২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৭:৪১ পিএম

অপ্রতিরোধক রোগ আলঝেইমার, চাই সচেতনতা

অপ্রতিরোধক রোগ আলঝেইমার, চাই সচেতনতা
আলঝেইমারে আক্রান্ত একজন রোগী।

সাখাওয়াত হোসাইন: চট্টগ্রামের বাসিন্দা শামসুল আরেফিন (ছদ্মনাম)। এবার তিনি ৬২ বছরে পাঁ দিবেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরি জীবন শেষ করে অবসরে গিয়েছেন তিন বছর হলো। পাঁচজন সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের কর্ণধার। গত কয়েক বছর ধরে আগের মতো স্বাভাবিক চলাফেরা করছেন না তিনি। হুট করেই রেগে যান। আবার হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝেই মন-মেঝাজ ভালো থাকে না তাঁর। ক্রমেই সব কিছু ভুলে যাচ্ছেন। ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করছেন না। নেই আগের চঞ্চলতা, আনন্দ-ফূর্তি।

জানতে চাইলে শামসুল আরেফিনের স্ত্রী আমিনা বেগম (ছদ্মনাম) মেডিভয়েসকে বলেন, শামসুল আরেফিনের বয়স যখন ৫৮ বছর, তখন থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। এরপর ঠুনকো কারণে বিরক্ত হয়ে যান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে হয়েছে যুক্ত নতুন মাত্রা। তাহলো: স্মৃতিভ্রম; নিজের জানা বিভিন্ন কিছু ভুলে যেতে থাকেন তিনি।

আমিনা বেগম বলেন, অনেক কাজে সাফল্যের সম্ভাবনা থাকলেও অল্পতেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন তার স্বামী। নতুন কোনো কাজে হয়ে পড়েন দ্বিধাগ্রস্ত। বর্তমানে নিজের যত্ন নিতে পারেন না, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী—কাউকেই চিনতে পারেন না; বুঝতে পারেন না কারও কথাবার্তা।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে শামসুল আরেফিনকে শুরু থেকে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। তবে কিছুদিন আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তিনি আলঝেইমারে আক্রান্ত।

আলঝেইমারে আক্রান্ত হওয়ার কারণ?

আলঝেইমার হলো মস্তিষ্ক বা ব্রেনের এক ধরনের ক্ষয়জনিত রোগ। এতে সাধারণত স্মৃতিভ্রংশ হয়ে যায়, মানুষ নিজের স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলে।

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আলঝেইমার হলো ভুলে যাওয়া—সংক্রান্ত একটি রোগ। ভুলে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এটা সাধারণত বয়স্কদের বা ৬৫ বছর পার হওয়া মানুষের এ রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি।’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (নিন্স) ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডিমেনশিয়া রোগের অন্যতম আলঝেইমার। ডিমেনশিয়া দুটি ধরন আমরা জানি। সেগুলো হলো: ১. রিভারসেবল কজ অর্থাৎ যে রোগগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ২. ইরিভারসেবল কজ অর্থাৎ যে রোগগুলো থেকে ভালো হওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্রেনে ট্রমা, টিউমার ও ইনফেকশন হলে ডিমেনশিয়া হতে পারে। এসব রোগের চিকিৎসা করলে ভালো হওয়া সম্ভব। আলঝেইমারস ডিজিজ যেটা  ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ৬০ ভাগ মানুষের হয়ে থাকে। এটা আসলে জেনেটিক কারণে জিন থেকে হয়ে থাকে বলে ইরিভারসেবল কজ। এ রোগ থেকে ভালো হওয়া সম্ভাবনা নেই। এটা আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যায়।’

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, ব্রেনের মধ্যে কিছু ক্যামিকেল রিয়েকশনের মাধ্যমে ব্রেনটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে মানুষের স্মৃতি লোপ পেতে থাকে।’

আলঝেইমারের লক্ষণ

আলঝেইমার কোনো সংক্রমণ রোগ নয় বলে জানিয়েছেন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. বাহাদুর আলী মিয়া মেডিভয়েসকে বলেন, আলঝেইমার রোগের অন্যতম একটি কারণ হলো বয়সের সাথে সাথে ব্রেন ভ্রংশ হয়ে যাওয়া। এ রোগে আক্রান্তরা সহজেই বিরক্ত হয়ে যান, প্রায়ই হতাশাগ্রস্ত দেখা দেয়। এর ফলে দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে রোগীরা নিজে নিজের যত্ন নিতে পারেন না, নিজের মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী—কাউকেই চিনতে পারেন না। গোসল করা, টয়লেট করা, কাপড় পরা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কারও সাহায্য ছাড়া করতে পারেন না। দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চিনতে পারেন না। খাবার গ্রহণ করার পরপরই তা ভুলে যান, হাঁটাচলা করতেও সমস্যা হয়। এ সময় রোগীর সংক্রমণ, জ্বর, ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, রক্ত শূন্যতা, পুষ্টিহীনতা, ডিহাইড্রেশন ইত্যাদিও দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, রোগের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে রোগী দ্বিধাগ্রস্ততা, অস্থিরতা, রোষপ্রবণতা, ভাষা ব্যবহারে অসুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশতা দেখা দেয় এবং ক্রমান্বয়ে শারীরিক ক্রিয়াকর্ম বিলুপ্ত হয়ে অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন।

কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হয়?

আলঝেইমার হলো নিউরোলজি সম্পর্কিত একটি রোগ। যিনি এই রোগে আক্রান্ত হন,  তিনি কখনও বুঝতে পারেন না। ফলে বুঝতে পারেন না, কখন চিকিৎসা করা দরকার। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর স্বজনদের বুঝতে হবে, কখন এবং কোন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. বাহাদুর আলী বলেন, আলঝেইমার যেহেতু ব্রেনের একটি অসুখ। রোগীদের সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসক হলো নিউরোলজিস্ট। যদি আশপাশে নিউরোলজিস্ট না পাওয়া যায়, তাহলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা সাইক্রিয়াটিস্ট। আর সবচেয়ে ভালো হলো, যে হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগ আছে সেখানে চিকিৎসা করানো। 

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জহিরুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে নিউরোলজিস্ট সংখ্যা একেবারেই কম। এক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে রয়েছে। এজন্য সরকারেরর প্রয়োজন নিউরোলজিস্ট বাড়ানোর ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া।

প্রতিরোধের উপায়

ডা. বাহাদুর আলী বলেন, ‘একটি রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা গেলে তা প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ জানা যায়নি। আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধের তেমন কোনো পথ নেই। তবে লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে যদি আমরা চিকিৎসা শুরু করি, আজকাল সহজলভ্য কিছু মেডিসিন রয়েছে। সে মেডিসিনের প্রাপ্যতাও রয়েছে। সেগুলো যদি আমরা প্রয়োগ করতে পারি। তাহলে এই রোগটাকে একটু দমানো যায় বা সাময়িকভাবে প্রতিরোধ করা যায়। 

তিনি আরও বলেন, একটা রোগী এখন যে অবস্থায় আছে, সে যদি খারাপ অবস্থায় থাকে বা চিকিৎসা না নেয়। তাহলে পাঁচ বছর পর যে অবস্থায় যাবে। যদি আমরা চিকিৎসা করি তাহলে সে হয়তো এ পরিস্থিতিতে যেতে যেতে দশ বছর সময় লেগে যাবে। এ রোগীকে আমরা অতিরিক্ত পাঁচ বছর ভালো একটা জীবন কাটাতে দিতে পারি। এ রোগ প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। কেউ আক্রান্ত হলে পুরোপুরি সুস্থ হবেন না, তবে সাময়িকভাবে উন্নতি হবে। এ রোগীদের ঘুম না হলে ঘুমের ব্যবস্থা করা যাবে। প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে না থাকলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

ডা. মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, ধারণা করা হয়, যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, হেলথদি ডায়েট যারা করে না, এসব মানুষের আলঝেইমার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে আলঝেইমার থেকে সুরক্ষার জন্য লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করতে হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানলে ধারণা করা হয়, আলঝেইমার থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাওয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, আলঝেইমার সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং সচেতনতা খুবই কম। এই রোগটি আমাদের দেশে খুবই কম। গ্রামে-গঞ্জে সে সমস্ত রোগীগুলো ছড়িয়ে আছে, ওই রোগীদের স্বজনরা মনে করে বয়স হয়েছে এখন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আর কি হবে? শহরের যারা আছেন, তারা অনেকেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসে। এজন্য এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. জহিরুল হক বলেন, এবারের আলঝেইমার দিবসের স্লোগান হলো ‘আলঝেইমার সম্পর্কে জানুন, ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতন হোন, রোগীর প্রতি যত্নবান হোন।’  তাহলে আলঝেইমার জয় করা যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘এ রোগটি প্রতিরোধ করতে হলে দেশের উপর পর্যায় থেকে একটি নীতি নির্ধারণ করতে হবে। যেমন: আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগীর হোম কেয়ার হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হোম কেয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা পারিবারিকভাবে কতটুকু পারি। আমরা অনেক কিছু জানি না, বুঝি না। এটার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যারা রোগীকে যত্ন নেবে। রোগীর ওষুধগুলো ঠিকমত খাওয়াতে হবে এবং ঠিকমত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। রোগীর ব্যক্তিগত হাইজিং ঠিক করতে হবে। রোগীর সাথে সবসময় সুন্দর ব্যবহার করতে হবে। রোগীকে নেতিবাচক কোনো কথা বলা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগীকে সব সময় পরিচিত জায়গায় এবং পরিচিত লোকের মাঝে রাখতে হবে। এতে রোগী আস্তে আস্তে ভালোর দিকে যাবে।  এজন্য ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ করা জরুরি। সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর তা না হলে ২০৩০ সালের দিকে এ সংখ্যাটা ভারি হয়ে যাবে এবং দেশের জন্য একটা অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন রোগের গাইডলাইন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। ডিমনেশিয়ারও যদি একটি গাইডলাইন তৈরি করতে পারি, তাহলে দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’

আলঝেইমারে আক্রান্তদের পরিসংখ্যান নেই 

বাংলাদেশ আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কত? সে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা কোনো সংগঠনের সুনির্দিষ্টভাবে কারও কাছে নেই। তবে গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬০ বছর বয়সের বেশি মানুষের শতকরা ৮.১ ভাগ মানুষ আলঝেইমারে আক্রান্ত। ২০৩০ সালে এ সংখ্যাটা দ্বিগুণ হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ‘আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা এখনও আমরা বের করতে পারিনি। এজন্য জাতীয় উদ্যোগে বড় ধরনের একটি পরিসংখ্যান প্রয়োজন।’ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি