০৮ নভেম্বর, ২০১৬ ০৬:৫৩ পিএম

উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক

উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক

উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী। জীবদ্দশায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। 

তিনিই প্রথম এদেশে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে অজ্ঞ ও অবহেলিত নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন। অবগুণ্ঠিত নারী সমাজের উন্নত চিকিৎসার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির শক্ত বাধাকে অতিক্রম করে নারী সমাজের মুক্তিদাত্রী হিসেবে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন ডা. জোহরা। বাংলাদেশের অনগ্রসর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন।

এ মহীয়সী নারী ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজনানগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ও আধুনিক চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন।

তখন ‘ব্রিটিশ খেদাও’ আন্দোলনের উত্তাল সময়। ছাত্রজীবনে তিনি বরাবরই মেধাবী ছিলেন। ক্লাসে সব সময় প্রথম হতেন। ফলে সাফল্যের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯২৯ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে আইএসসি পাস করে কলেজ জীবন সমাপ্ত করেন। এরপর উপমহাদেশের প্রথম মহিলা মেডিকেল কলেজ দিল্লির লেডি হার্ডিং গার্লস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজে তিনিই প্রথম মুসলিম বাঙালি ছাত্রী। এখান থেকে ১৯৩৫ সালে এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। তখন তাকে সম্মানজনক ‘ভাইস রয়’ পদক প্রদান করা হয়।

ডা. জোহরা বেগম কাজী ১৯৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তিনি একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্রে বাঙালি নারী চিকিৎসকদের অগ্রপথিক, মানবতাবাদী ও সমাজ-সংস্কারক ছিলেন। গর্ভবতী মায়েরা হাসপাতালে এসে যেন চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন, সেজন্য তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নারীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

পিছিয়ে পড়া নারীদের জাগরণ তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তারই দেখানো পথে আজ বাংলাদেশে অসংখ্য নারী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।

শুধু তা-ই নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন। এছাড়া একজন ইতিহাস-সচেতন মানুষ হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিনির্মাণের লক্ষ্যে তিনি ২০০১ সালের ১১ জুলাই তার কাছে সংরক্ষিত মহাত্মা গান্ধীর ব্যক্তিগত ঐতিহাসিক পত্র, ভাইস রয় পদক, সনদগুলো এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি-স্মারক আমাদের জাতীয় জাদুঘরে দান করে গেছেন।

জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে ডা. জোহরা বেগম কাজী বিভিন্ন খেতাব ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘তখমা-ই পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি ‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) তাকে বিএমএ স্বর্ণপদক দেয়। ২০০২ সালে সরকার তাকে ‘রোকেয়া পদক’ দেয়। ২০০৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) দিয়ে সম্মানিত করে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩২ বছর বয়সে তৎকালীন আইনজীবী ও সংসদ সদস্য রাজু উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আজীবন মানব সেবায় নিয়োজিত জোহরা বেগম কাজী ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর ৯৫ বছর বয়সে ঢাকার নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ মহীয়সী নারী আমাদের মধ্যে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।

৭ নভেম্বর ছিলো তার নবম মৃত্যুবার্ষিকী।  এ উপলক্ষে জোহরা বেগম কাজী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ঢাকায় ও গ্রামের বাড়িতে দোয়া মাহফিল ও তার কবর জিয়ারত করা হয়।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত