অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল

অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল

সাবেক অধ্যক্ষ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ,

সাবেক সভাপতি, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ


২৯ জুলাই, ২০২১ ০৩:০৩ পিএম

করুণাময়ের অন্তহীন আতিথ্যে

করুণাময়ের অন্তহীন আতিথ্যে
প্রতীকী ছবি।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ২০ নম্বর আইসিইউ বেডটা ডা. শাহনাজ আপা কি একটু বেশীদিন আটকে রেখেছিলেন? পরম অভিমানে তাড়াতাড়ি সেটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, কাউকে এতটুকুও বুঝতে না দিয়ে অন্যের সামান্য আকাঙ্খার একটা ইঙ্গিতের কাছে নিজের অধিকারকে সারাজীবন হাসিমুখে বিসর্জন দেওয়ার জন্য শাহনাজ আপা পাঁচটা দিন তো একটু বেশীই হয়তো।

আমি নিশ্চিত অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়ায় কেবিন ব্লক থেকে আইসিইউতে নেবার সময় শাহনাজ আপার চোখে বেঁচে থাকার নিষ্ফল আকুতি এতটুকুও ছিল না। বরং নিজের আইসিইউ শয্যাটি অবলীলায় অপেক্ষমানকে সম্ভাব্য দ্রততায় ছেড়ে দেওয়ার উদারতাই আপার জন্য বেশী মানানসই, উনি তো এমনিই। তাই ঢাকার স্যাতসেতে বৃষ্টিতে পরিজনদের বাসা ও হাসপাতাল যাত্রার বিরক্তিকর বিড়ম্বনা, রোগীর পথ্য তৈরির রান্নাঘরের গরমে কারো বাড়তি সময়, মাঝরাতে ওষুধের স্লিপ নিয়ে ঘুমন্ত ফার্মাসিস্টকে জাগানোর জন্য বন্ধ কলাপসিবল গেটে বার বার ঝাঁকুনি, আইসিইউর সামনের বারান্দার মেঝেতে মশার আক্রমণে বিপর্যস্ত নিদ্রাহীন পরিজন, দুই ডোজ টসিলিজুমাব জোগাড়ে কাক ভোরে দুরু-দুরু বুকে ধানমন্ডির দুই নম্বরে স্লিপ হাতে চরম অনিশ্চয়তায় প্রতীক্ষার পায়চারি। এসব কিছু থেকে স্বামী,দেবর ও পুত্র পরিজন আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের অন্তিম পরিত্রাণ দিয়ে শাহনাজ আপা এখন দূর অনেক দূরের পদযাত্রী।

আইসিইউর হিমশীতল নিস্তব্ধতায় গভীর রাতে হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলার শোঁশোঁ শব্দ করা ঘোলাটে ফেস মাস্কের ভেতর দিয়ে আপা হয়তো হাই ফ্লো হিউমিডিফায়ারের ওঠা নামা করা সবুজ এলইডি সংখ্যার দিকে করুণার চোখে তাকাতেন। যে নিশুতিতে কেউ নেই চারপাশে, সেবিকাদের শব্দহীন পদচারনা ছাড়া। ৪০ লিটার স্থির সংখ্যার পাশে ৯২-৯৩-৯৪ এর অস্থির ওঠা নামা।

নিতান্তই অনিচ্ছুক হাল ছেড়ে দেয়া আজন্ম সাথী ক্লান্ত ফুসফুসের জোড়াকে জাগিয়ে রাখার কি প্রানান্তকর চেষ্টা বেচারীর। যত নিঃশব্দেই হোক চিকিৎসকদের ফিসফিসানী তার কান এড়ায়নি। আইসিইউ বেডের মুহুমুহু চাহিদার কাছে তাদের অপারগ অসহায় আত্মসমর্পণ। বরাবরের মত অধিকার ছেড়ে দেওয়া আপা সেদিনই আশ্বস্ত করেছিলেন। এই আইসিইউ বুভুক্ষু পরিস্থিতিতে একটা উনি ছেড়ে দিচ্ছেন একটু পরেই।

রংপুর মেডিকেল কলেজের একাদশ ব্যাচের দীর্ঘাঙ্গী, সুদর্শনা আপা, সতীর্থ গাইনেকোলজিস্টদের সমাবেশে সবাইকে ছাপিয়ে যেতেন উচ্চতায়। ঠিক করে বললে ব্যক্তিত্বের উচ্চতায়। দীর্ঘাঙ্গীরা পরাজয়ের অস্বস্তিতে কুন্ঠিত হতে চাইলে অস্বাভাবিক উচ্চতা তাদের এক দৃষ্টিকটু বিড়ম্বনায় ফেলে, আপার জীবনে এমন মুহুর্ত একটি বারও আসেনি আমি নিশ্চিত। তিনি যুদ্ধ করে টিকে ছিলেন জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে। এমনকি মৃত্যুতেও তার অন্যথা হয়নি এতটুকুও। আজ তাঁর কথার সাথে নিজেকে জুড়তে চাই না, একবারের জন্যও। আমার অকিঞ্চিতকর দীনতা তাঁর ঔদার্য আর দৃঢ়তাকে এতটুকু ম্লান করুক আজ অন্তত সে ঝুঁকি নিতে চাই না।

সারাজীবন চাকরি করেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। আদর্শের সংঘাত হলে তিক্ততা বাড়ান নি তিনি। নিষ্কম্প আল্লাহ হাফেজ বলে বিদায় নিয়েছেন, ভেঙেছেন বার বার কিন্তু মচকাননি একবারও। চিকিৎসকদের সমাবেশে চিরায়ত অনুগত নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথাবিরুদ্ধভাবে হাজারো বিপ্লবী! বীরপুরুষের ভীড় ছাপিয়ে একক কন্ঠে প্রতিবাদি হয়েছেন বার বার। চিরায়ত প্রশ্ন ছুড়েছেন নেতাদের উদ্দেশ্যে, কি করছেন আপনারা, আপনাদের ভাষার জুনিয়রদের জন্য? প্রশ্ন ছুড়েছেন, এদেশে বেসরকারি চিকিৎসক নামে একজাতের কলুর বলদ আছে জানেন কি? নেতাদের অস্বস্তি আরেক দফা বাড়িয়ে জানতে চেয়েছেন, তেলবাজি আর দলবাজি ছাড়া উন্নতি নেই কেন বাকীদের? সমঝোতার সোমরসে সিক্ত মেরুদণ্ডহীন চিকিৎসকদের মাঝে আপা অস্বস্তিকর ছিলেন। বরাবরই কিন্তু সৎসাহস তাঁকে অগ্রহণযোগ্য হতে দেয়নি কখনও। তাই শত অপ্রাপ্তিতেও আপা প্রাণোচ্ছল, টগবগে- ক্লান্তিহীন। গরীবের গাইনেকোলজিস্ট আপা পারতপক্ষে সম্পদশালী রোগীদের এড়িয়েই চলতেন, হিসেব সোজা, ওদের তো ডাক্তারের অভাব নেই।

স্নাতকোত্তর কোর্সের প্রস্তুতিতে যখন অপেক্ষাকৃত তরুণদের মাঝে লাইব্রেরিতে বসতেন তখন ঘর ভর্তিদের উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসিতে বিব্রত হন নি। এতটুকুও বরং পরম আত্মবিশ্বাসে বুঝিয়েছেন, তিনি লড়বেন শেষতক, অবজ্ঞার হাসিকে একদিন বিস্ময় চমকিত, চাহনিতে পরিনত করবেন। করেছেনও, তাই স্নাতকোত্তর কোর্সে যখন গেছেন। তখন তার সহপাঠীরা পুরোদস্তুর ম্যাডাম। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার কোর্স মেট আর শিক্ষকরা বুঝে গেছেন, এই পরিণত মানুষটির প্রতিজ্ঞা আর দৃঢ়তার  কাছে তাদের সব অবিশ্বাস আর ভ্রুকুটি পরাজিত হতে চলেছে। অমানুষিক পরিশ্রমে সংসার আর শিক্ষাকে সমানতালে সামলে বিজয়িনী হয়েছেন কিন্তু প্রাচুর্য আর ঐশ্বর্যের হাতছানিতে ভূপতিত হন নি।

শ্বেতবসনে আপাদমস্তক আবৃতা আপা এখন সবকিছু ছাড়িয়ে লোকান্তরে। পৃথিবীর কোন দুঃখ বেদনা, আনন্দ উল্লাস আর তাঁকে স্পর্শ করবে না আর কোনদিন। তার ২০ নং আইসিইউ বেডে এতক্ষণে হয়তো নতুন অতিথি। আপাত ধন্বন্তরি টসিলিজুমাব কতটা অব্যর্থ। সে প্রশ্নের জবাব অমিমাংসিত রেখেই চলে গেলেন। আমার উপলব্ধির আজন্ম অন্যকে বিব্রত না করা ডা. শাহনাজ আপা তাঁর অন্তিম যাত্রায় অন্যের কাঁধে যন্ত্রণার বোঝা হবেন না বেশীক্ষণ আমি নিশ্চিত।

পৃথিবীর সব প্রিয় আর নির্ভেজাল মানুষগুলোর প্রতি এত আক্রোশ কেন কোভিডের। জানা আছে কারো? একটু পরেই সবার আড়ালে সব কোলাহলকে ছুটি দিয়ে নিস্পন্দ আপা শ্রাবন কৃষ্ণ পক্ষের মাঝরাতে বর্ষায় ডুবে যাওয়া ঢাকা-টাঙাইল মহাসড়কের দুপাশের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বিরামহীন ডেকে যাওয়া ব্যাঙের ডাক আর সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের শেষরাতের ঝিঁঝির ডাকের ঐকতানের মাঝে সবার অলক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন অন্তিম গন্তব্যে। দূর নীহারিকা থেকে প্রায় না দেখার ক্ষুদ্রতার এই পৃথিবীর এক কোনে মাটির শয়ানে অনন্তের প্রতীক্ষায়, চাপাইনবয়াবগঞ্জ এর শীতল ছায়ায় শায়িত বাবা মার একান্ত সান্নিধ্যের দূরত্ব তো একটু পরেই একাকার। কাল সকালের কোলাহল আর ছুঁয়ে যাবে না তাকে। তার অকস্মাৎ কন্ঠ স্বর আর চমকিত করবে না পৃথিবীর পরাজিতদের। ভালো থাকুন আপা, করুনাময়ের অন্তহীন আতিথ্যে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত