১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৫:০২ পিএম

প্রাথমিক চিকিৎসা দিবস: গুরুত্ব ও করণীয়

প্রাথমিক চিকিৎসা দিবস: গুরুত্ব ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

মাহফুজ উল্লাহ হিমু: শেখ নাজমুল হাসান রিফাত, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে এক গ্রাহকের জীবন বাঁচিয়ে হিরো হয়ে যাওয়া এক বাংলাদেশি যুবক। রিফাত ‘ব্যাঙ্গোর তন্দুরি’ নামক একটি খাবারের দোকানে কাজ করেন। কর্মরত অবস্থায় গত ২৩ মে জ্যাক নামের এক গ্রহকের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সে ব্যক্তিটি অস্বস্তিতে আছেন। জ্যাকের মুখ লাল হয়ে যায় এবং চোখ দিয়ে পানি বের হওয়ার অবস্থা হয়। মুহূর্তেই রিফাত তরুণটির অস্বস্তির কারণ বুঝতে পারেন। সে খাবার টেবিল থেকে তাকে টেনে তুলে পেছন দিক থেকে পাকস্থলীতে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় কয়েকবারের চেষ্টায় জ্যাকের শ্বাসনালী থেকে চিকেনের শক্ত একটি অংশ বেরিয়ে আসে। জ্যাকের চেহারায় কষ্টভাব দূর হয় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। 

পরে এ ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই তা ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় রিফাতের প্রয়োগ করা পদ্ধতিটিকে হাইমলিখ পদ্ধতি বলে। শ্বাসনালীতে খাবার আটকানোর ৪ মিনিটের মধ্যে পদ্ধতিটি প্রয়োগ না করলে সে ব্যক্তির প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ রিফাতের ছোট একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ একজন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে। রিফাতের এই পদক্ষেপই প্রথমিক চিকিৎসা বা ফার্স্ট এইড। 

নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির শারীরিক অক্ষমতা, ক্ষতিগ্রস্ততা বা আঘাতপ্রাপ্তির প্রেক্ষাপটে সাধারণ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে অস্থায়ী চিকিৎসা প্রদানকে প্রাথমিক চিকিৎসা বলে। দুর্ঘটনাজনিত কোন কারণে আহত ব্যক্তিকে আরও গুরুতর ক্ষতি ও সঙ্কটাপন্ন হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে অস্থায়ীভাবে নিরাপত্তা প্রদান করে উন্নত চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে পাঠানো যায়। পরবর্তীতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন।

ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কমিয়ে আনা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতি বছরে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় শনিবার পালিত হয় বিশ্ব প্রাথমিক চিকিৎসা দিবস বা ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট এইড ডে। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ২০০০ সাল থেকে এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের সূচনা করে।

প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা বা ফাস্ট এইড জরুরি চিকিৎসা সেবার একটি অংশ। কখনো কখনো রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা পেলে, পরবর্তী জটিলতা এমনকি মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে পারেন। সাপের কামড় থেকে শুরু করে সড়ক দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে।’

প্রথমিক চিকিৎসার জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কোনো কারণে কারো রক্তপাত হলে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে যদি তার রক্তপাত বন্ধ করা যায় তবে তিনি বেঁচে যাবেন। যদি কোনো রোগী শিরা ও ধমনী কেটে যায় এবং তার রক্তপাত বন্ধ না করা যায়, তবে ছয় থেকে আট মিনিটের মধ্যে তার মৃত্যু হবে। একই সঙ্গে পুড়ে যাওয়া ব্যক্তিকে সঠিক সময় প্রথমিক চিকিৎসা না দেওয়া গেলে বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। এমনকি কারো হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেলেও প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যম তা সচল করা যায়।’

প্রথমিক চিকিৎসা ও জনসচেতনতা

কারা প্রথমিক শিক্ষা দিতে পারবেন এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক বেনজির বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা যে কেউ দিতে পারেন। চিকিৎসকদেরও প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়, জরুরি বিভাগে যখন কোনো রোগী আসে তখন চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। এছাড়াও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসহ বিভিন্ন স্বেচ্চাসেবী সংগঠনগুলোও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের চালক ও তার সহযোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসার ট্রেনিং প্রদান করা হয়। সাধারণ মানুষও প্রথমিক চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন। এ লক্ষ্যে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা প্রথমিক চিকিৎসা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করছে।’

প্রথমিক চিকিৎসার বিষয়ে আরও জনসচেতনাতা তৈরির প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমিক চিকিৎসার বিষয়ে সবক্ষেত্রে সচেতনতা নেই। এখনও মানুষ অনেক ভুল প্রথমিক চিকিৎসা প্রদান করে। যেমন সাপে কামড়ের ক্ষেত্রে প্রথমিক চিকিৎসা গ্রহণ না করেই সাপুরের কাছে যায়, ফলে অনেক সময় রোগী বিষক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করে। কুকুরে কামড় দিলে অন্তত ১৫ মিনিট পানি দিয়ে ধুতে হয় এটা প্রাথমিক চিকিৎসা। এটি এখন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে কুকুরে কামড়ের চিকিৎসায় কলাপড়া, লবণপড়া খাওয়ানোর যে রীতি ছিল তা থেকে মানুষ অনেকটাই বেড়িয়ে এসেছে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে ধ্যান-ধারণায় পারিবর্তন এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে আনা প্রয়োজন।’

স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা

আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অংশ হিসেবে প্রথমিক চিকিৎসা প্রদান ও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এ বিষয়ে সংস্থাটির জাতীয় যুব কমিশনের ভাইস চেয়ার ও কিশোরগঞ্জ ইউনিটের যুব প্রধান হোসাইন মোহাম্মদ প্রদীপ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সংস্থাটি দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুব রেড ক্রিসেন্টের ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি টিম গঠন করেছে। একইসঙ্গে জেলা, উপজেলা টিমসহ জাতীয় সদর দপ্তরের টিম সারাদেশে মৌলিক ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করছে। টিমগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড বা মানবসৃষ্ট যে কোন দুর্যোগে সেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রাথমিক চিকিৎসাসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে।’

এছাড়াও যে কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের সৃষ্টি হলে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস (আইসিআরসি) সহযোগীতায় রেড ক্রিসেন্ট ওএসবির মতো প্রোগ্রাম পরিচালনা করে দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রথমিক চিকিৎসা নিশ্চত করে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রথমিক চিকিৎসার বিষয়ে সচেতনতা বাড়লেও তা আরও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা সময় দেশের মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। সমাজে বিভিন্ন রোগের বিষয়ে নানা ধরণের কুসংস্কার ও কু-প্রথা প্রচলিত ছিল। এখনও আছে তবে আগের থেকে তা তুলনামুলক কম। একটা সময় মৃগী রোগীর খিঁচুনি বন্ধের জন্য জুতা শুঁকানোসহ নানা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড করত তার স্বজনরা। এখন তা অনেক কমে গেছে, মানুষ জানে এই অবস্থায় একজন রোগীকে কি সেবা প্রদান করতে হবে। তবে ধ্যাণ ধারণায় আরও পরিবর্তনের প্রয়োজন।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি