০৩ নভেম্বর, ২০১৬ ০৯:৫৯ এএম

শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

শ্বাসতন্ত্রের রোগে গত বছর দেশে প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে ভুগছে ৭০ লাখের বেশি মানুষ। রোগের প্রকোপ এবং এতে মৃত্যু কমাতে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ।

গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এসব কথা বলেন। প্রথম আলো এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

এতে সহযোগিতা করেছে শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের রোগের চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক এবং একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আনিসুল হক বলেন, অনেকের বিবেচনায় ঢাকা আবাসযোগ্য নয়। এখানে ৩ লাখ মোটরযান থাকার কথা, আছে ১১ লাখ। ২ হাজারের মতো খোলা পরিসর দরকার, আছে ৫০টির কম। ৫০০ শিশুর ওপর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের করা এক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, শহরের প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত।

দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের (সিওপিডি) প্রধান কারণ ধুলা আর ধোঁয়া বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক মো. রাশিদুল হাসান। তিনি বলেন, সিওপিডিতে আক্রান্তদের ৩৫ শতাংশ নারী। এর একটি কারণ, তাঁরা ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করেন। তিনি নারীদের পরিবেশসম্মত চুলা সরবরাহের সুপারিশ করেন। 

এই বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণের কারণে বারবার ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়া হয়। টিকা দিয়ে শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে। নিউমোনিয়া কমানোর জন্য বয়স্কদের টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগে শিক্ষা ও জনসচেতনতার বড় ভূমিকা আছে বলে উল্লেখ করেন রাশিদুল হাসান।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, শিশু বহির্বিভাগে আসা রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শ্বাসনালি ও ফুসফুসের রোগী। অ্যাজমা, সাধারণ সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস মূলত শিশুদের শ্বাসনালির রোগ। শিশুদের নিয়ে করা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওই জরিপের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।

তিনি বলেন, শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত শিশুদের ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের জন্মের সময় ওজন কম, এদের ফুসফুস দুর্বল। অপুষ্টি, পরিবেশদূষণ ও খাদ্যদূষণের কারণেও শিশুরা শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের সুরক্ষার জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর ওপর জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ।

সূচনা বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের প্রধান রোগ পাঁচটি: ফুসফুসের সংক্রমণ, সিওপিডি, অ্যাজমা, যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যানসার। সিওপিডি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর চতুর্থ বৃহত্তম কারণ।

ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ফুসফুসের ক্যানসারে। এর প্রধান কারণ তামাক ও ধূমপান। বর্তমান বিশ্বে যক্ষ্মার ঝুঁকি এইচআইভি এইডসের চেয়ে বেশি। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডিআর টিবি) মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো উপস্থিত হয়েছে। তিনি বলেন, সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ আগের চেয়ে কিছুটা কম।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিম বলেন, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে। কৃষি উৎপাদনে ভালো করেছে। সাম্প্রতিক জঙ্গি দমনেও সফল হয়েছে। বাংলাদেশ সিওপিডি প্রতিরোধেও সফল হবে।

দুই ঘণ্টার এই গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, যক্ষ্মার ক্ষেত্রে সফলতার একটি কারণ সরকারের ডটস্ কর্মসূচি। তিনি বলেন, ১৬ নভেম্বর বিশ্ব সিওপিডি দিবস সামনে রেখে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আলী হোসেন বলেন, ১৯৯৯ সালের পর ২০১০ সালে সিওপিডি নিয়ে জরিপ হয়। ১০ বছরের ব্যবধানে দেখা গেছে, এ রোগের প্রকোপ দ্বিগুণ বেড়েছে। অনেক রোগীর কাছ থেকে শুনতে হয় যে তারা ওষুধ কিনতে পারছে না। কারণ, ওষুধের দাম বেশি।

রোগীরা যদি ওষুধই কিনতে না পারে, তাহলে চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপত্র দেওয়া অর্থহীন। এই বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চিকিৎসকদের চেয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা বড়।
বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ শাহেদুর রহমান খান বলেন, বক্ষব্যাধির অন্যতম কারণ ধূমপান।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক পণ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু সিগারেট পাওয়া যায়। তামাকপণ্য যেন সহজপ্রাপ্য না হয়, সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তামাক উৎপাদনকারীদের ফল উৎপাদনে উৎসাহিত করতে হবে।

বিশিষ্ট স্ত্রী ও প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশান আরা বেগম নিজের কাছে আসা রোগীদের তথ্য তুলে ধরে বলেন, অ্যাজমা রোগী বাড়ছে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে গর্ভবতী মা ও গর্ভস্থ শিশু উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক বশীর আহাম্মদ বলেন, সিওপিডি ও ফুসফুসের অন্যান্য রোগ চিকিৎসায় দেশে ৪০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। অচিরেই এ বিষয়ে চিকিৎসক-সংকট দূর হবে। এখন প্রয়োজন কেন্দ্র থেকে উপজেলা পর্যন্ত যন্ত্রপাতি ও ওষুধ নিশ্চিত করা।

অনুষ্ঠানে ধূমপানের বিরুদ্ধে একাধিক আলোচক জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফউদ্দিন বেন্নূর বলেন, ধূমপান মানুষের চুল থেকে নখ পর্যন্ত সব অঙ্গেরই ক্ষতি করে। তবে প্রধান আক্রান্তস্থল ফুসফুস।

অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি পাঁচ গুণ, ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি ২৫ গুণ এবং সিওপিডির ঝুঁকি ১৫ গুণ বেশি। ধূমপানবিরোধী আইন আছে, তবে এর যথার্থ প্রয়োগ নেই।

ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সৈয়দা অনন্যা রহমান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো বাজেট নেই। তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সেল আছে, তার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় দাতাদের অর্থে।

রাজধানীর শংকর বাসস্ট্যান্ড থেকে রাইফেল স্কয়ার পর্যন্ত সামান্য একটু জায়গায় ৪৮টি দোকানে সিগারেট বিক্রি হয় আইন অমান্য করে। তিনি ধূমপানবিরোধী আইনের যথার্থ প্রয়োগের ওপর জোর দেন।
নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ বলেন, বিদেশে ছবি তুললে ঝকঝকে হয়, দেশে তা হয় না। কারণ, বাতাস পরিষ্কার নয়। শহরের দূষণ কমাতে সিটি করপোরেশনের বড় উদ্যোগ হাতে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুস শাকুর খান বলেন, ঘরে দূষণ, ঘরের বাইরেও দূষণ।

এতে সবচেয়ে ক্ষতি হয় শিশুদের। ঘরের দূষণ কমানোর দায়িত্ব পরিবারের। আর বাইরের দূষণ কমানোর দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি ও সরকারের।

ঢাকার পরিবেশের উন্নতি ও বায়ুদূষণ কমানোর কিছু উদ্যোগ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়েছে বলে জানান মেয়র আনিসুল হক। এর একটি হচ্ছে, শহরে গাছ লাগানো শুরু হয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে টব দেওয়ার জন্য তিনি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানান।সৌজন্যে: প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি