২৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৬:৩৭ পিএম
জামালপুরে নিগৃহীত ইএমও ডা. চিরঞ্জীবের স্ট্যাটাস

‘ওই ডাক্তার কই, ওরে জবাই করে ফেলবো’

‘ওই ডাক্তার কই, ওরে জবাই করে ফেলবো’
হামলায় আহত ডা. চিরঞ্জীব সরকার। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় জামালপুর শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত হন জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. চিরঞ্জীব সরকার। এছাড়া হামলায় সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ ১৫ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন।

গত ২৫ ডিসেম্বরের ওই ঘটনায় চিকিৎসকদের মারধরের পাশাপাশি ভাঙচুর করা হয় হাসপাতালের জিনিসপত্র। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি এবং গুরুতর আহত হন ডা. চিরঞ্জীব সরকার।

এমন নির্মম ঘটনায় নিজেকে একজন হতভাগা চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন ডা. চিরঞ্জীব সরকার। মেডিভয়েসের পাঠকদের জন্য তাঁর লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

ঘটনার দিন নামাজের সময়ে করিমন বিবি নামে একজন রোগী নামাজ পড়তে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। রোগীর সাথে তখন ৪/৫ জন ছিল। তাদের ব্যবহার তখনও ভালোই ছিল। বলাবাহুল্য, ঘড়ি না দেখলেও হয়ত এক মিনিটেরও কম সময়ে আমি অ্যাটেন্ড করি।

রোগীর তখন head swelling, gasping respiration, leg superficial trauma ছিল। রোগী দেখে মাত্রই অক্সিজেন লাগিয়ে দেয়া হয়। এর পর ভিতরের রুমে এসে আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসাপত্র লিখে দিই। রোগীর লোককে বলি আপনাদের রোগী কিন্তু খারাপ, যেকোনও সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ নেওয়া লাগতে পারে। কারণ আমার মনে হচ্ছিল রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট দরকার। হামলাকালীন যারা ছিল, তাদের কেউই তখন ছিলেন না।

রোগীকে নিয়ে তারা ওয়ার্ডে চলে যায়। তার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পরে আমি দেখি তারা রোগীকে নিয়ে বিপুল জনগণসহ চলে আসে। আসার সাথে সাথেই তারা দায়িত্বরত নার্সদের সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করে। কেন হাসপাতালের ওয়ার্ডে অক্সিজেন নাই। তার জন্য চিল্লাফাল্লা শুরু করে দেয় এবং অশালীন ভাষায় কথা বলতে থাকে।

আমি এবারও যথাসাধ্য চেষ্টা করি দ্রুত অ্যাটেন্ড করার। আমি আসার পরে আমাকে প্রথমে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়। এর পরে একজন এসে আমাকে ধাক্কা মারে। আমি ধাক্কা সামলে উঠে রোগী দেখা শুরু করি। আর দায়িত্বরত নার্সকে বলি অন ডিউটি পুলিশ সদস্যদের খবর দিতে। তারা খবর পেয়ে আসেন।

এর মধ্যে আমি সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু রোগী তার আগেই মারা যাওয়ায় (বস্তুত ওয়ার্ড থেকে দ্বিতীয়বার জরুরি বিভাগে আনার আগেই রোগী হয়ত মারা যান) কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। তারপরও আমি আবার পিউপিল চেক করি। অক্সিজেন কিন্তু আসার সাথে সাথেই তারা নিজেরাই লাগিয়ে নেন। 

এরপর তাদের একজন আমাকে সেখানেই বলে উঠে যে, আজ আমার খবর আছে। রোগীকে যেভাবে পারি বাঁচাতে, না হলে জিন্দা ফিরতে পারবো না। এর মধ্যে পুলিশের দুইজন সদস্য চলে আসে। কিন্তু তাদের উপস্থিতিতেই আমাকে পেটে লাথি মারা হয়। আমি তা সামলে নিয়ে পুনরায় রোগীর কাছে থাকি। পালস বিপি চেক করতে থাকি। এর মধ্যে তারা হাসপাতালের স্টেথোস্কোপ ভেঙে দেয়। আর রুমে ভাঙচুর তো আসার পরপরই শুরু করে দেয়।

আমি পুলিশদেরকে বলি তাদের ফোর্স নিয়ে আসতে। এতো লোক ছিল যে, আমি ওখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। একটু সুযোগ আসার পরে আমি বের হই। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাইরে যাবার উপায় ছিল না। তখন তারা আমাকে না পেয়ে বলতে থাকে ওই ডাক্তার কই, ওরে আজকে উঠায় নিয়ে জবাই করে ফেলবো।

তখন এডিশনাল এসপিকে ফোন করি, জানাই হামলা হচ্ছে। এরই মধ্যে আমার আরএমও স্যারকে জানাই। তাদেরকে জানানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ ফোর্স চলে আসে। তারা যখন আসে, তখন তাদের সামনে থেকে আমাকে তারা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

একজন পুলিশ সদস্য আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা এত বেশি ছিল যে, তার পক্ষে আটকানো সম্ভব হচ্ছিল না। আমি প্রাণপনে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু এদিকে আমার উপরে লাথির পর লাথি, ঘুষির পর ঘুষি আসতে থাকে। আমার চুল ধরে আমার মাথা ওয়ালে আঘাত খাওয়ানো হয়। আমার পেটে, পিঠে, মাথায়, ঘাড়ে, পায়ে লাথি, কিল ঘুষি চলতেই থাকে।

তাদের মুখে ছিল আজ ওরে মাইরা ফেলব, মার, মার...। ততক্ষণে জরুরি বিভাগের অন্যান্য স্টাফরা চলে আসে। তারাও চেষ্টা করেন আমাকে বাঁচানোর। যদি আর ৩/৪ মিনিট এভাবে চলতে থাকত, আমি হয়ত স্পট ডেড হয়ে যেতাম। আমার ইন্টার্নরাও তখন আমাকে বাঁচাতে এসে আহত হয়।

এরপরে আমাকে নিয়ে আমাদের রেস্ট রুমে রাখা হয়। স্টাফরা আমার শুশ্রূষা করার ব্যবস্থা করেন। সত্যি বলতে ওই পুলিশ সদস্য যদি আমাকে না জড়িয়ে রাখতেন। আমাকে হয়ত ওরা উঠিয়ে নিয়ে যেত। আর মেরেও ফেলত।

এর কিছুক্ষণ পর আমার সম্মানিত ইউএইচএফপিও স্যার আসেন। উনি আমাকে অভয় দান করেন। পরে তিনি রুমের বাইরে চলে যান অন্যান্য স্যারদের নিয়ে। তারপর ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখিনি। পুলিশের উক্ত কর্মকর্তার আচরণ শাস্তিযোগ্য। 

আমি এখন শারীরিকভাবে অনেক অসুস্থ। জায়গায় জায়গায় ব্যথা আমার। আর চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই সেই দুঃসহ ঘটনা। যখন আমাকে ২০-২৫ জন মিলে মারছে, উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। আমি জানি না আমি কত দিনে পারব এই দুঃস্বপ্ন ভুলতে।

আমি এই দুঃসময়ে আপনাদের সবাইকে পাশে চাই। আপনারা আছেন বলে আমি এখনও টিকে আছি। বিশেষ করে বলতে হয় আমার স্ত্রীর কথা, সে আমাকে বুস্ট আপ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমার পরিবার, শ্বশুরবাড়ি সবাই উৎকণ্ঠায় আছে।

সবার কাছে একটিই চাওয়া আমার, এই ঘটনার যেন বিচার হয়। সারা দেশের সকল চিকিৎসক যেন নিরাপত্তা সহকারে সেবা দিতে পারেন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা চাই।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক লাঞ্ছিত
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি