ডা. ইসমাইল আযহারী

ডা. ইসমাইল আযহারী

ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ 
সেশন: ২০১৩-১৪


১৪ মার্চ, ২০২১ ১০:২০ এএম

ইসলাম কি সংক্রামক ব্যাধি সমর্থন করে?

ইসলাম কি সংক্রামক ব্যাধি সমর্থন করে?
ছবি: সংগৃহীত

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বোখারী শরীফে একটি হাদীস এসেছে, রাসুল কারীম (সা.) বলেন, (লা আদওয়া) অর্থাৎ সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছুই নাই। এখানে এই হাদীস নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীদের একটু এলার্জি রয়েছে, আবার এই এলার্জিতে ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে কিছু ইসলামপন্থির অযাচিত ভূমিকা।

এই হাদীস যদি কোনো আলেম মেডিকেল সায়েন্স ও theory of disease causation এর আলোকে ব্যাখ্যা করতো, তাহলে এই হাদীস নিয়ে ইসলাম বিদ্বেষীদের প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকতো না।

এই হাদীসের ব্যাখ্যা  ও তরজুমা করতে গিয়ে কিছু কিছু ওলামায়ে কেরাম তথা ইসলামিক স্কলারগণ সঠিক ভূমিকা রাখতে পারেনি। যে কারণে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মাঝে ভুল মেসেজ যাচ্ছে, এবং এই হাদীসের সহীহ কিংবা অ-সহীহ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এবার আসি, এই পবিত্র হাদীসে মূলত রাসূল কারীম কি বুঝিয়েছেন, তা জেনে নিই.

রাসূল কারীম (স.) আজ থেকে প্রায় সাড়ে চোদ্দশ’ বছর আগে, যখন আরবের মাঝে শত শত কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাস প্রচলিত ছিলো, তখন রাসূল কারীম (স.) এইসব কুসংস্কার দূর করার জন্য এই হাদীস বলেন। আরবের যেইসব কুসংস্কার এই হাদীসে উল্লেখ হয়েছিল, তা ছিল মোটামুটি নিম্নরূপ,

১. তারা বিশ্বাস করতো, কোন একজন মানুষের যে কোনো রোগ হলে তা তার আশপাশের সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে, তাই তারা যে কোনো রোগ হলে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করে দিতো, এমনকি কারো পেটে ব্যথা হলেও তারা এমন আচরণ করতো, কারো জ্বর হলেও তারা এমন আচরণ করতো।

এমনকি কোনো কারণে কারো মাথা ব্যথা হলেও তারা ভাবতো, এটা পুরো কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়বে! এই অনুমাননির্ভরতা ও অজ্ঞতা থেকেই তারা যে কোনো রোগীকে সামাজিকভাবে আইসোলেট করে দিতো।

২. আর তারা ভাবতো, যে কোনো রোগ হচ্ছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে শাস্তি, তাদের ধারণা এমন পর্যন্ত ছিল যে, কেউ যদি কোনো ফলের ঘ্রাণ নিতো, তার মাঝেও রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। কমিউনিটি মেডিসিন যারা পড়েছেন তারা অবশ্যই জানবেন, Theory of Disease Causation এর old concept গুলো ছিলো পরিপূর্ণ অজ্ঞতাপূর্ণ।

বিষয়টি পরিষ্কার করার সুবিধার্থে আমি এখানে কয়েকটি old concept উল্লেখ করছি। এতে হাদীসের মর্মার্থ বুঝতে সহজ হবে। 

১. Demonic theory: একে devil theory ও বলা হয়, প্রাচীনকালে এই থিওরির প্রচলন ছিল। এই থিওরি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির আত্মা কিংবা কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি কিংবা কোন দৈত্য যে কোনো রোগের জন্য দায়ী, তাই তাদের বিশ্বাস ছিল, কারো রোগ হলে আধ্যাত্মিকভাবে তা অন্যের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে।

২. Punitive theory: এই থিওরি অনুযায়ী রোগ হয়ে থাকে স্রষ্টার পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে, তাই কেউ অসুস্থ হলে তারা মনে করতো, তার উপর স্রষ্টার অসন্তুষ্টি রয়েছে, তাই তার সঙ্গে থাকলে রোগ আমাদের মাঝেও চলে আসবে, যে কোনো রোগকে তারা divine punishment হিসেবে চিহ্নিত করতো।

৩. Miasmatic Theory: এই থিওরি হিসেবে বিশ্বাস করা হতো, যে কোনো ঘন্ধযুক্ত বাতাস থেকে রোগ ছড়ায়, এমন কি তারা মনে করতো, ফলের ঘ্রাণ নিলে obesity হতে পারে। এর পর আসে আধুনিক Germ Theory. যেখানে রোগের জন্য micro organism কে দায়ী করা হয়ে থাকে।

যখন মানুষের বিশ্বাস ছিল, রোগ হচ্ছে স্রষ্টার শাস্তি কিংবা রোগ ছড়ায় কোনো দৈত্যের মাধ্যমে। তাহলে চিন্তা করুন, তাদের চিন্তা কত নিচু স্তরের ছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো পরিপূর্ণ ভ্রান্ত। তাদের বিশ্বাস ছিলো, দৈত্য দিয়ে কিংবা মৃত মানুষের আত্মা দিয়ে একজনের রোগ হয়ে তা অন্যের মাঝে সংক্রমিত হয়ে পড়ে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, তখন এই কুসংস্কার দূর করণের জন্য রাসুল কারীম (সাঃ) বলেন, কোনো সংক্রমণ ব্যধির থিওরি ইসলামে নাই। অর্থাৎ সকল রোগ সংক্রমিত নয়। (Not every disease is contagious). 

এই হাদীসে রাসূল কারীম (স.) Contagious disease কে বা সংক্রমণ ব্যাধিকে অস্বীকার করেননি, বরং রাসুল কারীম (স.) তাদের অন্ধ বিশ্বাসকে ভেঙে দিতে এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, রোগ সংক্রমণের ব্যাপারে তোমাদের যেই ধারণা তা পরিত্যাজ্য। 

তখন এক সাহাবী জানতে চাইলেন হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আপনি আমাদের উটের পাল সম্পর্কে কি বলবেন, যেই উটগুলো মরুভূমিতে থাকে, এবং তাদের একটি উটে itching বা চুলকানি দেখা দিলে ধাপে ধাপে তা অন্য উটদের সংক্রমিত করে দেয়। তখন রাসূল (স.) বললেন, তাহলে প্রথম যে উট আক্রান্ত হয়েছে, তাকে কে সংক্রমিত করেছে? (প্রথম উটের মাঝে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংক্রমণ হয়েছে এবং পরে তার সংস্পর্শে থাকার কারণে অন্যরা সংক্রমিত হয়েছে) নিজে নিজে সংক্রমিত হয়নি। 

এখানে লক্ষ করুন, আল্লাহর রাসূল (স.) ওই সাহাবীর প্রশ্নের উত্তরে সংক্রমণ ব্যাধিকে অস্বীকার করেননি, বরং বোঝাতে চেয়েছেন যে, সংক্রমণ নিজে নিজে হয় না, এর উৎপত্তি হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর পরবর্তী সংক্রমণগুলো হয় আক্রান্তের সংস্পর্শে আসার কারণে।

এই হাদীসে রাসূল (স.) সংক্রমণ ব্যাধিকে অস্বীকার নয়, মূলত তাদের অন্ধ বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছেন, যারা মনে করতো প্রতিটি রোগই সংক্রামক (communicable), যাতে মেডিকেল সায়েন্সেরও স্বীকৃতি নেই। রাসুলের (স.) এ বক্তব্যের সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের চিন্তা-গবেষণার দারুণ মিল রয়েছে। কারণ সব রোগ সংক্রমণশীল না, যেমন ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ইত্যাদি। 

উপরের হাদীসে রাসূল কারীম (স.) যে সংক্রমণ ব্যাধি অস্বীকার করেননি, অন্য হাদীস থেকেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল কারীম (স.) বলেন, তোমরা মহামারী (সংক্রমণ ব্যাধি) থেকে এমনভাবে ভেগো, যেমনভাবে তোমরা সিংহ দেখলে পলায়ন করো। এই হাদীসে মূলত রাসুল কারীম (স.) উম্মতকে basic personal protection শিক্ষা দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে যাকে home quarantine বলা হচ্ছে। যখন ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কার হয়নি, তখন রাসূল কারীম (স.) মহামারি থেকে ভাগতে বলেছিলেন যেনো মানুষ নিজের পার্সোনাল প্রোটেকশন নিতে পারে।

অন্য এক হাদীসে রাসূল কারীম (স.) বলেন, তোমরা যদি কোনো এলাকায় মহামারী দেখো, তাহলে সেখানে প্রবেশ করোনা, আর তোমরা যদি পূর্ব থেকে ওই এলাকায় থাকো, তাহলে মহামারী শুরু হলে এলাকা থেকে বের হয়ো না, অর্থাৎ লক ডাউন মেনে চলো। 

এই হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে সংক্রমণ ব্যাধির অস্তিত্ব বোঝা যায়। তাই করোনা যেহেতু সংক্রমণ ব্যাধি, একজন সুস্থ ব্যক্তি অন্যজন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে  আসলে ভাইরাস (ক্ষুদ্র অনুজীব) আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে পরিবাহিত হবে৷ তা হাঁচি, কাশি কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির ডাইরেক্ট সংস্পর্শেও হতে পারে, তাই ইসলাম এই ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।