০১ জুলাই, ২০২১ ০৪:৫০ পিএম

লকডাউনে গ্রামমুখী মানুষ, বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা

লকডাউনে গ্রামমুখী মানুষ, বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা
ছবি: সংগৃহীত

সাখাওয়াত আল হোসাইন: দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা সংক্রমণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। শহরের মানুষ নমুনা পরীক্ষা ও মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা মেনে চললেও গ্রামের মানুষের চিত্র একেবারে এর উল্টো। এ অবস্থায় সংক্রমণ রোধে আজ বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) দেশব্যাপী শুরু হয়েছে কঠোর লকডাউন। এর আগে গ্রামমুখী মানুষের ঢলের কারণে সর্বত্র করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, যা ঘটাতে পারে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয়।   

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘যারা ঢাকা ছেড়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় বা গ্রামে চলে যাচ্ছেন। তারাও ঝুঁকির মধ্যেই যাচ্ছেন। এখনতো করোনা সংক্রমণ ঢাকার চেয়ে গ্রামে বেশি। আবার তারা যখন ঢাকায় ফেরত আসবে, তখন ঢাকাবাসীর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দুই দিক থেকেই বিপদ। সেজন্য যে যেখানে আছেন, সেখানেই থাকাই সবচেয়ে উত্তম। লকডাউনের উদ্দেশ্যও তাই। এজন্যই সরকার গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছেন।’ 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আমাদের জনগণ নিজেদের বোকামির জন্য হোক, কম বোঝার জন্য হোক..., নাকি আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো কিছু বিশ্বাস করি না, হয় তো এটা আমাদের স্বভাবটাই এ রকম। যে জন্য মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছে। সামনে ঈদ আসছে, তাতে পরিস্থিতি কেমন হবে আমরা ঠিক বলতে পারবো না, জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় কারিগরি কমিটি পরামর্শে সরকার কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। সব কিছুকেই আমরা উপেক্ষা করছি। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে, সরকারের নির্দেশনাগুলো পালন করা।’

খুলনা ও সীমান্তবর্তী জেলায় বাড়ছে করোনা

খুলনা বিভাগে ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বহুগুণে বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘ভারতের সীমান্ত দিয়ে এখনও লিখিত বা অলিখিতভাবে লোকজনও যাতায়াত করছে। সেখান দিয়ে তারা সংক্রমণ নিয়ে আসছে। আমরা কেউ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, এখন খুলনা বিভাগের অবস্থা ভয়াবহ। এখন গ্রাম-গঞ্জের তুলনায় শহরে করোনা সংক্রমণ কমেছে। গ্রাম-গঞ্জে ভ্যাকি্সনেশন হচ্ছে না। ভ্যাকসিন প্রয়োগ যেটুকুই হয়েছে বা হচ্ছে তার বেশিরভাগই শহরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলের করোনা হটস্পট ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। ওই জেলাকে পুরোপুরি শার্টডাউন করে দেওয়া হয়েছিল। সেটা পুরোপুরিভাবে পালন করা হয়েছিল। সেই সময় যদি রাজশাহী বিভাগটাকে শার্টডাউন করা হতো, তাহলে রাজশাহী অঞ্চলে যে সংক্রমণ হার সেটাও কমে যেত। সেইভাবে খুলনা বিভাগের হটস্পটগুলোকে লকডাউন করা হয়নি। লোকাল প্রশাসনকে ইতোমধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা যদি মনে করে লকডাউন দেওয়া প্রয়োজন, তাহলে তারা লকডাউন ঘোষণা করতে পারবে। খুলনা বিভাগের যেখানে যথাযথভাবে লকডাউন বা স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, সেখানে সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে।’

সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. ফেরদৌসী আক্তার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘খুলনা বিভাগে করোনা সংক্রমণ আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে। খুলনা বিভাগে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হলো এ বিভাগে সীমান্তবর্তী জেলা বেশি। আর মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতাও কম। স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সবাই সচেতন হলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুলনা বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিশেষ লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলায় করোনা সংক্রমণ আগের চেয়েও কমে গেছে। এখন করোনা সংক্রমণ খুলনা বিভাগের গ্রাম-গঞ্জে চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। আর রোগীরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে চরম পর্যায়ে চলে যাওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। খুলনা বিভাগে হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হয়েছে। সর্বোপরি কথা হলো জনসাধারণের সচেতনতাই মূল।’

গ্রামে করোনা ছড়াচ্ছেন শহরফেরত মানুষ

শহর-সীমান্তবর্তী জেলা ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। ৩০ জুন বিকেলে দেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুর জেলায় ২১৩ জন, রাজবাড়ী জেলায় ১৬৬ জন, টাঙ্গাইল জেলায় ৩২০ জন, ময়মনসিংহে ২১১ জন, চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯৯ জন, পাবনা জেলায় ১৭৭ জন, খুলনা জেলায় ৩৭৭ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এসব জেলাগুলো সীমান্তবর্তী নয়, গ্রাম-অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ।

এ প্রসঙ্গে খুলনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি না মানার মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে। এটাই আমাদের কাছে মূল। রাস্তা-ঘাটে কোথাও মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। ঢাকা থেকে অনেকেই গ্রামে আসছেন সংক্রমিত হয়ে। গ্রামে এসে তারা সবার মাঝে করোনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, ‘অনেকেই বলে গ্রামে-গঞ্জে করোনা নাই, এটা বড় লোকের রোগ। করোনা শুধু ঢাকায়। এখনতো প্রমাণ হলো সীমান্তবর্তী এলাকা, গ্রাম-গঞ্জ সবখানে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাস স্থান-কাল পাত্রভেদে নির্বিশেষে সবখানেই হবে, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলি।’

তিনি বলেন, এখন মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় সংক্রমিত হচ্ছে। আবার আসার সময়ও করোনার ইনফেকশন নিয়ে আসবে। কারণ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, গাদাগাদি করে চলাফেরা করছেন। স্বাস্থ্য বিধি না মানা ও গাদাগাদির কারণে করোনার সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। সীমান্তের জেলায় করোনা নিয়ন্ত্রণ এখন কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবাধ চলাফেরার কারণে সীমান্ত জেলায় করোনা সংক্রমণ বাড়ছে।

ভারতীয় ধরনের আক্রমণ ক্ষমতা ২০ গুণ বেশি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ বলেন, সবাইকে মাস্ক, হান্ড স্যানিটাইজার ও স্বাস্থ্য মেনে চলতে হবে। অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বলেন, করোনার আগের যে ধরন ছিল, সেটার সংক্রমণ কমে গেছে। এখন ৮০ শতাংশ করোনার ধরন ভারতীয়। এই ধরনের সংক্রমণ ক্রমে বাড়তেই থাকবে। এটার আক্রমণের ক্ষমতা আগের ধরনের চেয়ে ২০ গুণ বেশি এবং এটা মারাত্মক। এর চেয়ে আরও মারাত্মক ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট। এজন্য ভারতীয় সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যথাযথভাবে যদি সীমান্ত বন্ধ করা না যায়, তাহলে আমাদেরকে চরম খেসারত দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতকাল (২৯ জুন) ঘোষণা দিয়েছেন, উনি টিকার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। এজন্য উনাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ। আমরা যদি ৭০ শতাংশ জনগণকে টিকা দিতে না পারি। তাহলে একটার পর একটা ঢেউ আসতেই থাকবে। আর আমাদের অবস্থা খারাপ করে ফেলবে। আমাদের করোনায় যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আছে, আমেরিকার মত উন্নত রাষ্ট্রও করোনার রোগীদেরকে যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারেনি। কারণ বুঝে উঠার আগে হাসপাতালগুলো রোগী দিয়ে ভরে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের করোনার যে রিসোর্স আছে, প্রথম যখন শুরু হয়েছিল তার থেকে উন্নত হলেও এখন পর্যন্ত করোনার যেকোনো ঢেউ সামলানোর সক্ষমতা আমাদের নাই। সেজন্য সংক্রমণ কম যাতে হয়, এজন্য আমাদেরকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সরকারের সাথে আমাদের নাগরিকদেরও উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত। মাস্ক পড়া, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার করা। মাস্কও এক ধরনের ভ্যাকসিন। যারা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিচ্ছেন তারাও কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি না মেনে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা
একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি