২০ অগাস্ট, ২০২১ ০৭:২১ পিএম

দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত-মৃত্যু: যা বললেন বিশেষজ্ঞরা

দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত-মৃত্যু: যা বললেন বিশেষজ্ঞরা
প্রতীকী ছবি

মাহফুজ উল্লাহ হিমু: রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আব্দুল হান্নান। দেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা ভ্যাকসিন আসার পর পরই অগ্রাধিকার বিবেচনায় টিকা নিয়েছেন। তবে এতেও শেষ রক্ষা হয়নি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি এই কর্মকর্তার। প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছেলে-মেয়ের কাঁধে ভর করে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে। তাঁর মতো আরও এমন অনেক রোগী রয়েছেন, যারা টিকার এক ডোজ বা দুই ডোজ গ্রহণের পরও করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১০ থেকে ১৫ লিটার মাত্রার অক্সিজেন গ্রহণ করছেন। 

এখানেই শেষ নয়, টিকা গ্রহণের পরও করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২ আগস্ট টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া রশীদ শাফী করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মতো আরও অনেকেই টিকা নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ও মৃত্যুবরণ করেছেন। এ অবস্থায় টিকার কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) গত মে ও জুন মাসে সংক্রমিত ১ হাজার ৩৩৪ জনের ওপর গবেষণা চালায়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৭৪২ জন বা শতকরা ৫৫ ভাগই টিকা নিয়েও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০৬ জন ছিলেন, যারা পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়ার অন্তত ১৪ দিন পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

গবেষণার ফলাফল

টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির পাশাপাশি তাদের রোগের গতিবিধির পর্যালোচনায় আইইডিসিআর জানায়, করোনাভাইরাসের দুই ডোজ টিকা যারা নিয়েছেন, তারা করোনায় আক্রান্ত হলেও তাদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের সমস্যা, হাসপাতালে ভর্তির হার এবং মৃত্যুঝুঁকি টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কম। টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতায় ভুগেছেন শতকরা ১১ ভাগ রোগী। অপরদিকে দুই ডোজ টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার ছিল ৪ ভাগ। 

অক্রান্তদের মধ্যে যারা আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগে ভুগছিলেন, তাদের বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। এ ধরনের রোগীদের মধ্যে যারা টিকা নেননি, তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতায় ভোগার হার পূর্ণ টিকা গ্রহণকারীদের তুলনায় ১০ ভাগ বেশি। যারা দুই ডোজ টিকা নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৭ ভাগ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছেন। আর যারা টিকা নেননি, তাদের ২৩ ভাগকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।

এছাড়াও যেসব করোনা রোগী আগে থেকেই বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে ভুগছিলেন, তাদের মধ্যে টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের ১০ ভাগকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অপরদিকে টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার শতকরা ৩২ ভাগ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত

জানতে চাইলে প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। টিকা নেওয়ার পরে বেশিরভাগ রোগীই আর আক্রান্ত হবে না, হলেও উপসর্গগুলো মৃদু থাকবে। এক্ষেত্রে রোগী বাসায় থেকেই সুস্থ হয়ে যাবেন। তবে যাদের আগে থেকেই বিভিন্ন রোগ ছিল ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল, তাদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি নাও হতে পারে।’

টিকা নেওয়ার পরেও মৃত্যু সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাদের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে যে, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও তাদের ইমিউনিটি তৈরি হয়নি। ভ্যাকসিন নিলে করোনায় সংক্রমিত হবেন না, এটা ঠিক নয়। ভ্যাকসিন গ্রহণের পরেও করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। তবে তা মৃত্যু হওয়ার মতো সিভিয়ার অবস্থায় যাবে ন। যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে সে করোনা ছাড়াও ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, কিডনি রোগ, হৃদরোগ বা এই ধরনের কোনো জটিল অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘টিকার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি কোনো ব্যক্তি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। একইসঙ্গে আক্রান্ত হলেও সিভিয়ার পর্যায়ে যাবে না, যদি তিনি অন্যকোনো মারাত্মক রোগের রোগী না হন। তবে যদি রোগী আগে থেকেই বার্ধক্যজনিত সমস্যা বা অন্যকোনো রোগের কারণে খুব দুর্বল অবস্থায় থাকেন, তবে তাদের বাঁচানো কঠিন।’

টিকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু রোধ অসম্ভব! 

এ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু। দুই ডোজ টিকা গ্রহণের পরও সংক্রমিত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের পরেও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে এতে আক্রান্তদের মধ্যে লক্ষণ মৃদু থাকে এবং রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায়। দুই ডোজ নেওয়া থাকলে সেই ঝুঁকি আরও অনেক কমে যায়। টিকায় সংক্রমণ হয়তো রোধ করা যাবে না। কারণ ভাইরাসটি প্রতিনিয়ত মিউটেশনের মাধ্যমে রূপ পরিবর্তন করছে। যে স্টেইনের জন্য টিকাটি তৈরি করা হয়েছিল, ভাইরাসটি এখন আর সেই রূপে নেই। তাই টিকা নেওয়ার পরেও ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করবে এবং সংক্রমণ ঘটাবে।’ 

তবে এ ব্যাপারে কিছুটা আশার বাণী শোনালেন এ ভাইরোলজিস্ট। তিনি বলেন,‘ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে স্টেইনের পরিবর্তন হলেও নতুন রূপের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের একটা অংশ কাজ করবে। অর্থাৎ সংক্রমণ আটকাতে পারবে না, তবে এর বিরুদ্ধে সে ঠিকই কাজ করবে। আক্রান্ত হওয়া রোধ করার একটাই উপায় আর তা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অর্থাৎ দেহে ভাইরাস প্রবেশের পথে প্রতিরোধ নিশ্চিত করা।’ 

‘ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে রোগী সিভিয়ার কম হবে, ফলে তাঁর মৃত্যুঝুঁকি কমে যাবে। তবে সবার ক্ষেত্রে তা হবে না। কেউ কেউ খারাপ অবস্থায়ও যেতে পারেন। তবে সে সংখ্যাটা কম’, যোগ করেন অধ্যাপক শাহানা বানু।

এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ঢামেক হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাব ইনচার্জ  ও সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা লিমা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি নিজেও ভ্যাকসিন নেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। ভ্যাকসিন আক্রান্ত হওয়া প্রতিরোধ করবে না, তবে সিভিয়ায় অবস্থা থেকে রক্ষা করবে। হয়তো রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হবে না।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি