১৯ মে, ২০২১ ০৬:২০ পিএম

ব্রিটিশ আইনে সাংবাদিক হয়রানি সরকারকে বিতর্কিত করার প্রয়াস: চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ

ব্রিটিশ আইনে সাংবাদিক হয়রানি সরকারকে বিতর্কিত করার প্রয়াস: চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ
সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের সঙ্গে সচিবালয়ে ঘটা আচরণকে অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ। এ ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, ব্রিটিশ আমলের অকার্যকর আইনে সাংবাদিক হয়রানি করে সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে।

পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকায় সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহের জন্য সেখানে যান।

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর অবাধ তথ্য প্রবাহের ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন নিপীড়নমূল ঘটনায় সাংবাদিকরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং হুমকির মুখে পড়বে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা।

সরকারকে বিতর্কিত করার প্রয়াস

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটি একটি কষ্টের ঘটনা। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক যদি সীমা লঙ্ঘন করেন, তাহলে তাঁর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ আছে। এভাবে তাঁকে ৫/৬ ঘণ্টা আটকে রাখার যে অভিযোগ এসেছে, জানি না তা সত্য কিনা! দীর্ঘক্ষণ তাঁকে আটকে রেখে, থানায় দিয়ে রিমান্ড চাওয়া—এর কিছুই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার সঙ্গে যায় না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তিনি কখনোই তা প্রত্যাশা করেন না।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সঙ্গত কারণেই সাংবাদিকরা সেখানে ভিড় করবেন, তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করবেন। 

বিএমএ মহাসচিব আরও বলেন, ১৯২১ সালের ব্রিটিশ আমলের আইন ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘন হয়েছে অভিযোগ করে তাঁর সঙ্গে…। একবিংশ শতাব্দীতে গণতান্ত্রিক সময়ে এসে এই আইন আপনা-আপনিই তামাদি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এই অকার্যকর আইন দিয়ে সাংবাদিক হয়রানি জননন্দিত সরকারকে বিতর্কিত করার প্রয়াস।

‘আমার মনে হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতি উৎসাহী কিছু কিছু কর্মকর্তা প্রকারান্তরে সরকারকে অহরহ বিব্রত করছেন। এগুলো থেকে যত দ্রুত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেরিয়ে আসতে পারবে, ততই তাঁদের ভাবমূর্তি উন্নত হবে’—যোগ করেন এ চিকিৎসক নেতা।

ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন। এ ঘটনায় আমাদের অনুভূতিটা আপনাদের মাধ্যমে প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন মহলে জানাচ্ছি। আমরা এ ঘটনার নিন্দা করি।’

অবাধ তথ্য প্রবাহ হুমকিতে পড়বে

হেনস্থার ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান মেডিভয়েসকে বলেন, এটা অনভিপ্রেত ঘটনা। এমন ঘটনা কাঙ্ক্ষিত না। রোজিনার সঙ্গে এ আচরণ অবাধ তথ্য প্রবাহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে অবাধ তথ্য প্রবাহের জায়গাটি হুমকির সম্মুখীন হবে। বিরোধীদলে থাকার সময় থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকদের প্রতি শেখ হাসিনার সংবেদনশীলতার সঙ্গে এ ঘটনা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

এর বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ভবিষ্যতে যে কোনো মন্ত্রণালয় কিংবা প্রশাসনিক দপ্তরে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

এতে দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়বে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কিছুটা হলেও হতোদ্দম হয়ে পড়বেন। তবে স্বাধীনতার আগে থেকে সাংবাদিকরা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। ভবিষ্যতেও দেশ এবং জাতির স্বার্থে সাহসিকতার পরিচয় দেবেন তারা। অতীতেও সাংবাদিকদের সঙ্গে এ রকম ঘটনা ঘটেছে। এরপরও তারা হতোদ্দম হননি। আশা করি, এবারও তারা হতোদ্দম হবেন না।’

জোরালো প্রতিবাদ জরুরি

জানতে চাইলে চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস’ ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) চেয়ারম্যান ডা. মো. শাহেদ রফি পাভেল মেডিভয়েসকে বলেন, একজন সাংবাদিক একজন পেশাজীবী। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেই ওখানে গিয়েছিলেন। কারও গায়ে হাত তোলা, লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। উনাকে যেভাবে হেনস্থা করা হয়েছে, তা খুবই খারাপ। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট যে অভিযোগ ছিল সেটা অন্যভাবে তারা খতিয়ে দেখতে পারতো। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সবারই জোরালো প্রতিবাদ করা উচিত। হেনস্থার পর আবার যেভাবে মামলা হলো, গ্রেপ্তার করা হলো। পুরো বিষয়টিই আমাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় মনে হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘হুলুদ সাংবাদিকতা নিয়ে আমাদের কথা থাকে। কিন্তু রোজিনার সঙ্গে যা হয়ে গেছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর জন্য দৃষ্টান্তমূলক একটি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে গেছে।’ 

ডা. শাহেদ রফি পাভেল বলেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কেউই কারও সঙ্গে এ আচরণ করতে পারে না। কারও নামে কোনো অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে অভিযোগ দিতে হবে।

হয়রানির নেপথ্যে স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন

ন্যাক্কারজনক এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেস্পন্সিবিলিটিজের (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন। এ প্রসঙ্গে মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা যেতো। দীর্ঘ সময় হয়রানি করে তাঁকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেটা আরও আগেই করা যেতো। আমরা চাই, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাঁকে হয়রানি করা হয়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে যেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর অবিলম্বে তাকে মুক্তি দেওয়া হোক। 

তিনি বলেন, ‘সে স্পর্শকাতর বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন করেছে সে কারণেই হয় তো তার ওপর হয়রানি নেমে এসেছে। এর সঙ্গে একটি যোগসূত্র থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি।’

এ ধরনের ঘটনাকে অবাধ তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে হুমকি আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদ কর্মে জড়িতরা এখান থেকে একটি ভুল বার্তা পাবে। যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে এর মাধ্যমে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হলো। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অনিয়ম-অসঙ্গতিগুলো রয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সোমবার (১৭ মে) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম। সেখানে তাঁকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ তাঁকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।

পরে তার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া মোবাইল ফোনে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথির ছবি তোলা এবং আরও কিছু নথি লুকিয়ে রাখার অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

মামলায় তাঁর রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার জামিন শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন আদালত। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি