ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

চিকিৎসক ও সরকারী চাকুরিজীবী। 


১২ নভেম্বর, ২০১৬ ১৫:৩৫

শহীদ চিকিৎসক ডা.বজলুল হক

শহীদ চিকিৎসক ডা.বজলুল হক

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। নিজের বাড়িতেই আশ্রয়কেন্দ্র খুলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্যে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন। আহতদের সেবা দিতেন। লঙ্গরখানা খুলে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ব্যবস্থা করতেন। এসবই ছিল তাঁর একক প্রচেষ্টা। এ কারণে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পরিবার-পরিজনদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে পাক হায়েনারা। বাড়িঘর জ্বলিয়ে ধ্বংস করেছে। এত কিছুর পরও নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি এই দরদি পুরুষ। ক্ষান্ত হয়নি পাক হানাদার বাহিনীও। ১২ নভেম্বর বাড়ির আঙিনায় গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে তাকে ।

পাঠক, উপরের কথাগুলো বলছিলাম শহীদ ডা. বজলুল হককে নিয়ে। বছরের পর বছর ঘুরে ফিরে ১২ই নভেম্বর আসে। কিন্তু ক’জন মনে রেখেছেন এই বীর সেনানীকে ? 

১৯১৪ সালের ১৫ই জুলাই চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বজলুল হকের জন্ম। পৈতৃক নিবাস অনুপনগর গ্রামে। লেখাপড়া করেছেন কলকাতায়। এলাকায় তখন লেখাপড়ার প্রসার তেমন ছিলো না। ম্যাট্রিক পাস করা তখন ছিল বিস্ময়েরই ব্যাপার। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্ৰে এল.এম. এফ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজসেবা, রাজনীতি, চিকিৎসা, সরকারি চাকরি ইত্যাকার বিষয়ে অনেক অবদান রেখেছেন।  

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা সহ্য করতে পারেনি পাক হায়েনারা। এ কারনে তাঁকে হত্যা করে মৃতদেহ মাটিতে পুতে রাখা হয়। মরণকালে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞ ও ভালোবাসা কোনোটাই জানানো হয়নি তাকে । ভাবতে কষ্ট হয়। তিনি পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। তাঁকে নিয়ে যতটুকু জানা যায়, তাতে মনে হয় তিনি এক ভিন্ন জগতের মানুষ। তাঁর বাস্তবভিত্তিক আলোচনা সবার হৃদয় স্পর্শ করত। ভাসা ভাসা কথা বলতেন না। চলতি বুলি আওড়াতেন বেশ। নিজস্ব অনুভূতিতে, নিজস্ব আচারে কথা বলতেন। এদিকটা সবাইকে মুগ্ধ করত। তিনি যে শোনা কথার বেসাতি করেছেন এমনটা কেউ বলেন না ।

ডা. সাহেবের প্রতিটি কথায় ধরা পড়ত তাঁর সুমিতিবোধ, বক্তব্যের ঋজুতা, পরিশীলিত রুচিবোধ। তিনি শুধু যে চিকিৎসকই ছিলেন তা কিন্তু নয়। রীতিমতো রাজনীতি করতেন। মুক্তমনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। তিনি সবসময়েই রাজনীতিকে জনসেবার একটি মাধ্যম বিবেচনা করতেন। তিনি ছিলেন ধর্মপ্ৰাণ অথচ লক্ষণীয়ভাবে প্রগতিশীল মনমানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী।

সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি তার কাছে হার মেনেছে। সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার জগৎ তাঁকে কখনোই টানতে পারেনি। অতিশয় নিরহঙ্কার এই চমৎকার মনের মানুষটি ১৯৫৮ সালে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। রাজনীতিক এই মানুষটির মধ্যে যে সাহিত্যরসিক- কাব্যরসিক মানুষটি ছিল। তা অনেকেই জানে না। প্রচুর দেশি-বিদেশি বইয়ের সংগ্রহ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে। জীবনের এক পর্যায়ে বইকেই তিনি প্রিয়সঙ্গী করে নিয়েছিলেন। তিনি চিকিৎসা পেশাকে মহৎ কর্ম হিসেবে বেছে নেন। সরকারি চাকরি করতেন এক সময়।

পরবর্তীকালে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। রোগীদের উত্তম সেবা দিতে প্যাথলজিক্যাল বিভাগ, আলাদা অস্ত্ৰোপচার কক্ষ, পুরুষ ও মহিলা বিভাগ চালু করেন। ষাটের দশকে হঠাৎ করেই তার স্ত্রী বিয়োগ ঘটল। তারপর নিয়মিত গোরস্তানে যেতেন। সময় কাটাতেন সেখানে। সেখানে ইসলামি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার কাজে ব্ৰতী হলেন-যেখানে পাঠাগার থাকবে, মুক্ত আলোচনার বৈঠক বসবে, পাশেই থাকবে ঈদগাহ ও গোরস্তান। নামকরণ করলেন ‘দারুস সালাম’।

স্থপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন নিজেই। এখানে তাঁর শিল্পসত্তা বাস্তবে রূপ পেয়েছে একথা বললে বাগাড়ম্বর হবে না বা অতিশয়োক্তি হবে না। বংশ গৌরব বা পদমর্যাদার কারণে সাধারণ মানুষ ও তাঁর মাঝে কোনো দেয়াল সৃষ্টি হতে পারেনি; বরং এসবকে ব্যবহার করে তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার প্রতিনিয়ত চেষ্ট করে গেছেন। তাঁর অন্য যে বৈশিষ্ট্যটি আমার অনুভূতিকে বারবার আন্দোলিত করেছে তা হচ্ছে অন্যায়ভাবে তদবিরে উপকৃত হওয়াটা তিনি সুনজরে দেখতেন না। নিষ্ঠা ও সততার বিচারে তুলনীয় এমন মানুষ কমই চোখে পড়ে। ডা, সাহেবের হৃদয়ের উষ্ণতা ও বিশালতা ছিল সবার জানা।

তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী বিশ্লেষণ করলে এটুকু বোঝা যায়, সামাজিক জীবনে সমাজপতি হওয়ার মোহ তাকে আচ্ছন্ন করেনি। সমাজের কলহপরায়ণতা, পরশ্ৰীকাতরতা, প্রশংসাকাতরতাকে ঘূণা করেছেন। মূলত তিনি অশীল সমাজ ভেঙে সুশীল সমাজ গড়ার পক্ষপাতী ছিলেন। ভূমিহীন কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুর সর্বোপরি নিরক্ষর মানুষ ছোটখাটো সমস্যায় পড়লে তার কাছে আসতো, তিনি সুষ্ঠুভাবে তা নিস্পত্তি করতেন। বিবাদে জড়িয়ে পড়া মানুষ তাঁর কাছে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যায়নি। দলাদলি, কোন্দল, কুপরামর্শের প্রতি তাঁর চরম অভক্তি ছিল। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হতেন তিনি। অকপটে মিশতেন তাদের সাথে। অনেকে এই মহানুভব মানুষটিকে গ্রামের কৃষকদের সাথে ধানক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে দেখেছে।

অন্য যে কথাটি না বললেই নয় তা হচ্ছে শিক্ষা প্রসারে তিনি ছিলেন অগ্রণী। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় তিনি দৃঢ়ভাবে সংগ্রামী ছিলেন। আলমডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আলমডাঙ্গা কলেজ প্রতিষ্ঠায় রয়েছে তার অনন্য অবদান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত শহীদ মিনার স্থাপনের পুরোধা ছিলেন ডা. বজলুল হক।

বড়ই পরিতাপ, এই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অনেকেই মনে রাখেনি। তাঁর মৃতদেহ যেখানে পুঁতে রেখেছে পাক হায়েনারা, সেখানে নেই কোনো নামফলক; সেখানে তাঁর সাথে চিরশায়িত রয়েছে আরও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা। যেখানে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা ঘুমিয়ে রয়েছেন, সেখানে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন থাকবে না, এটা নিঃসন্দেহে অবহেলা নইতো কৃপণতা। বছরে একবার তাদের স্মৃতির উদ্দেশে একগুচ্ছ ফুল দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা বৃথা।

 

সংকলনে : মেডিভয়েস।

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) 

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ।

 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত