন, কি হয়েছে? ‘কামরুল ভাই ত নাম মাত্র খুবই অল্প খরচে প্রোস্টেটসহ অন্যান্য অপারেশন করেন।’

ওর হাসপাতালের ২২ বেডের ডায়ালাইসিস ইউনিটে ডায়ালাইসিসের খরচ মাত্র ১৫০০ টাকা, আইসিইউ বেডের খরচ ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। আমাদের সদা হাস্যময় অসম্ভব বিনয়ী বন্ধু কামরুলকে তার মা, ভাই, বউ ডা. সাথী, তিন কন্যাসহ পরম করুনাময় ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন, দীর্ঘদিন মানুষের সেবা দেওয়ার সুযোগ দিন।

নিশ্চয় জাতি নিভৃতচারী এই গুণী শিক্ষক ও সার্জনকেও যথোপযুক্ত সম্মান জানাতে কার্পণ্য করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি