ডা. আব্দুর রব

ডা. আব্দুর রব

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। 

এফসিপিএস-২ ট্রেইনি (সার্জারি)।

 সাবেক শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


১৪ নভেম্বর, ২০১৬ ০৯:৫৬ এএম

আমি পুরাই ‘থ’

আমি পুরাই ‘থ’

ঢাকার পাশে একটা উপজেলায় সার্জারির একজন Associate Professor এর সাথে আমি বহুদিন কাজ করেছি। মেরুদন্ড ছাড়াও যে মানুষ বেঁচে থাকে উনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। একটা সময় নিজের উপরেই বিশ্বাস কমে যেতে শুরু করল। বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিলাম।
.
Burst Appendix এর একটা রুগীর অপারেশন হবে। হাসপাতালের MD আগে ওটি বয়ের কাজ করত। উনি MD কে ওটিতে আসতে বললেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন:: incision কোন দিক দিয়ে দিবে?? 
আমি সামনে দাড়ানো। ঘটনা দেখে আমারই appendix burst হওয়ার মত অবস্থা। 
.
Lap. Chol অপারেশন হচ্ছে। আমি ঢাকা থেকে গিয়েছি স্যার এর সাথে ওটি করব বলেই। ক্যামেরা ম্যান লিখতে পড়তে পারে না। কথা বলে গ্রাম্য ভাষায়। এর উপর দাত মাজে না, বিড়ির গন্ধে অজ্ঞান রুগীর Anaesthesia ছুটে যাবার মত অবস্থা।
আমাদের মহান সার্জন এর কাছ থেকেই Lap. chol অপারেশন শিখে। সামনে দাড়িয়ে থেকে আমারই Gall Bladder মোচড় দেয়। 
অথচ আমি যে শত শত Lap. chol এ assist করেছি, নিজে lap. chol করেছি সেটা উনি ভাল করেই জানেন।
.
একটা lap. chol এ ঝামেলা হয়ে গেল। Gall bladder এর adhesion ছুটাচ্ছে ক্যামেরা ম্যান নামক মূর্খটা। left duct ইনজুরি করে ফেলল, সাথে cystic artery। ও তো জানেও না left duct কি। তার পরের অবস্থাটা বর্ননা করে লাভ নেই। শুধু দেখলাম মহান সার্জনের চোখের পানি নাকের ভিতর দিয়ে কিভাবে বের হল। ঐ দিনই নিজেকে প্রথমবার বড় মনে হল। নিজেকে বিশেষজ্ঞ মনে হল।
মানুষের উপকার করতে না পারেন, ক্ষতি করার তো মানে হয় না।
.
অবস্থা চুড়ান্ত হয়ে গেল যখন দেখলাম একজন রুগীকে যে ঔষধ দিয়েছি সেটা সে খায় নাই। কারন শুনলাম:: MD নামক সাবেক ওটি বয় বলেছে এই ঔষধ নাকি ভাল কাজ করে না। নিজেই অন্য ঔষধ দিয়েছে। 
ডাক্তার হিসেবে আমাদের ক্ষমতা সীমিত। আমরা যেটা করি সেটা হল ভাল না লাগলে ছেড়ে দিই। আমিও পালিয়েছি।
.
প্রফেসর ওহাব খান স্যার অসাধারন কিছু কথা বলেছেন:: যাবতীয় যন্ত্রপাতি তোমার জন্য তৈরী করা হয়েছে। সার্জন হিসেবে প্রত্যেকটার physics তোমাকে জানতে হবে। Instrument দিয়ে যে ওটি গুলো হয়, এটার physics তোমাকেই জানতে হবে। অশিক্ষিত কোন ক্যামেরাম্যান জানবে না। যদি তুমি না জানো তো যে কেউ ওটি তে ঢুকে তোমাকে হাইকোর্ট দেখাবে।
.
আমাদের সার্জনদের এই একটা বড় সমস্যা । ক্যামেরা যে ০ ডিগ্রি হয়, আবার ৩০ ডিগ্রিও হয় এইটাও তারা জানে না। ব্যবহার তো বহু দুরের ব্যাপার। এরা তাই অশিক্ষিত মানুষদের কাছে হাইকোর্ট দেখে। যেখানে সেখানে দেখে। আমাদের সামনেই দেখে। রাগে দু:খে বাধ্য হয়ে আমরা পালিয়ে যাই। 
.
ঢাকার হাতে গোনা কিছু সেন্টার ছাড়া সারা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এটা সাধারন চিত্র। দালাল আর কমিশন বানিজ্য ছাড়া কোন ক্লিনিক চলে না। প্রত্যেকটা ব্যক্তি এক একটা দালাল। 
ক্লিনিকের স্টাফ গুলো এক একটা রুগী নিয়ে এসে গড় গড় করে সমস্যা গুলো বলে দেয়। এরপর মুখস্থ বলে স্যার এই এই পরীক্ষাগুলো দেন। এখানে এদের কমিশন পঞ্চাশ ভাগ। আত্মীয় স্বজন এমনকি আপন মায়ের পেটের ভাইও এদের কাছে নিরাপদ না। 
আমি শুধু গরীব ছিন্নমুল মানুষগুলোকে দেখতাম আর দালালগুলোর মুখের দিকে তাকাতাম। মানুষ দয়ামায়াহীন হয় শুনেছি, তাই বলে নিতান্ত পশু হয় শুনেনি। 
.
মহস্বল শহরগুলোতে দালাল হচ্ছে রিকসাওয়ালা গুলো। এদের রিক্সায় উঠলেই বলবে কোন ডাক্তার এর কাছে যাবেন?? হাসপাতালে গিয়ে বলবে আমি নিয়ে এসেছি। ৫০% কমিশন পেয়ে গেল। ২ হাজার টাকার পরীক্ষা হলে ১ হাজার টাকা। অন্য হাসপাতালে যেতে চাইলে তার পরিচিত হাসপাতালের প্রশংসা করবে। না গেলে আরো বহু পথ আছে তাদের।

আমি এমনও কেস পেয়েছি যে, রুগী যে ডাক্তারের কাছে যেতে চেয়েছে রিক্সাওয়ালা বলে দিয়েছে:: ও ডাক্তার তো মারা গেছে।

রুগী বলেছে:: গতকাল তো ডাক্তারের সাথে কথা বললাম।

সে বলে:: না আজ সকালে মারা গেছে। হার্ট attack ।

আমি পুরাই থ।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না