ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, এপ্রিল ২০১৮ - ১১, বৈশাখ, ১৪২৫ - হিজরী

দেশেই সফল প্রতিস্থাপন কোমর ও হাঁটুর জয়েন্ট

কোমর ও হাঁটুর জয়েন্ট নষ্ট হয়ে গেলে আক্রান্ত রোগীদের কি যে অসহনীয় অবস্থা হয়, তা একবার দেখলে বিবেককে নাড়া দেয়। তাদের দাঁড়িয়ে মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়। শরীরে তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। চলাফেরা করতে পারে না। পরিবারে বোঝা হয়ে দাঁড়ান এসব রোগী। এক সময় আপনজনরাও তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।

মলমূত্রের সাথেই তাদের জীবন-যাপন করতে হয়। অথচ এই জটিল রোগটি সম্পর্কে একটু সচেতন হলে রক্ষা পাওয়া সহজ। চিকিৎকরা বলছেন, শুধু সচেতনতার অভাবে প্রতি বছর এই জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ।  মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ এই রোগে আক্রান্ত। তবে এই দেশে কোমর ও হাঁটু নষ্ট হয়ে গেলে তার বিশ্বমানের চিকিৎসা রয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জয় সি হোয়াইট (৭১) এর কোমরে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশে। এদেশের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আমজাদ হোসেন হোয়াইটের কোমরে সফল কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করেন। এক সড়ক দুর্ঘটনায় এ মার্কিন নাগরিকের কোমরের জয়েন্ট ভেঙ্গে যায়। তিনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে গেছেন।

তিনি অধ্যাপক ডা. আমজাদ হোসেনকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশে কোমরে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন চিকিৎসার মান যুক্তরাষ্ট্রের মতো। শুধু পার্থক্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে এই চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে হতো ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু বাংলাদেশে মাত্র চার হাজার ডলারে এই বিশ্বমানের চিকিৎসা করতে পেরেছি। আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি।

অর্থোপেডিক সার্জনদের মতে এদেশে ফাস্টফুড, ভেজাল খাবার, ওজন বৃদ্ধি, কবিরাজি ওষুধ গ্রহণ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টোরাল এবং মোটা হওয়ার জন্য স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের কারণে কোমর ও হাঁটুর জয়েন্ট নষ্ট হয়ে যায়। একটি বার্গারে ৬৬০ ক্যালরি থাকে। এটা বার্ন করতে একজনের পাঁচ কিলোমিটার হাঁটা প্রয়োজন।

সাধারণত তরুণীরা মোটা হতে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করে থাকে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগের কোমর ও হাঁটু নষ্ট হয়ে যায় বলে চিকিৎসকদের গবেষণায় পাওয়া গেছে।

শুধু নিয়মিত ব্যায়াম করলে এই জটিল রোগ থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অনেক চিকিৎসক হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়া রোগীকে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আমজাদ হোসেন বলেন, এ ধরনের পরামর্শ রোগীর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

কারণ সে শুয়ে থাকলে ওজন বাড়বে এবং নানান রোগের উপসর্গ দেখা দেবে। ওই রোগী ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে বলে তিনি জানান।

কোমর ও হাঁটুর কৃত্রিম জয়েন্ট অত্যাধুনিক চিকিৎসার অংশ। এই কৃত্রিম জয়েন্ট মানব দেহের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে যুক্তরাষ্ট্রে টাইটেনিয়াম ইমপ্লান্ট অর্থাত্ এক ধরনের মেটাল দিয়ে কৃত্রিম জয়েন্ট তৈরি করা হয়। এছাড়া জাপানেও তা তৈরি করা হয়ে থাকে। এতে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না।

কোমর ও হাঁটুতে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপনে রোগী ২০ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। এতে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের পর খেলোয়াড়েরাও তাদের খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শুধু কৃত্রিম জয়েন্ট কিনতে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যয় লাগে।

আর ওষুধ ও অন্যান্য খরচ বাবদ সব মিলিয়ে এদেশে ব্যয় হয় আড়াই লাখ টাকা। অথচ এই চিকিৎসা করতে সিঙ্গাপুরে ৩০ লাখ টাকা ও যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। অধ্যাপক ডা. আমজাদ হোসেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০০৩ সাল থেকে কোমর ও হাঁটুতে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়মিত এই কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করে আসছেন।

টাঙ্গাইলের নাগরপুরের কলেজছাত্রী ফারহানা খন্দকার মোটা হওয়ার জন্য স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের পর তার কোমরের জয়েন্ট নষ্ট হয়ে যায়। পরে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তিনি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ডা. আমজাদ হোসেন নিজ উদ্যোগে ২০১০ সালে তার কোমরে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করেন।

গতকাল মঙ্গলবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি এখন সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। গাজীপুর কাপাসিয়ার গৃহিণী স্বপ্না মাহমুদের কোমরে কৃত্রিম জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের পর তিনিও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। আর চাঁদপুর সদরের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল মালেক মৃধার (৬০) কোমরে কৃত্রিম জয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। তিনিও এখন নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারছেন বলে জানান।সৌজন্যে: দৈনিক ইত্তেফাক

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর