২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৩৩ পিএম

‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারসহ ১১ দফা দাবিতে হোমিও চিকিৎসকদের মানববন্ধন

‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারসহ ১১ দফা দাবিতে হোমিও চিকিৎসকদের মানববন্ধন
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করছেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের নামের আগে ডাক্তার লেখার অধিকারসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ছাত্র অধিকার সংগঠন। বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে এ দাবি জানান তারা।

সম্প্রতি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার বেআইনি ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ১১ দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হাইকোর্টের রায়ের প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করে ডাক্তার লেখার মৌলিক অধিকার ও রায়ের পর্যবেক্ষণে হোমিওপ্যাথির জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন, ডিএইচএমএস কনডেন্স কোর্স চালু করা ও উচ্চ শিক্ষার পথ প্রশস্ত করা, ডিএইচএমএস কোর্সের মান নিশ্চিত করা, ডিএইচএমএস ডাক্তারদের সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা ও বিএইচএমএস ডাক্তাদের চাকরির সুযোগ বর্ধিত করা, হোমিওপ্যাথির জন্য কল্যাণকর হোমিওপ্যাথিক আইন প্রতিষ্ঠা করা, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা, দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে হোমিওপ্যাথির আলাদা ইউনিট তৈরি করা এবং সরকারিভাবে হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথি সেবা নেন। মামলায় হোমিওপ্যাথিক বোর্ডসহ হোমিওপ্যাথিক সমাজের কোনো চিকিৎসককে পক্ষ বা বিপক্ষ করেনি। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ডাকা হয়নি। আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই আদেশ দিয়েছেন, যা হোমিওপ্যাথিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।’

বক্তারা আরও বলেন, ‘হোমিওপ্যাথিক বিষয়ে আলাদা আইন আছে। এর নাম, দ্যা বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিশনার্স অরডিন্যান্স ১৯৮৩। এ আইনের ৩৩-এর এ ধারা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর সেকশন ২ অনুসারে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করা বৈধ।’

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ছাত্র অধিকার সংগঠনের সভাপতি আরমান হোসাইন বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ৪ বছর ৬ মাস কলেজে লেখাপড়া করে সরকারি সকল ফিস পরিশোধ করে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে নামের আগে কেন ডাক্তার লিখতে পারব না? পেশাগত জীবনে আমরা আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকেরা আইনগতভাবে নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহারের অধিকার রাখেন। কিন্তু রায়ের কপিতে লেখে না বলে আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি আশা করি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের মাধ্যমে আমাদের অধিকার ফিরে আসবে।’ 

মানববন্ধন শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি।

এর আগে গত ১৪ আগস্ট বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ৭১ পৃষ্ঠার এক রায়ে বলা হয়েছে, দুঃখজনকভাবে এটি লক্ষ্যণীয় যে, এখানে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ এর ২৯ ধারা অনুযায়ী বিএমডিসি এর নিবন্ধনভুক্ত মেডিকেল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের পূর্বে ডাক্তার (Dr.) পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। সেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিগত ২০১৪ সালের ৯ মার্চ তারিখের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার’ (Alternative Medical Care) শীর্ষক অপারেশনাল প্লানের বিভিন্ন পদে কর্মরত হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কর্মকর্তাদের স্ব-স্ব নামের পূর্বে ডাক্তার (ডা.) পদবি সংযোজনের অনুমতি প্রদান করেছে, যা এক কথায় আইনের কর্তৃত্ব ব্যতিত তথা বেআইনি। 

এছাড়াও বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড কর্তৃক ইংরেজি ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন শাখায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদেরকে তাদের নামের পূর্বে পদবি হিসেবে ডাক্তার (Dr.) ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করাও বেআইনি।

এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড থেকে ডিএইচএমএস সনদপ্রাপ্ত ও ডিপ্লোমাধারী নিবন্ধিত চিকিৎসকগণ তাদের নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানায় বোর্ড। 

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের রেজিস্ট্রার-কাম-সেক্রেটারি ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জারিকৃত ‘দি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক প্র্যাক্টিশনার্স অর্ডিন্যান্স-১৯৮৩’ এর চ্যাপ্টার ৬ এ অন্তর্ভুক্ত ধারা ৩৩(এ) মোতাবেক বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড থেকে সাটিফিকেটধারী চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে ডাক্তার লিখতে পারবেন।

এরই ধারাবাহিকতায় হোমিওপ্যাথিক ও ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রিধারীরা নামের পূর্বে ডাক্তার ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ে করেছিলেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করেন।

রায়ে বলা হয়, বিকল্পধারার চিকিৎসা পদ্ধতির পেশাধারীরা নামের আগে ইন্ট্রিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান (Integrated Physician), কমপ্লিমেন্টারি ফিজিশিয়ান (Complementary Physician), ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন প্র্যাকটিশনার (Integrated Medicine Practitioner) এবং কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন প্র্যাকটিশনার (Complementary Medicine Practitioner) পদবি ব্যবহার করতে পারেন। পাশের দেশ ভারতেও বিকল্প ধারার চিকিৎসকরা (Dr.) লিখতে পারে না। 

এতে আরও বলা হয়েছে, বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন। সুতরাং পাঁচ হাজার বছর ধরে পুরো পৃথিবীতে চলে আসা প্রাচীন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির যথাযথ এবং সঠিকভাবে পঠন এবং প্রশিক্ষণ জনমানুষের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন করবে। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি তথা পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতি আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়া শুরু হয় আজ থেকে মাত্র ১৬২ বছর আগে। পৃথিবীর প্রথম প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির আইনটির নাম ‘দ্য মেডিকেল অ্যাক্ট, ১৮৫৮’ (The Medical Act, 1858), যা ইংল্যান্ডের সংসদ পাস করেছিল। অর্থাৎ ১৮৫৮ সালের আগে চিকিৎসা ব্যবস্থা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না। অপরদিকে পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে মানুষ বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে আসছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। অর্থাৎ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। প্রত্যেক নাগরিক তার বিবেকের মাধ্যমে এবং চিন্তার মাধ্যমে কোন পদ্ধতির চিকিৎসা তথা প্রচলিত/পশ্চিমা/অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণ করবেন নাকি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করবেন, এটি সম্পূর্ণ তার মৌলিক অধিকার।

অপরদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪০ অনুযায়ী আইনের দ্বারা অরোপিত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো পেশা (Profession) গ্রহণের অধিকার তার মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক প্রচলিত চিকিৎসক হবেন, নাকি বিকল্প ধারার চিকিৎসক হবেন, এটি তার মৌলিক অধিকার।

সুতরাং বিকল্প ধারার কিংবা প্রচলিত চিকিৎসক হওয়ার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো প্রস্তুত করে দেওয়া সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি