ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

চিকিৎসক ও সরকারী চাকুরিজীবী। 


১৫ নভেম্বর, ২০১৬ ১০:১৮

শহীদ ডা. আ. বি. ম. হুমায়ুন কবীর

শহীদ ডা. আ. বি. ম. হুমায়ুন কবীর

পুরো নাম ডা. আবু বিরবিজ হুমায়ন কবীর। ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর হাতিরপুল থেকে আল বদর, আল শামস বাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে যায় তাকে। পরদিন তাঁর ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ নটরডেম কলেজের কাছে ডোবার মধ্যে পাওয়া যায়।

ডা. হুমায়ুন কবীরের ডাকনাম ছিল বুলু। জন্ম: ২২ জানুয়ারি, ১৯৪৭। শুরু থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মতলব স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬২-তে নটরডেম কলেজ থেকে আই এস সি পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। স্কুলজীবনে তিনি একজন ভালো স্কাউট ছিলেন এবং ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় স্কাউট জাম্বুরিতে যোগদানের জন্য লাহারে যান। অবসর সময়ে তিনি গিটার ও তবলা বাজাতেন। নাটকও করতেন, বাবার কাছে থেকেই শিকারের শখ পেয়েছিলেন।

মেডিকেল কলেজে এসেই তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার পড়ার সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। তিনি মওলানা ভাসানীর খুব ভক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভা-শোভাযাত্রায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছাত্রসমাজে বেশ পরিচিতি লাভ করেন।

মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাতেই তিনি পাশের গ্রামে ডাক্তার বলে পরিচিত ছিলেন। ছুটিতে বাড়িতে গেলে দূরদূরান্ত থেকে গরিব গ্রামবাসী, বিভিন্ন অসুখে চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য আসত, খবর দিয়ে নিয়ে যেত।

তিনি শহর থেকে নিজে স্কলারশিপের টাকায় এবং পরিচিত ডাক্তার ও মেডিকেল এজেন্টদের কাছ থেকে নানা ধরনের ওষুধপত্র নিয়ে যেতেন। অনেক রোগীকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিতেন । বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন। বহু গরিব আত্মীয়-স্বজনও তার কাছ থেকে অনুরূপ সহায়তা পেয়েছে।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের স্বাধিকারের দাবি মেনে নেবে না। বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতাই একমাত্র মুক্তির পথ। এসব কথা তিনি জোর দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়াতেন।

পঁচিশে মার্চের কালরাতে ডা. হুমায়ুন মেডিকেল কলেজের হোস্টেলেই ছিলেন। কারফিউর মধ্যেই কী করে যেন ২৬ তারিখ বিকেলেই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বোনের বাসায় পালিয়ে আসেন।

ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা শোনা যায়। এরপর ঢাকা ছেড়ে চলে যান নিজ এলাকা শরীয়তপুরের সখিপুর থানার চরভাগা গ্রামে।

সেখানে ডামুড্যা বাজারে গিয়ে এক ফার্মেসিতে ডাক্তারি শুরু করেন। এ সময় তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংস্পর্শে আসেন । সাধারণ মানুষের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাও করতেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেও আসতেন। যাতে সন্দেহ না করে সেজন্য মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করেন।

শেষবার গ্রাম থেকে তিনি ঢাকায় আসেন নভেম্বরে। মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম ঢাকায় তখন ব্যাপক। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরার জন্য আল বদর, আল শামস বাহিনী চেষ্টা চালাচ্ছে।

১৫ই নভেম্বর হাতিরপুল এলাকায় সকাল থেকে কারফিউ ছিল। ঐ এলাকা আল বদর বাহিনী ঘেরাও করে রেখেছিল।

ডা. হুমায়ুনের বোনের বাসার নিচের তলায় থাকতেন মেডিকেল কলেজের অ্যাসিসট্যান্ট সার্জন ডা. আজহারুল হক। তিনিও গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন।

ঐদিন ডা. আজহারের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা হন ডা. হুমায়ুন  কবির।  

পরে কারফিউ তুলে নেয়া হয়। কিন্তু তাদের দু’জনের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। দু’জনের বাসা থেকেই সারাদিন বিভিন্নস্থানে খোঁজ নেয়া হয়।

পরদিন দুপুরে তাদের লাশ নটরডেম কলেজের কাছে ডোবা থেকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজের মর্গে নিয়ে রাখা হয়।

পরিবারের সদস্যরা তাদের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে জানাজা দিয়ে আজিমপুর গোরস্তানে তাদের দাফন শেষ করা হয়।

ডা. হুমায়ুন কবির বিশ্বাস করতেন- দেশ একদিন স্বাধীন হবে, দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবে।

দেশ স্বাধীন হয়েছে সত্য, কিন্তু তাদের স্বপ্ন সফল হয়নি। আজ এতটা বছর পরও স্বাধীনতার সুফল মানুষ ভোগ করতে পারছে না।

 

সংকলনে : মেডিভয়েস।

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) 

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত