১৭ নভেম্বর, ২০১৬ ০২:৫৬ পিএম

অসংক্রামক ব্যাধি: পরিস্থিতি, প্রতিকার ও করণীয়

অসংক্রামক ব্যাধি: পরিস্থিতি, প্রতিকার ও করণীয়

১৮ অক্টোবর ২০১৬, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘অসংক্রামক ব্যাধি: পরিস্থিতি, প্রতিকার ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য ক্রোড়পত্রে ছাপা হলো।

আব্দুল কাইয়ুম: 

সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে আসছে। এখন অসংক্রামক ব্যাধির প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অসংক্রামক ব্যাধিতে মানুষ অনেক বেশি হারে আক্রান্ত হচ্ছে।অসংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, কিডনি রোগসহ আঘাতজনিত রোগ মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আলোচনায় এসব বিষয় আসবে। এখন আলোচনা করবেন এ কে এম মহিবুল্লাহ

এ কে এম মহিবুল্লাহ

এ কে এম মহিবুল্লাহ: বর্তমানে বিশ্বের প্রধান সমস্যা অসংক্রামক ব্যাধিসমূহ। এগুলোকে এখন অন্যতম ঘাতক ব্যাধি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের প্রতি তিনটি মৃত্যুর একটি হলো অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যু। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমসম্প্রসারণশীল ব্যাধি।

হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনির জটিলতা, হরমোনের জটিলতা, ফুসফুসের সমস্যা, আঘাতজনিত সমস্যা—এসবই অসংক্রামক ব্যাধি। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে যত মৃত্যু হয়, তার ৫৯ শতাংশ হয় অসংক্রামক ব্যাধির জন্য।

এর মধ্যে ১৭ ভাগ হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকে, ১১ ভাগ ফুসফুসের জটিলতায়। ১০ ভাগ ক্যানসারে ও এককভাবে ডায়াবেটিসে ৩ ভাগ। অন্যান্য অসংক্রামক ব্যাধিতে মারা যায় ১৮ ভাগ।

বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকিসমূহ ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাবে। অসংক্রামক ব্যাধি কখনো নির্মূল করা যাবে না। তবে একে শক্তভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ফ্রেড হার্শ

ফ্রেড হার্শ: যেসব কারণে অসংক্রামক ব্যাধি হয়, সেগুলো প্রতিরোধের জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব শ্রেণির মানুষকে অসংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব।

অসংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে যতটুকু মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, ততটুকু দেওয়া হয়নি। ফলে অসংক্রামক ব্যাধি বিশ্বে এখন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। অসংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার একটা বড় মাধ্যম হলো ব্যায়াম। ব্যায়ামের ক্ষেত্রে জনসাধারণকে সচেতন করা প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগরে ব্যায়ামের তেমন সুযোগ নেই। এখানে হাঁটার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। তারপর পরিবেশের বাধা রয়েছে। মানুষ যেন ধূমপান না করে, তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

সবাইকে রোগপ্রতিরোধের জন্য কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে অনেক বেশি সচেতন করতে হবে।

সোহেল রেজা চৌধুরী

সোহেল রেজা চৌধুরী: দেশে ব্যাপক হারে তামাকের ব্যবহার রয়েছে। ২০১০ সালে গ্লোবাল টোব্যাকোর এক জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ পুরুষ ধূমপান করে। নারীরা ধূমপান বেশি না করলেও জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে।

এ দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করে। বিশ্বের বহু দেশে মোট জনসংখ্যাও চার কোটি নয়। শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই, যা তামাকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বিশেষ করে হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। তামাকের মারাত্মক ক্ষতিকর ঝুঁকি সম্পর্কে সবাই জানি। তরপরও এর ব্যবহার কমানো যাচ্ছে না।

২০০৫ সালে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন হয়েছে। ২০১৩ সালে এর সংশোধনী এনে আরও কঠিন করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আইনের প্রয়োগ।

আইনে উল্লেখিত জনসমাগম স্থলে বা পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষেধ। কিন্তু এ আইন প্রায় ​ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সর্তকবা​ণী মুদ্রণের ক্ষেত্রেও আইন মানা হচ্ছে না।

মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী

মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী: বিশ্বে পুরুষের সবচেয়ে বেশি লাং ক্যানসার হয়। এর প্রধান কারণ ধূমপান। লাং ক্যানসার, মুখের ভেতরের ক্যানসার, স্বরযন্ত্রের ক্যানসার‍—এসব ব্যাধি পুরুষদের বেশি হয়ে ​থাকে। নারীদের বেশি হয় জরায়ু ক্যানসার, স্তন ক্যানসার ও মুখের ভেতরের ক্যানসার।

বিশ্বে মুখের ক্যানসারের হার কম। কিন্তু আমাদের দেশের পুরুষ ও নারী উভয়ের এই ক্যানসার বেশি হয়। এই উপমহাদেশে মুখের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। এর অন্যতম, প্রধান কারণ ধূমপান ও ধোঁয়া​বিহীন তামাক, যেমন জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি সেবন।

প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। আমরা যদি সতর্ক থাকি, তাহলে ৫০ শতাংশ ক্যানসার–ঝুঁকি কমাতে পারি।

এ জন্য প্রথম কাজ হলো ধূমপান থেকে দূরে থাকা। আবার কেউ যদি ক্যানসারে আক্রান্ত হন, সেটা যদি শুরুতেই ধরা পড়ে, তাহলে ক্যানসার সম্পূর্ণ ভালো হয়। প্রধান কথা হলো সচেতনতা। আমরা যদি সবাই সচেতন থাকি, তাহলে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হব না।

খন্দকার আবদুল আউয়াল

খন্দকার আবদুল আউয়াল: সংক্রামক ব্যাধি রয়েছে। অপুষ্টি রয়েছে। এ জন্য অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার অসংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ, এটি আমাদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।

সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় চার কোটি মানুষ মারা যায় অসংক্রামক ব্যাধিতে। এর ৮০ শতাংশই মারা যায় আমাদের মতো দরিদ্র দেশে। দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে অসংক্রামক ব্যাধি একটা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এর অন্যতম একটি কারণ হলো আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। দেশের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গড় আয়ু বাড়ছে। আগে দেশের মূল জনসংখ্যার মূল অংশ ছিল শিশু। এখন যুবক ও মধ্যবয়স্ক। অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তাঁদেরই ​বেশি।

মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ​ওজন ইত্যাদিসহ অন্যান্য অসংক্রামক ব্যা​ধি ​থেকে অনেক ক্ষেত্রে দূরে থাকা সম্ভব।

এম আমজাদ হোসেন

এম আমজাদ হোসেন: সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভয়াবহ সময় পার করছি আমরা। প্রতিদিন রাস্তায় ১০ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রায় সবাই পুলিশের ঝামেলা এড়াতে চায়, তাই দুর্ঘটনার সব খবর পুলিশের কাছে যায় না।

ব্যক্তিমালিকানার হাসপাতালগুলো বর্তমানে অনেক দায়িত্ব পালন করছে।সরকারি হাসপাতালের পক্ষে এত রোগী সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কোনো দুর্ঘটনায় একজন নিহত হলে সেখানে কমপক্ষে ১০ জন গুরুতরভাবে আহত হয়। অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হচ্ছে। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছর। তারাই পরিবারে আয় করে।

আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ বেড ছেড়ে দিতে হয় দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য।

এ অবস্থায় অন্য রোগীরা সেবা পাওয়ার সুযোগ পায় না। মিশুক মুনীর মরে প্রমাণ করেছেন, সড়ক কত ঝুঁকিপূর্ণ। এর সমাধানে অনেক আলোচনা করেছি, তেমন কোনো সমাধান এখনো হয়নি। বিষয়টি সবাইকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

এ কে আজাদ খান

এ কে আজাদ খান: সারা বিশ্ব এইডস ও যক্ষ্মাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অসংক্রামক ব্যাধি তেমন মনোযোগ পায়নি।

এইডস–যক্ষ্মা থেকে বেশি মানুষ মারা যায় ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক ব্যাধিতে। সম্ভবত প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন রোগী মারা যায়। ডায়াবেটিসের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মানুষ মারা যায় না। কিন্তু এটি হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগকে প্রভাবিত করে। সচেতনতার মাধ্যমে প্রায় ৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়।

জেনেটিক প্রভাব ও পরিবেশের প্রভাবের জন্য কিছু মানুষের ডায়াবেটিস হবেই। এটা এড়ানো যাবে না। একমাত্র অসংক্রামক ব্যাধি ‘ডায়াবেটিস’-এর জন্য প্রতিবছর জাতিসংঘ ১৪ নভেম্বর ডায়াবেটিস প্রতিরোধ দিবস পালন করে।
এ জন্য বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে।

কারণ, এ দিবস পালনের উদ্যোক্তা বাংলাদেশ। আমিই প্রথম বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জাতিসংঘে তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলাম।

জাতীয়ভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য সরকারের কাছে খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে। তামাক চাষ বন্ধ করার জন্য কোনো না কোনো ফোরাম থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজ হলো সবাইকে সচেতন করে তোলা।

আবদুল্লাহ আল শাফী মজুমদার

আবদুল্লাহ আল শাফী মজুমদার: হৃদ্‌রোগের চিকিৎ​সার জন্য এখন আর দেশের বাইরে যেতে হয় না। জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউটে হৃদ্‌রোগের সব ধরনের চিকিৎসা রয়েছে।

সরকারি-আধা সরকারি হাসপাতালগুলো হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় অনেক ভূমিকা রাখছে। হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল। হঠাৎ করেই ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। কিছুটা সতর্ক থা​কলেই হৃদ্‌রোগ এড়ানো খুব সহজ। তাই হৃদ্‌রোগ যেন না হয়, এ বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এ রোগে হঠাৎ মানুষ মারা যায়।

তবে যাঁদের বয়স ৪০ বছরের বেশি, তাঁদের যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল থাকে ও অতিরিক্ত মোটা হন, শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তাহলে তাঁরা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

প্রায় সবাই কায়িক পরিশ্রমের কথা বলেছেন। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফুটপাতে হাঁটা যায় না। স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য খেলার মাঠ নেই। এ দিকগুলো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। যে করেই হোক, কায়িক পরিশ্রম সবার জন্য জরুরি।

ইকবাল মাসুদ

ইকবাল মাসুদ: অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি হলো অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপান, জাঙ্ক ফুড ইত্যাদি। এসবের সঙ্গে অ্যালকোহল–জাতীয় পানীয় ভীষণ ক্ষতিকর। অ্যালকোহলের বিষয়টি তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি। দেশে এর ব্যবহার একেবারে কম নয়।

২০০৭ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত অসংক্রামক ব্যাধি কমানোর জন্য সরকারের একটি কৌশলপত্র আছে। আমাদের এ ফোরাম থেকেই সেটা পর্যালোচনা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। এমন একটা ফোরাম থেকে কোনো উদ্যোগ নিলে সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দেবে বলে মনে করি। এসডিজির (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) লক্ষ্যমাত্রা তিন-এ তামাক নিয়ন্ত্রণের কথা বলা আছে।

তাই সরকারকে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ধূমপানের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মো. সাজিদ রহমান

মো. সাজিদ রহমান: অসংক্রামক ব্যাধি অনেক বেশি বিস্তার লাভ করছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালে এর জন্য বিশ্বে ব্যয় হবে সাত ট্রিলিয়ন ডলার। ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছি, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

২০২১ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা হবে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন। আমরা টেলিনর থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দেশের মানুষের কাছে পাঠাব। এসব তথ্যের মাধ্যমে মানুষ তাদের ক্ষতিকর আচরণ পরিবর্তন করতে উৎসাহী হবে।

বাংলাদেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আমরা যদি এসব মোবাইল ফোনে তাদের বলি, ‘আপনারা প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটেন। ধূমপান করবেন না। অস্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন না।’ এভাবে যদি চালিয়ে যেতে থাকি, তাহলে নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে। আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে মোবাইলের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

ফরিদুর রহমান খান

ফরিদুর রহমান খান: আমরা অনেকেই ব্যক্তি খাতে হাসপাতাল পরিচালনা করছি। কিন্তু আমাদের কোনো ফোরাম নেই যেখান থেকে অসংক্রামক ব্যাধি বা অন্য কোনো সমস্যা সম্পর্কে ভূমিকা রাখা যাবে।

কিডনি ফেইলিওর, ক্যানসার, স্ট্রোক ইত্যাদি সমস্যায় একটা সচ্ছল পরিবারের অনেক ক্ষেত্রে অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতি হয়। এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা এখন অনেক।

আমাদের এখানে দক্ষ চিকিৎ​সকের অভাব রয়েছে। যাঁরা নতুন কাজ করতে আসেন, তাঁদের অনেক বোঝাতে হয়। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎ​সকের সমস্যা জরুরি ভিত্তিতে দূর করা প্রয়োজন। দক্ষ নার্স ও প্যারামেডিকসের সংকট।
আমরা কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করছি চিকিৎসার যন্ত্রপাতিতে। কিন্তু যেকোনো কারণে নষ্ট হলে এটা ঠিক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

এমন স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতি আছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে তাপমাত্রাসহ অনেক বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। অথচ বিভিন্ন জটিলতার জন্য আমদানি করা মেডিকেল যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন বিমানবন্দরে ফেলে রাখতে হয়।
পদে পদে আমাদের সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে না পারলে ভালো সেবা দিতে পারব না।

হারুন-উর-রশীদ

হারুন-উর-রশীদ: বিশ্বে ক্রনিক কিডনি রোগের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু সাউথ এশিয়ায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। ক্রনিক কিডনি রোগের কারণ তিনিটি। উচ্চমাত্রায় ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেশার ও কিডনি রোগ।

কোনো ডায়াবেটিস রোগীর ইউরিন পরীক্ষায় যদি অ্যালবোমিন পাওয়া যায়, তাহলে তিনি ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত। আবার একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীর ইউরিনে যদি মাইক্রো অ্যালবোমিন ও অ্যালবোমিন পাওয়া যায়, তাহলে তিনি ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত।

কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক থাকলেও কারও ইউরিনে মাইক্রো অ্যালবোমিন বা অ্যালবোমিন পাওয়া যেতে পারে। এ অবস্থায় তিনি ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত হবেন। এই বিষয়টি অধিকাংশ মানুষ জানে না।

এই পর্যায়ে ওষুধ নিলে ক্রনিক কিডনি রোগ ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সঠিক চিকিৎসা। যখন কিডনির সমস্যা তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে যায়, তখন কিডনির সমস্যা নিরসন করা যাবে না, তবে সমস্যা যাতে না বাড়ে, তা ঠেকিয়ে রাখা যাবে।

তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে কিডনি রোগের লক্ষণ বোঝা যায় না। এটি কিডনি রোগের আরেকটি বড় সমস্যা। কিডনি যখন ৭৫ শতাংশ নষ্ট হয়, এ ক্ষেত্রে এর লক্ষণ বোঝা যায়। এ পর্যায়কে কিডনি ফেইলিওর বলে। মাত্র ১৫ শতাংশের চিকিৎসাসেবা দিতে পারি।

এ এম শামীম

এ এম শামীম: দেশে আমরা স্বাস্থ্যসেবার ব্র্যান্ড খুব খারাপ করে ফেলেছি। একজন আমাকে বলল, সিঙ্গাপুর থেকে তিনি ৩০ লাখ টাকা খরচ করে হার্টের চিকিৎসা করেছেন। এই একই চিকিৎসা আমরা মাত্র ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় করি। হার্ট ফাউন্ডেশন আরও অনেক কমে করে। চিকিৎ​সকদের ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশে ভীষণ খারাপ। গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের সবার অনেক বেশি দায়িত্বের পরিচয় দিতে হবে যেন আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্র্যান্ডিং ইমেজ বৃদ্ধি পায়।

দিল্লিতে ব্যক্তি খাতের হাসপাতালের জন্য সরকার ২০০ বিঘা জমি দিয়েছে। আর প্রায় প্রতিদিন রাজউক আমাদের হাসপাতাল ভাঙতে আসে। সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মানুষ এসে অনেক বিরক্ত করে। মনে হয় হাসপাতাল করে অন্যায় করেছি।

প্রতিদিন আউটডোরে ছয় হাজার রোগী দেখি। বছরে প্রায় ২০ লাখের বেশি রোগী দেখি। সরকার আমাদের যদি সুযোগ-সুবিধা না দেয়, তাহলে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার ও আমাদের মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

ফারুক আহমেদ ভুঁইয়া

ফারুক আহমেদ ভুঁইয়া: এসডিজিতে এনসিডির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আমাদের সেক্টর প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছে। এখানে এনসিডিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। এ জন্য নন–কমিউনিকেবল ডিজিজকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছি। ডায়াবেটিস, হাইপার টেনশন, ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, পুড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে ক্ষত হওয়া—এসব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মসূচি রয়েছে।

আবুল কালাম আজাদ

আবুল কালাম আজাদ: অসংক্রামক ব্যাধি এমন যে একবার হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি সারা জীবন থাকে। বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক ব্যাধি। ২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট মনে করে, এইচআইভি এইডসের ওপর এত দিন তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

এখন বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক ব্যাধি অনেক বেড়ে গেছে। এমডিজির (সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) ৪, ৫ ও ৬ নম্বর লক্ষ্য ছিল স্বাস্থ্যবিষয়ক। উন্নয়নশীল দেশের চাপে তখন এনসিডি (নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ) এমডিজির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশও এনসিডিতে তেমন মনোযোগ দেয়নি।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন বলছে, ‘বিশ্বের প্রাকৃতিক ও মানুষের তৈরি করা সব ধরনের দুর্যোগ, সব দুর্নীতি ও অপরাধের জন্য যে ক্ষতি হয়, তার থেকে বেশি ক্ষতি হয় অসংক্রামক ব্যাধির জন্য। তাই এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে।

হাজেরা মাহতাব

হাজেরা মাহতাব: রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিরোধ করলে একসঙ্গে ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, হাইপারটেনশন, ক্যানসার—সবকিছুই প্রতিরোধ হবে।

নারীদের যদি ডায়াবেটিস হয় এবং তাঁদের যদি কম ওজনের সন্তান হয়, তাহলে সন্তানদের ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, হাইপারটেনশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর প্রধান কারণ অপুষ্টি। গর্ভাবস্থায় নারীদের স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিলে সহজে সমস্যা দূর করা যায়। এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। দেশের নারীসমাজসহ সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

মাখদুমা নার্গিস

মাখদুমা নার্গিস: হার্ট ডিজিজ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ইত্যাদি নিয়ে সবাই পৃথক পৃথকভাবে কাজ করছেন। কিন্তু আমাদের এখন সময় এসেছে সমন্বিতভাবে কাজ করার।

আমরা এমডিজি শেষ করে এসডিজিতে প্রবেশ করেছি। এসডিজির ৩ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় আছে, ‘গুড হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং ফর অল এজেজ।’

এটা একটা ব্যাপক পরিসর। যেখানে সব বয়সের মানুষের স্বাস্থ্যের কথা ভাবতে হবে। তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আমরা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারব না।

আবদুল মালিক

আবদুল মালিক: এনসিডি সম্পর্কে আগে ধারণা অন্য রকম ছিল। এনসিডি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এটা ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগ এক দিনে হয় না। বিভিন্ন করণে এটা ব্যাপক আকার ধারণ করছে।

এটা মানুষের সৃষ্টি। এ রোগ একবার হলে ক্রনিক হয়ে যায়। ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির জন্য বোঝা হয়ে যায়। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে ধরে রাখতে হলে এই রোগগুলো থেকে মুক্তি পেতে হবে।

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, কী করলে রোগ হয় না। সবাই বলেছেন, কী খেতে হবে, কী করতে হবে। এ জন্য দেশব্যাপী সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকার একা এটা পারবে না। এ জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু বললে হবে না। সুযোগও তৈরি করতে হবে। মহানগরে হাঁটার কোনো জায়গা নেই। আমরা একটা অনুষ্ঠানে বলেছি, ঘর থেকে বের হয়েই বাস, রিকশা নেওয়ার দরকার নেই।

কয়েক মাইল হেঁটে গাড়িতে ওঠা প্রয়োজন। দিনে কমপক্ষে ২০ মিনিট হাঁটতে হবে। ফল বলতে আঙুর-বেদানা নয়, আমাদের দেশে অনেক সস্তা ফল আছে। সেগুলো খেতে হবে।

আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নিই না। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে এ রোগ থেকে দূরে থাকতে পারব।

আব্দুল কাইয়ুম: অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কীভাবে এসব রোগ প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করবেন বলে আশা করি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

যাঁরা অংশ নিলেন

আবদুল মালিক: জাতীয় অধ্যাপক, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, সভাপতি, বিএনএনসিপি

আবুল কালাম আজাদ: মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মাখদুমা নার্গিস: চিফ কো-অর্ডিনেটর, কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার

এ কে আজাদ খান: সভাপতি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এবং এন্ডোক্রাইন সোসাইটি অব বাংলাদেশ

এ কে এম মহিবুল্লাহ: সভাপতি, বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি, মহাসচিব, বিএনএনসিপি

হারুন-উর-রশীদ: সভাপতি, কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ

এম আমজাদ হোসেন: সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটি

মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী: সভাপতি, বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি

খন্দকার আবদুল আউয়াল: মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ

আবদুল্লাহ আল শাফী মজুমদার: মহাসচিব, বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি

হাজেরা মাহতাব: অনারারি সভাপতি, এন্ডোক্রাইন সোসাইটি অব বাংলাদেশ

ইকবাল মাসুদ: উপপরিচালক, ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন

সোহেল রেজা চৌধুরী: বিভাগীয় প্রধান, এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট

ফরিদুর রহমান খান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনাইটেড হাসপাতাল লি.

এ এম শামীম: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ল্যাবএইড হাসপাতাল

মো. সাজিদ রহমান: টেলিনর হেলথ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার

ফ্রেড হার্শ: মেডিকেল ডিরেক্টর টেলিনর ডিজিটাল এএস

ফারুক আহমেদ ভুঁইয়া: লাইন ডিরেক্টর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল

সঞ্চালক

আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত