২৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৫:০৬ পিএম
জুনিয়র কনসালটেন্ট

পদোন্নতিতে সিনিয়র হয়েও নামে ঝুললো জুনিয়র তকমা!

পদোন্নতিতে সিনিয়র হয়েও নামে ঝুললো জুনিয়র তকমা!
ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: চলতি মাসে সারাদেশে প্রায় সাড়ে নয়শ’ চিকিৎসককে জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ ডিসেম্বর ৪৩৮ জন এবং ২৩ ডিসেম্বর পদোন্নতি পান ৫১২ জন। তাদের মধ্যে ১২৪ নন-ক্যাডার আর বাকিরা সবাই ক্যাডার। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ মাসের মধ্যেই আরও কয়েকশ’ চিকিৎসকের জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার কথা রয়েছে।

প্রায় একযুগ চাকরির পর এ সোনার হরিণ ধরা দিলেও পদোন্নতিতে নামের আগে জুনিয়র শব্দ যুক্ত হওয়ায় এসব চিকিৎসকের সন্তুষ্টি যেন মিলিয়ে যাচ্ছে অতৃপ্তির অন্ধকারে।

তারা বলেন, অন্য ক্যাডারে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র হলেও চিকিৎসকদের বেলায় হচ্ছে জুনিয়র কনসালটেন্ট, এটা পরিবর্তন জরুরি। তাদের দাবি, এ পদবি পরিবর্তন করে কনসালটেন্ট কিংবা সিনিয়র কনসালটেন্ট করা হোক। এতে সরকারের বাড়তি কোনো ব্যয় হবে না, বরং এটা চিকিৎসকদের একটি সম্মানের বিষয়। 

এ ছাড়া পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতায় হতাশা প্রকাশ করে তারা বলেন, ছয় মাস পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদোন্নতির হালনাগাদের ব্যবস্থা থাকলে চিকিৎসকরা উৎসাহিত বোধ করবেন।

চিকিৎসকদের চাই একটু সম্মান 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেহেরপুরে কর্মরত একজন চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, এটা নিয়ে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা একটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন। এ নিয়ে একটি অর্গানোগ্রামও করা হয়েছিল। সেখানে জুনিয়র শব্দ বাদ দিতে বলা হয়েছে। পদবি হবে কনসালটেন্ট বা সিনিয়র কনসালটেন্ট। চিফ কনসালটেন্ট পদবিও আসবে। ওই প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে গেছে। এটা আজও পাস হয়নি, ঝুলে আছে। 

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে, এটা করা হবে। কিন্তু হচ্ছে না। এটা আসলে তেমন কিছুই না। মন্ত্রণালয় শুধু একটু উদ্যোগ নিলেই হয়। এখানে সরকারের নতুন কোনো ব্যয় নাই। এটি শুধুমাত্র চিকিৎসকদের সম্মানের বিষয়।’

সম্মান পেলে বাড়ে কাজের গতি 

একটু সম্মান পেলে সবাই উৎসাহিত বোধ করেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘৮/১০ বছর চাকরির করার পরে যখন নামের আগে পদবি হিসেবে জুনিয়র শব্দের উল্লেখ থাকে, তখন অতৃপ্তি তৈরি হয়। অথচ কনসালটেন্ট নামে কোনো পদই নাই। এফসিপিএস, এমডি-এস, কিংবা রেসিডেন্সি কোর্স করার পর একজন চিকিৎসকের একটি পদোন্নতি আসলো, আর নামের আগে বসলো জুনিয়র শব্দ। এটা অসঙ্গতিপূর্ণ।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এমডি কোর্সে অধ্যয়নরত ডা. বিকাশ চন্দ্র পাল মেডিভয়েস বলেন, একজন চিকিৎসক স্বাস্থ্য ক্যাডারে চাকরিতে যোগদানের পর দুই বছর গ্রামে থাকেন। তারপর অনেক পরিশ্রম করে ডিপ্লোমা, রেসিডেন্সি বা এফসিপিএস কোর্সে চান্স পান। এটি সম্পন্ন করার পর চাকরিতে পদোন্নতি পাচ্ছেন জুনিয়র কনসালটেনন্ট হিসেবে। এটা কষ্টের। শিক্ষাগত যোগ্যতার আলোকে তখন সিনিয়র কনসালটেন্ট বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পাওয়াটা যুক্তিযুক্ত। 

এমনটি হলে কাজে গতি বাড়বে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, এমডি-এমএস করে কেউ জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে তার পাশে ডিপ্লোমা করা একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি হয় তো সিনিয়রিটির কারণে সিনিয়র কনসালটেন্ট পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু কোয়ালিটির কারণে সিনিয়র কনসালটেন্ট পদবিটা পেলে উচ্চতর ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়বে। যোগ্যতাসম্পন্ন কারও যদি উপযুক্ত পদবি না থাকে তাহলে তার কোনো মূল্যই থাকে না। পদে না থাকার কারণে সে তার যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারেন না। তিনি অনেকটা মূল্যহীন হয়ে যান।

এক যুগ পর অর্জন ‘জুনিয়র কনসালটেন্ট’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদ্য জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া একজন চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘২০০১ সালে এমবিবিএস পাস করি। এ পেশায় যুক্ত প্রায় ২০ বছর ধরে। ২৭তম বিসিএসে সরকারি চাকরি শুরু। সে হিসাবে প্রায় একযুগ হয়ে গেলো। এ দীর্ঘ সময়ে পদোন্নতি পেয়ে হলাম জুনিয়র কনসালটেন্ট। আমার বয়স এখন ৪৪ বছর। আমি এফসিপিএস করেছি, ডিসিএইচ করেছি ২০১৮ সালে।’ 

পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রোগী দেখতে গিয়ে যদি বিলম্ব করি তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন? আমাদের পদোন্নতিটা যথাসময়ে করা যাদের দায়িত্ব…। প্রতি ছয় মাস পর পর একেকটা কোর্স থেকে চিকিৎসকরা পাস করছেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছয় মাস পর পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলে কারও মধ্যে হতাশা তৈরি হতো না। দুটি ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে আমাকে ৮/৯ বছর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আর ডিগ্রি অর্জনের পর পদোন্নতির জন্য আমাকে আড়াই বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। পদোন্নতি পেলাম জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে।’

ক্যাডার বৈষম্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পুলিশে দেখেছি, এএসপির পরে সিনিয়র এএসপি হয়। সহকারী সচিবের পরে করা হয় সিনিয়র সহকারী সচিব। আমাদের নার্সরা চাকরিতে যোগদান করেন সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে। আমরা এতো ডিগ্রি করার পর অর্জন করি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ। নন-মেডিকেল আত্মীয়-স্বজন এ কথা শুনে বলাবলি করেন, ওর মনে হয় চাকরিতে অবনতি হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ডা. মোহাম্মদ সানোয়ার খান বলেন, ‘অন্য ক্যাডারে সিনিয়র সহকারী সচিব, সিনিয়র এএসপি, সিনিয়র সহকারী জজ, সিনিয়র প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা...আর আমাদের হয় জুনিয়র কনসালটেন্ট, এইটা পরিবর্তন করা যায় না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালকের বক্তব্য 

এ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে যাওয়া স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ডা. তাহাজ্জল হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমার দাবি ছিল জুনিয়র কনসালটেন্ট শব্দটা লেখা যাবে না। এর বদলে শুধু কনসালটেন্ট হবে। এর পরের পদোন্নতিতে হবে সিনিয়র কনসালটেন্ট। এর পর চিফ কনসালটেন্ট। অথবা কেউ শিক্ষকতায় গেলে হবেন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। পরে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। এ ধরনের একটি প্রস্তাবনা আমার ছিল।’

পরবর্তীতে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘প্রথমে এটি স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরে পাঠাই। তারা বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার কথা। এ নিয়ে কারও কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। এটা এভাবে পড়ে আছে।’ 

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) সুনীল কুমার সরকারের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে আড়াইশ’ বা একশ’ শয্যার হাসপাতালের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। ওইসব হাসপাতালের কতগুলো ইউনিট হবে, প্রতি কতজন চিকিৎসক থাকবেন, তাদের পদবি কি হবে—এ সংক্রান্ত বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। সেখানে উচ্চতর ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের পদবি কনসালটেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে পদবিগুলো কেন এখনও পরিবর্তন হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিলেই হয়ে যেতে পারে। নতুন হাসপাতালের বিন্যাসের আলোকে চিকিৎসকদের পদ-পদবিগুলোও যুক্ত হওয়া উচিত। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেই হবে।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসকের পদোন্নতি
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি