ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


০৯ মে, ২০২১ ০১:৩০ পিএম

46, XX

46, XX
প্রতীকী ছবি

আমি আসলে মা কী তা প্রথম পরিষ্কারভাবে বুঝতে শুরু করি যখন রুমা মা হয়।  পঞ্চমবর্ষের মেডিকেলে ছাত্রী রুমা বাচ্চা পেটে নিয়ে কেমন কষ্ট করতো, তা আমি মাঝে মাঝে রাতে টের পেতাম। 

আমার রাতের ঘুম খুব ভালো, রুমা সারারাত ঘুমাতে পারতো না। উঠে হাঁটাহাঁটি করতো। কেউ নেই আপনজন। হরতালের মধ্যে এম্বুলেন্স ডেকে এনে সিজারিয়ান করা হলো। পোস্ট-অপারেটিভ তৃতীয়দিনে সে শ্বাস নিতে পারে না, মারা যায় যায় অবস্থা। সব মেয়ের-ই প্রথম প্রেগন্যান্সি নিয়ে শংকা থাকে, নিজের জীবনহানির শংকা। আনন্দ থাকে- নিজের রক্ত দিয়ে, নিজের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা নতুন জীবনের আনন্দ। সে যাত্রায় রুমা বেঁচে যায়। 

তারপর শুরু হয় আমৃত্যু প্রশংসাবিহীন তত্ত্বাবধায়কের কাজ।  সারা রাত জেগে থাকো, কাপড়-বিছানা পরিবর্তন করো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে খাওয়াও, খেয়ে বমি করার পর তা পরিষ্কার করো, আবার খাওয়াও! এক চক্রবন্দি জীবন। 

আমার কাছে কখনো কখনো দুঃসহ মনে হত, অথচ কী সুন্দর কষ্ট গোপন করে বছরের পর বছর রুমা তা করে যায় হাসিমুখে।  রুমার মধ্যে আমি মা দেখি।  রুমাকে দিয়ে আমি আমার নিজের মাকে চিনি। এর আগে আমি মা চিনতাম না। 

দুই.

রাতের বেলায় ঘুমের মধ্যে টের পাই রুমা বিছানা থেকে উঠে যাচ্ছে।  আজ অবধি যায়।  আমি জানি কোথায় যায়। সে নিশ্চিত করতে যায় যে শীতের সময় আমার মেয়েদের গায়ে লেপকম্বল আছে কি না, তাদের ঘুমের মধ্যে ঠাণ্ডা লেগে যায় কি না, প্রতি দুই ঘন্টা পর পর তা নিশ্চিত করতে ঘুম থেকে উঠে তাদের কাছে চলে যায়।  গরমের সময় যায় তারা ঘামিয়ে যাচ্ছে কি না। তাদের ফ্যান-এয়ার কন্ডিশন বাড়ানো-কমানো লাগবে কি না। নিশ্চিত করে এখনো, করছে গত ২২ বছর যাবৎ। বিরামহীন। রুমা-কে দিয়ে আমি আমার মা-কে চিনি। এর আগে আমি মা কে চিনতাম না। 

তিন.

আমার মেয়েদের সাথে আমার সখ্যতা বন্ধুর মত। পৃথিবীর এমন কিছু নেই যে তারা আমাকে বলতে পারে না। সব কষ্টে আমার কাছে আসে, কোলের মধ্যে শুয়ে পড়ে। পিরিয়ডের ক্রাম্প সহ্য না করতে পারলে আমি বিছানায় শুইয়ে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। অনলাইনে একটি বিদ্যুৎচালিত হটপ্যাড কিনে নিয়ে আসি। তারা খুব অবাক হয় যে আমি কিভাবে বুঝলাম যে এতে তাদের খুব উপকার হবে। আমি তাদের পিরিয়ডের শরীরতত্ত্বীয় বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছি, তারা ছোটবেলা থেকে জানে ইনফ্লামেশন কী, কেন ব্যাথা হয়। ব্যাথা সহ্য করতে না পারলে আমাকে ফোন করে কাঁদে যে আমি কাছে নেই কেন। প্রতিমাসের ব্যাপার। তাদের জীবন দিয়ে আমি রুমা-কে চিনি, আমার মা কে চিনি। এর আগে আমি রুমা বা আমার মা কে চিনতাম না। 

চার.

আমার মেয়েদের আমি বিজ্ঞান শিখিয়েছি, আর রুমা তাদের ধর্ম শিখিয়েছে। আমি তাদের বিজ্ঞানী-দার্শনিকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি।  রুমা তাদের আল্লাহ-নবী-রাসূলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ধর্মকে জীবন যাপনের মাধ্যম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ঘর দিয়ে বেরোনোর সময় আয়াতুল কুরসী মুখস্ত করিয়েছে। মোনাজাতে রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বিইয়ানি ছাগীরা শিখিয়েছে। তাহাজ্জুদ পড়ে মেয়েদের জন্য দোয়া করে। খেলার ছলে রান্না শিখায়। মেয়েরা মায়ের কথা মেনে চলেছে, বুঝে-শুনেই মেনেছে। আমি তাদের দুনিয়া শিখাই, রুমা তাদের আখেরাত শিখায়। আমার এই মেয়েদের দিয়ে আমি রুমা কে চিনি, রুমা কে দিয়ে আমার মা কে চিনি। এর আগে আমি তাদের চিনতাম না। 

পাঁচ.

আমরা ধর্মপুস্তকে পড়েছি মায়ের পায়ের নিচে বেহেস্ত। হাদিসে পড়েছি যে রাসূল (সা.) তিনবার মায়ের কথা বলেছেন, তারপর বলেছেন বাবার কথা। এগুলোর মর্মার্থ তখন বুঝিনি।  

রুমাকে দিয়ে আমি রাসূলের কথা বুঝেছি। আমাদের মেয়েদের মেয়েবেলার কষ্ট দেখে আমি আমার রাসূলের কথা বুঝেছি। এদের দিয়ে আমি আমার মা কে চিনেছি। একটা মেয়ে, স্ত্রী এবং মা- একই মানুষের জীবনের স্পেকট্রাম। এঁরা এই জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজে শান্তিতে থাকেন না, সব সময়ই অন্যের কথা চিন্তা করে।  ছোটবেলায় নিজের ভাই বোনের কথা, বাবা-মায়ের কথা, স্ত্রী বেলায় সংসারের কথা, অন্যের সুখশান্তির কথা, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা, আর মা বেলায় বৃদ্ধ স্বামীর কথা, নিজের সন্তান এবং তাদের সন্তানদের কথা। এই হলো একজন মেয়ের জীবন। আমি আমার মেয়েদের না দেখলে আমি এগুলো বুঝতাম না, আমার মেয়েদের না দেখলে আমি রুমা কে চিনতাম না। আমি রুমা কে না চিনলে আমার মা কে চিন্তাম না। 

ছয়.

আপনারা যারা মা দিবস পালন করেন, তারা কি নিজের মা কে চেনেন? 
নিজের স্ত্রীকে চেনেন? নিজের কন্যাকে চেনেন? 
আপনি কি আপনার কন্যা, স্ত্রী এবং মাকে সমান ভালোবাসা দিতে পারেন? 
আপনাদের জন্য মা দিবস আছে, কিন্তু মায়েদের জন্য সন্তান দিবস নেই কেন, জানেন? 
কারণ, মা-দের জীবনের প্রতি মুহূর্তই হলো সন্তান-মুহূর্ত। যাদের প্রতি মুহূর্তই সন্তান, তাদের আবার সন্তান দিবস কী?
হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি পৃথিবীর সকল জীবিত কন্যাদের মঙ্গল করো, সকল জীবিত স্ত্রীদের মঙ্গল করো, এবং সকল জীবিত মা-দের মঙ্গল কর। আর, সকল মৃতদের তোমার রহমতের চাদরে আবৃত করে রেখো যেমন তারা রেখেছিলো আমাদের সারাবেলা। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত