২১ জুন, ২০২১ ০১:০০ পিএম

করোনায় অধ্যাপক ডা. ডেভিডের মৃত্যু

করোনায় অধ্যাপক ডা. ডেভিডের মৃত্যু
অধ্যাপক ডা. কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিড। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হয়ে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিড মৃত্যুবরণ করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আজ সোমাবার (২১ জুন) ভোর পাঁচটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

অধ্যাপক ডেভিড করোনায় আক্রান্ত হয়ে বিএসএমএমইউতে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় অক্সিজেন ছাড়াই ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছিল। সেখানেই পুনরায় অবস্থার অবণতি হতে আজ ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আজ সকাল ১১টায় তাঁর শেষ কর্মস্থল বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে ক্যাম্পাসে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

অধ্যাপক ডা. কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিডের মৃত্যুতে মেডিভয়েস পরিবার শোকাহত।

অধ্যাপক কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিডে বর্ণাঢ্য জীবন

সাইফুল ইসলাম ডেভিডের জন্ম রাজশাহীর জয়পুরহাট জেলায় ১৯৫৮ সালের ছয় আগস্ট। পড়াশুনা করেছেন জয়পুরহাট সরকারী কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক পসের পর চিকিৎসক হবার ব্রত নিয়ে ভর্তি হোন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাশ করে সিদ্ধান্ত নেন ফরেনসিক বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার এবং ডিপ্লোমা ইন ফরেনিসিক মেডিসিন কোর্সের ১৯৯৮-৯৯ সেশনে ভর্তি হোন । ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সফলভাবে পোস্ট-গ্রেজুয়েসন সম্পন্ন করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।

ডা. ডেভিড ২০০২ সালে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর সততা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমে সহকারী অধ্যাপক এবং পরে সহযোগী অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে অবসরে যাওয়ার আগে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান এই প্রথিতযশা চিকিৎসক। দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা হিসাবে উক্ত মেডিকেলের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও পালন করেছেন। 

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে বগুড়ার  টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রায় দেড় যুগ আনোয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের ছায়া

অধ্যাপক ডা. কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিডের মৃত্যুতে তাঁর সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধ্যাপক ডেভিডেকে নিয়ে নানাবিধ স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন।

ফাহিমা আজাদ পিয়া বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে স্যারের মৃত্যু সংবাদ দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চোখের পানি কোনো ভাবেই থামাতে পারতেছি না। সবাইকেই যেতে হবে, কিছু যাওয়া মেনে নিতে খুব বেশিই কষ্ট হয়। আল্লাহ আপনার ওপারের জীবন সহজ করে দিন এই দোয়া থাকবে সবসময়। ভালো থাকবেন স্যার।’

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘থার্ড ইয়ারে ওঠার আগে ২২ তম ব্যাচ এর এক আপু বলেছিলেন, যাইতেছ তো, বুঝবা মজা, ডেভিড না, উনি সাক্ষাৎ ডেভিল। কেন রাগে, কখন রাগে কেউ জানে না, পরীক্ষার হলে উনার রুপ দেখলে ভয়ে কাপড় নস্ট হয়ে যাবে। কিন্তু,আমরা ২৪ তম ব্যাচ, এতোটাই ভাগ্যবান ছিলাম যে স্যারের রাগ একটি বারের জন্য জন্যও আমাদের কারো দেখতে হয়নি। একা তিনি এক বছর আমাদের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট চালিয়েছেন। প্রতিদিন একবার তো অবশ্যই এমনকি দিনে দুইবার লেকচার নিয়েছেন, লেকচারার সংকটের কারণে অধ্যাপক পযার্য়ের একজন হয়েও স্যার আমাদের আইটেম নিয়েছেন, ডেমো ক্লাস, প্রাকটিকাল ক্লাস করিয়েছেন, আমাদের ২৪ তম ব্যাচ এর কেউ বলতে পারবে না যে ফরেনসিক ভাইভা ভালো দিয়ে বের হয়নি।’

তানজিলা সালাম ওয়াসিত বলেন, ‘সকাল সকাল এত খারাপ একটা সংবাদ। আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছেনা। আমার জীবনের একজন সেরা শিক্ষক হারিয়ে ফেললাম। এইতো সেদিনও স্যারের টাইমলাইনে স্যারের বাড়ির বাগানের ছবি দেখলাম। আমার চোখে বারবার স্যারের লেকচার নেওয়ার সময়কার ছবি ভাসতেছে।’

‘অধ্যাপক ডা. ডেভিড  স্যার আর এই পৃথিবীতে নেই ।ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। আল্লাহ স্যারকে বেহেস্তের সর্ব্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করন, আমিন। এত পাহাড় সম একটা ব্যাক্তিত্বের মানুষকেও করোনার কাছে হার মানতে হলো। আমরা যে আর কত রত্ন হারাবো। আল্লাহ আমাদের মাফ করো,’ যোগ করেন তিনি।

সাইফুন মাহদি অন্তরা বলেন, ‘শহীদ জিয়া মেডিকেলের কথা উঠলে যে কয়জন শিক্ষকের নাম সামনে আসে তার মধ্যে প্রথম দিকে আসে আমাদের অধ্যাপক ডা. ডেভিড স্যারের কথা। থার্ড ইয়ারে উঠার আগে সবাই স্যারকে নিয়ে খুব ভয়ে ছিলাম।স্যার নাজানি কত রাগী হবেন বা কিভাবে  ফরেনসিকে পাস হব কি না। বরাবরের মতো সব কিছু উল্টো প্রমাণ করে দিলেন তিনি। ওই বছর অবসরের আগে আমরাই উনার শেষ ব্যাচ ছিলাম। এমন কোন দিন নেই উনি ক্লাস বাদ দিতেন। এমন কোন পড়া নেই উনি আমাদের কে সেটা ক্লাসেই পড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন না।’ 

করোনা কাউকে ছাড়ল না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন এসে সবার আগে পড়া ধরতেন আগের দিনের টা তারপর পড়ানো শুরু। এত স্মার্ট মানুষ আমরা কমই দেখেছি। স্যারের চলাফেরা,সানগ্লাস পড়ে ভাইভা নেওয়া, ভাইভার পর সবার আলাদা করে অনুভুতি জিজ্ঞেস করা কত কি। ২৪ ব্যাচ কে অনেক ভালবাসা দিয়ে গেছেনস্যার। এখনো মনে পড়ে বিদায়ের দিন কেক কাটার পর স্যার কেঁদে ফেলছিলেন।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি