২১ জুন, ২০২১ ০৮:৩৩ পিএম

হাসপাতালের ছাদের আস্তরণ ভেঙে চিকিৎসকের ওপর, মাথায় ছয় সেলাই

হাসপাতালের ছাদের আস্তরণ ভেঙে চিকিৎসকের ওপর, মাথায় ছয় সেলাই
ডা. সুতপা রানী সাহা (বামে)। ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: নড়াইল সদর হাসপাতালের ছাদের আস্তরণ ভেঙে এক চিকিৎসকের মাথায় পড়েছে। এতে গুরুতর আহত হয়েছেন কর্তব্যরত নরী মেডিকেল অফিসার। আজ সোমবার (২১ জুন) সকাল ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

ডা. সুতপা রানী সাহা নামে মারাত্মকভাবে আহত ওই মেডিকেল অফিসারের মাথায় ছয়টি সেলাই লেগেছে।

সূত্রে জানা গেছে, গাইনি বিভাগে রোগী দেখছিলেন ৩৯তম বিসিএসের মেডিকেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া ডা. সুতপা। সকাল ১১টার দিকে হঠাৎ করে  হাসপাতাল ভবনের ছাদের অনেক পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে। এ সময় কিছু পলেস্তারা তাঁর মাথায় পড়লে গুরুতর আহত হয়ে পড়েন তিনি।

এ সময় সহকর্মীরা তাঁকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে অস্ত্রোপচারকক্ষে নিয়ে মাথায় সেলাই দেওয়া হয়। আঘাত গুরুতর হওয়ায় ওই চিকিৎসকের মাথায় ছয়টি সেলাই লাগে।

হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. আকরাম হোসাইনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। চিকিৎসার সুবিধার্থে আজকের (সোমবার) রাতটি হাসপাতালে অবস্থান করতে বলেছেন চিকিৎসক।

জানতে চাইলে নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. নাসিমা আক্তার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) দুপুরে আমাকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনের সময় ছাদের একটি আস্তরণ কর্তব্যরত একজন নারী চিকিৎসকের মাথায় পরেছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। ছয়টি সেলাই লেগেছে। তিনি একই হাসপাতালে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছেন। তবে এখন শঙ্কামুক্ত।’

খবর পাওয়ার পর পরই ওই চিকিৎসকের খোঁজ নেওয়ার জন্য একজন প্রতিনিধিকে সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছেন বলেও জানান সিভিল সার্জন।

নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুস শাকুর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘পিডাব্লিউডির মাধ্যমে হাসপাতালের সংস্কার চলমান আছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ চলছে। এখনো শেষ হয়নি। এর পরও যখনই যেটা জরুরি মনে করছি, সেটা সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছি। এর মধ্যে এমনটি হবে কেউ ভাবতেও পারেনি।’

একটি কাজ সম্পাদন হতে এতো সময় দরকার পড়ে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘...আমরাও তাই মনে করি। কিন্তু আমাদের কোনো কাজই তো শিডিউল অনুযায়ী শেষ হয় না। এই যে হাসপাতাল আড়াইশ’ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলছে, তা এতোদিনে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ হয়নি, কাজের গতি দেখে মনে হচ্ছে, আরও দুই বছর সময় লাগবে। আড়াইশ’ শয্যার হাসপাতাল পেয়ে গেলো তো করোনা রোগীদের নিয়েও নাজেহাল হতে হতো না।’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ডা. সুতপার স্বামী ডা. জগন্নাথ ঘোষ তুর্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, ‘৩৯তম বিসিএসের কর্মরত নড়াইল সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আমার সহধর্মিণী ডা. সুতপা সাহার মাথায় হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় ছাদের আস্তরণ ভেঙে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এ যেন স্বাস্থ্যে অব্যবস্থাপনারই চিত্র। বারবার সংস্কার করার কথা বলা সত্ত্বেও করে দেই, দিচ্ছি ওয়ালাদের বলছি; এ দায়ভার আপনাদের। বিপদে তোমার উপর যেন না করি সংশয় প্রভু, এ মোর প্রার্থনা। সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’

এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন জানিয়ে ডা. তুর্য আজ সন্ধ্যায় মেডিভয়েসকে বলেন, রুমের আস্তরণগুলো ভেঙে যাচ্ছিল, তাই সিভিল সার্জন ম্যাডাম এগুলো ঠিক করে দিতে বলেছিলেন। তখন কর্তব্যরত ইনচার্জ এগুলো ঠিক করে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিলেন। এরপর বারবার তাগিদ দেওয়ার পর দেয়াল ও ছাদ মেরামত করা হয়নি। এর মধ্যে আজকে সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটলো।

এ ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বারবার বলার পরও এ ধরনের ছোট্ট একটি কাজ হলো না। চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ছোট একটি জিনিস চাওয়ার পর না পাওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এটা আমাদের প্রতি অবহেলারই প্রমাণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি অবহিত করতে হাসপাতালে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। এখনো পাইনি, উনার বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবো, উনি যেন তার ছেলেকে জানান।’

একই হাসপাতালে ২০১৯ সালে মাশরাফি বিন মুর্তজার আকস্মিক পরিদর্শনে তিন চিকিৎসককে শোকজের ঘটনা তুলে ধরে ডা. তুর্য বলেন, ‘আমরা চাই, তাঁরা আমাদের কাজ, অফিস করি কিনা, নিয়মিত কিনা—এসব পর্যালোচনা করুন। পাশাপাশি চিকিৎসকরা কেমন আছে, কর্মস্থলে তাদের কতটুকু নিরাপত্তা আছে, তাও যেন পর্যালোচনা করা হয়। আমাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।’

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২৭ এপ্রিল বিকেল চারটার দিকে আকস্মিকভাবে সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে যান নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা। এ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিনজন চিকিৎসক। এ ঘটনায় হাসপাতালের তাদেরকে কারণ দর্শানোর চিঠি (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন: সার্জারি বিশেষজ্ঞ আকরাম হোসেন, কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ শওকত আলী ও কাজী রবিউল আলম।

হাজিরা খাতায় ৩ চিকিৎসকের স্বাক্ষর না দেখে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর এবং পরে অনুপস্থিত সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আকরাম হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন মাশরাফি। 

পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভা করেন মাশরাফি। সভায় তিনি বেশ কিছু বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। এর মধ্যে ছিল: যেসব চিকিৎসক হাসপাতালে সময়মতো আসেন না ও অনুপস্থিত থাকেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, হাসপাতালে প্যাথলজিক্যাল সুবিধার সবটুকু যেন রোগীরা পায় তা নিশ্চিত করা, সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসকদের হাসপাতালে অবস্থান করা, হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্স বাদে প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের ভেতরে না থাকা, দালাল চক্রের হাসপাতালে প্রবেশ ঠেকানো, সব রোগীর সরকারি ওষুধপ্রাপ্তির ব্যাপারে জবাবদিহি ইত্যাদি। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি