১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৯:৫২ পিএম

শজিমেক চিকিৎসকদের দক্ষতা: প্রাণে বাঁচলো মৃত্যু পথযাত্রী নারী

শজিমেক চিকিৎসকদের দক্ষতা: প্রাণে বাঁচলো মৃত্যু পথযাত্রী নারী
অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকরা।

সাখাওয়াত হোসাইন: পাঁচ মাসের গর্ভবতী নারীর বাচ্চা নষ্ট করার জন্য কোয়াকের অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ডায়লেশন অ্যান্ড কিউরেটেজ (ডিএন্ডসি) করার সময় সৃষ্ট জটিলতা থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাতের ফলে মৃত্যু পথযাত্রী ওই রোগীর সফল অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকরা। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের চিকিৎসকদের অসামান্য দক্ষতায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ওই নারী এখন ঝুঁকিমুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে ওই রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে (এনআইসিভিডি) পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত নয়টা থেকে সাড়ে তিন পাঁটটা পর্যন্ত হাসপাতালের নয় সদস্যের টিমের অক্লান্ত পরিশ্রমে ওই নারীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

নয় সদস্যের টিমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন হাসপাতালের গাইনি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. নফসি খাতুন। সদস্য হিসেবে ছিলেন হাসপাতালের অ্যানেসথেশিওলজি বিভাগের ডা. ইকবাল হোসাইন ও ডা. মাহবুবুর রহমান, অনারারি মেডিকেল অফিসার ডা. সিফাতী গ্লোরি ও ডা. সুরভি সুলতানা, গাইনি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. জান্নাতুল অ্যানি ও ডা. হাবিবা এলাহি এবং ইন্টার্ন ডা. সায়েম চৌধুরী।

অস্ত্রোপাচার টিমের প্রধান ডা. নফসি খাতুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ইউনিট-১ এ পাঁচ মাসের গর্ভবতী নারী, রক্ত এবং পানি ভাঙা নিয়ে একজন রোগী ভর্তি হয়। এর আগে ওই রোগীর বাড়িতে মাসিক নিয়মিতকরণ (এমআর) সম্পন্ন হয়। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে হওয়ার কারণে ভিতরে প্রচুর রক্তপাত, বাচ্চার পুলটা—সব মিলিয়ে রোগীর অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে। শরীর থেকে এত রক্তপাত হয়েছে যে, রোগী শকে চলে গেছে। সারাদিন রোগীর অবস্থা ঝুঁকিমুক্ত ছিল। পরে রাতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এরপর হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগীর বিষয়টি ওপেন করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাত নয়টা থেকে অপারেশন শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল একটা রোগীটাকে কিভাবে বাঁচানো যায়। চার ঘণ্টা চেষ্টা করেও রক্তপাত বন্ধ করতে না পারায় রোগী শকে চলে গেছে। রোগীর তিনটা সন্তান-ছোট বাচ্চার সাত বছর, এতে আমাদের চিন্তা আরও বেড়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও লিকের ইউর্টালগুলো আটকানো যাচ্ছে না। তখন আমার মনে হলো, ওপর লেভেলে আটকানো না গেলে রক্তপাত বন্ধ করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, ইন্টারনাল ইলিয়াক আর্টারির ব্রাঞ্চ বলে একটা রক্তনালি (ভিচেল) রয়েছে। যেখান থেকে জরায়ু, ডিম্বাশয়, ডিম্বোনালি ও রক্ত সরবরাহ করা হয়। এগুলো ব্লক না করা গেলে রক্ত বন্ধ করা যাবে না। এতে রোগীকেও বাঁচানো যাবে না। আধা ঘণ্টা আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। একটু বিরতি দিয়ে আবার কাজ শুরু করলাম, কোনো কুল-কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সবাই মিলে ভাবছি, কিভাবে কি করা যায়? আমরা যদি আরেকটু আগাতে না পারি রোগী এখানেই মারা যাবে। রোগী ওটি থেকেও বের হবে না। অনেক ভেবে চিন্তে আমরা উপর দিকে ইনফিশন বাড়িয়ে দিয়ে সেই কমনার্লি যেটা সেটা সেলাই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি ওই জায়গা বন্ধ করতে পারি রক্ত সাপ্লাইগুলো সব বন্ধ হয়ে যাবে। আপাতত রোগীটা জানে বেঁচে যাবে। তখন রাত সাড়ে তিনটা। 

অস্ত্রোপচার দলের অন্যতম সদস্য ডা. সায়েম চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘একদিকে রক্তপাতে রোগী অবস্থা ঝুঁকিপূ্র্ণ। বিপি পাওয়া যাচ্ছে না, পালস হলো ২০০। ব্লাড পাওয়া যাচ্ছে না। তাৎক্ষণিক শজিমেক সন্ধানি ইউনিটে ব্লাড দিল আমাদেরই দুইজন জুনিয়র শিক্ষার্থী। একে একে ১৭ ব্যাগ ব্লাড লাগলো। সর্বমোট পাঁচটা চ্যানেল ওপেন করা হলো রোগীর শরীরে। যখন রোগীর অবস্থা যায় যায়, তখন সবাই হতাশ হয়ে পড়লো। ডা. ইকবাল তার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এবার ছুটে আসলেন ডা. মাহবুব। এসে বললেন, আল্লাহ ভরসা! হাল ছাড়বো না। যতক্ষণ পর্যন্ত মনিটর বিপ বিপ শব্দ করছে, তার মানে রোগী বেঁচে আছে। রোগী যুদ্ধ করছে, আমরা ও আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘রক্ত চাপ নির্ণয়ের (বিপি) মেশিন খুলে নেওয়া হলো। আমরা সার্জনরা মনিটরের দিকে আর নজর দিবো না। এনেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞরা সব দেখছেন। ওদিকে রক্তপাত তখনও বন্ধ হয়নি। এ ধরনের রক্তপাত বন্ধ করার জন্য ভাস্কুলার সার্জন দরকার। বগুড়ায় জেলায় ভাস্কুলার সার্জন নেই। ডা. নফিসা সিদ্ধান্ত নিলেন আরও চ্যানেল ওপেন করবেন। ইন্টারনাল ইলিয়াক আর্টারি রিপেয়ার করবেন। কিন্তু সেটাতেও ব্যর্থ হয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এখন যদি কিছু না করা হয় রোগী এমনিতেও মরবে। ডা. নফিসা রোগীকে আরও ওপেন করে কমন ইলিয়াক আর্টারি রিপেয়ারের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সফল হলেন। ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলো রোগী। আবার বিপি ঠিক ঠাক হলো। অতঃপর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পাঠানো হলো রোগীটিকে।

ডা. নফসি খাতুন বলেন, এখন আইসিইউতে ভালো আছেন এবং রোগীর অবস্থা উন্নতির দিকে। 

উচ্ছ্বসিত চিকিৎসকরা 

তিনি আরও বলেন, সফলভাবে অস্ত্রোপাচারের পর আমাদের কাছে খুবই ভালো লেগেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। মরণ পথের একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে পারলাম। এমন অপারেশন আর কখনও করিনি, এই প্রথম। আমি ভীষণ খুশি।

চিকিৎসকদের উপর বিরূপ ধারণায় দুঃখ প্রকাশ

ডা. নফিসা খাতুন বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের একটা বিরূপ ধারণা রয়েছে। তারা মনে করেন, হাসপাতালের চিকিৎসকরা কাজ করেন না, রোগী ভালো করে দেখেন না। অথচ গত বছর থেকে করোনাকালীন সময়ে মাঝে মধ্যে আমার এমনও দিন গেছে, রাতে গিয়ে টানা পনেরো দিন রোগীর অস্ত্রোপচার (ওটি) করানো লেগেছে। একপর্যায়ে এ বছরের জুন মাসে সপরিবারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাই। তারপরও থেমে থাকিনি। আমাদের ইউনিটের যেসব চিকিৎসক রয়েছেন সবাই নিয়মিত রিবামহীন মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, রোগীর তুলনায় চিকিৎসক খুবই কম। আবার হচ্ছে সিস্টার, ওয়ার্ড বয় ও নার্সের সংখ্যা খুবই কম। এজন্য একজন রোগীর পেছনে লেগে থেকে বেশি সময় দেওয়া যায় না। একজন রোগীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আমাদের ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ অন্যান্যরা সবাই আপন মনে সবাই কাজ করে যাচ্ছে। শুধু রোগীদের সেবায়।

স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ানোর দাবি

তিনি আরও বলেন, জেলার ৫০০ শয্যা হাসপাতালগুলোতে ভাসকুলার সার্জন থাকলে, আরও অনেক রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে। ঠিক সময়ে জুনিয়র কনসালটেন্ট ও সহযোগী অধ্যাপক পদায়ন করা গেলে সরকারিভাবে সেবার মান আরও উন্নত হবে।

চিকিৎসকদের স্বাচিপ সভাপতির প্রাণঢালা অভিনন্দন 

ছয় ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর ও সফল অস্ত্রোপাচার সম্পন্ন করায় শজিমেক হাসপাতালের নয় সদস্যের চিকিৎসক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান। 

মেডিভয়েসের কাছে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসকরা খুবই আন্তরিক। বিভিন্ন জায়গায় বড় অপারেশন আমাদের চিকিৎসকরা দায়িত্ব নিয়েই স্বাস্থ্যসেবা সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। করোনা এবং ডেঙ্গু রোগীদের সেবায় অনেক সময় চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়েছেন।’

স্বাচিপ সভাপতি আরও বলেন, আমাদের চিকিৎসকদের আন্তরিকতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। গরিব রোগী তাঁর রক্তের প্রয়োজন, রক্ত ছাড়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব না। তখন তরুণ চিকিৎসকরা রক্ত দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়েছেন এবং আবার ওই চিকিৎসকই রোগীকে অপারেশন সম্পন্ন করেছেন। এই কাজগুলো আসলেই অভাবনীয় মানবিক। চিকিৎসা পেশা একটি মানবিক পেশা। এ কাজগুলো অবশ্যই গর্বের।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected]gmail.com এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি