ডা. তরফদার জুয়েল

ডা. তরফদার জুয়েল

অনারারি মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। 


১৬ নভেম্বর, ২০১৬ ১২:২৪ পিএম

মানবসেবী কসাই বলছি

মানবসেবী কসাই বলছি

এমবিবিএস পাস করে ঢাকায় আসার পর প্রথম যখন একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতে গেলাম, তখন আমার এক শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আমাকে একটি কথা বলেছিলেন- জুয়েল, টাকা ও চেয়ারের মায়া কখনও করবে না।

করলেই বিপদে পড়বে। ডাক্তার যখন হয়েছ, টাকা তোমার হবেই, কিন্তু সম্মান তোমাকে অর্জন করতে হবে- ও তা ধরে রাখতে হবে।

কথাটি আমার সারা জীবন মনে থাকবে। ভাই আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এর আগে একদিন ফেসবুকে আমার বিগত এক বছরের বিভিন্ন হাসপাতালের কাজ করার বিবরণ তুলে ধরেছিলাম।

সুতরাং আমি বলতে পারি যে, বেসরকারি/ মফস্বলের হাসপাতালের অভিভাবকহীন পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার যথেষ্ট হয়েছে, তাই এই বিষয়ে কথা আমি বলতেই পারি।

আপনি যদি নীতিবান ডাক্তার হিসাবে বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতে চান, তবে আপনাকে অল্পবেতনে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে টাকা উপার্জন করতে হবে ( অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।


আর যদি অল্প সময়ে অধিক টাকা উপার্জন করতে চান, তবে আর কোনও চিন্তা নাই। ক্লিনিক মালিকের গোলাম হয়ে যান ( মালিক ডাক্তার হোক অথবা সাধারণ পাবলিক হোক )।

দুনিয়ার যত রোগী আছে, সবাই আপনার দ্বারস্থ হবে । হার্ট এটাকের রোগী আসবে, ক্লিনিক মালিক বলবে - রোগীটা দেখেন, এখানেই চিকিত্‍সা দেয়া যায় কিনা?

একটা ছোট বাচ্চা অসুস্থ, কোন স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেয়া দরকার। আপনি রোগীটাকে রেফার করলেন। 

ক্লিনিক মালিক এসে বাগড়া দেবে, স্যার , অক্সিজেন লাগলে দেন, ইনজেকশন লাগলে এখানেই দেন , রেফার করার কী দরকার?

কথা শুনে মনে হবে - সে সব জানে , তার হাতে অগাধ ক্ষমতা , ফু দেবে রোগী সুস্থ হয়ে যাবে ( এসব ক্ষেত্রে নন ডক্টর মালিকের চেয়ে ডক্টর মালিক বেশি শয়তান )।

যে রোগী আই সি ইউ ছাড়া ম্যানেজ করা যাবে না। সেই রোগীও তারা হাসপাতালে রাখবে।

স্পেশালাইজড হাসপাতাল বা যেখানে কোন কনসালটেণ্ট আছেন , সেখানে খারাপ রোগী রাখা যায়, কিন্তু যেখানে আপনি একজন এম বি বি এস ডাক্তার ও আপনি ছাড়া আর কেউ নাই- মেডিসিন,সার্জারি, গাইনি, শিশু সব রোগীর জন্য আপনি একমাত্র ডাক্তার, সেখানের অবস্থা যদি এই হয়, তবে সেখানে চেয়ারের মায়া হোক অথবা অন্য কোন কারণে হোক, আপনি সব রোগী দেখবেন।

রোগী সুস্থ হলে খুব ভাল কথা, ক্লিনিক মালিক আনন্দে বগল বাজাবে আর টাকা কামাবে আর ওখান থেকে একটু কয়েক পয়সা আপনাকে দেবে। আর যদি রোগী সুস্থ না হয়, তবে ক্লিনিক মালিক বলবে - কী ডাক্তার সাহেব কোন মেডিকেল এ যেন আপনি ছিলেন , আপনার সম্পর্কে তো আমার অনেক কনফিডেন্স ছিল, রোগীকে কী চিকিত্‍সা দিলেন, রোগী তো সুস্থ হয়না ।

আর রোগীর লোক বলবে- ( কী বলবে নিজেরা বুঝে নেন)। রোগী মারা গেলে তো কোন কথা নাই , ক্লিনিক ভাংচুর হবে, ক্লিনিকের লোক সব হারিয়ে যাবে, আপনি আর কোথায় হারাবেন । নিজের কৃতকর্মের কোনও ব্যাখ্যা দেবার আগেই আপনি একখানি তক্তায় পরিণত হবেন ও তারপর আপনার ঠাই হবে চৌদ্দ শিকের পিছনে।

আপনি কোনও রাজনৈতিক দলের সামনের সারির লোক হলে ভাল , নইলে যা হবার তাই হবে ।

 

শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে লেখক

 

২.

কিছু মানুষ কুত্তার মত কামড়া কামড়ি করে আসবে ও আপনার কাছে মেডিকেল সার্টিফিকেট চাইবে। আপনি ভাবছেন - এর সরকারী হাসপাতালে না গিয়ে আপনার কাছে কেন আসবে? এরা সরকারী হাসপাতালে যাবে না, কারণ , ১.ওখানে হম্বি তম্বি করা যায় না,

২. এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেরাই দোষী, মূল যায়গায় গেলে নিজেরাই ধরা খাবে।

যদি এরা ভাল মানুষও হয় , তার পরেও আপনি কোন সার্টিফিকেট দেবেন না । কারণ পড়ে আপনাকে "ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হবে"।

যাহোক বলতে গেলে অনেক কথা আছে, এত লেখা সম্ভব না। সব কথার বড় কথা , বড় ভাইএর কথা --" জুয়েল, টাকা ও চেয়ারের মায়া কখনও করবে না। করলেই বিপদে পড়বে। ডাক্তার যখন হয়েছ, টাকা তোমার হবেই, কিন্তু সম্মান তোমাকে অর্জন করতে হবে ও তা ধরে রাখতে হবে। " তাই টাকা কামানোর আগে সবকিছু ভাবুন।
মানব সেবা করার আগে ভাবুন- যার সেবা করছেন সে মানুষ কি না ? যদি সে মানুষ হয় , তারপর ভাবুন আপনি আপনার সাধ্যের মধ্যে তার সেবা করতে পারবেন কি না ?

আর যদি দেখেন সে মানুষ না অথবা সে এখন মানুষ আছে কিন্তু পরিস্থিতি তাকে কিছুক্ষনের মধ্যেই অমানুষ বানাবে , তাহলে মানব সেবার কথা ভুলে যান । রোগী ডাইরেক্ট রেফার । যদি দেখেন ক্লিনিক মালিক ঝামেলার , সরাসরি তাকে বলুন - আসসালাম, চললাম ।

আপনি ডাক্তার হয়েছেন সরকারের টাকায় , জনগণের টাকায় , মানুষের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু আপনার বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান এরাতো কারো কাছে ঋণী নয়। আপনার বাবা-মা আপনাকে এইস এস সি পর্যন্ত নিজের টাকায় পড়িয়েছে। সুতরাং অন্যের ঋণ শোধ করার আগে নিজের বাবা-মা এর ঋণ শোধ করুন । এই ঋণ শোধ করার আগে পটল তুললে তো সমস্যা।

আপনি না হয় মানবসেবা করতে গিয়ে নিজের জীবনটা দিলেন। মরিয়া বাচিয়া গেলেন। কিন্তু আপনার মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান এরা তো বাচিয়া থাকিয়া ধুকে ধুকে মরবে । আপনার অবর্তমানে এদের খোজ কেউ নেবে না ।
মনে রাখবেন -- "ডাক্তার হয়েছেন মানব সেবা করার জন্য মানব ধোলাই খাওয়ার জন্য নয় ". ।

বি দ্র:কসাই ভাইরা , আপনারা কিছু মনে করবেন না । কসাই শব্দটি এখানে কোন পেশা নয়, বরং প্রচলিত প্রবাদ অর্থে ব্যবহৃত ।

 

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত