২৫ অক্টোবর, ২০১৬ ১২:৪৬ পিএম

শুরুতে সনাক্ত হলে ক্যান্সার প্রতিকার সম্ভব

শুরুতে সনাক্ত হলে ক্যান্সার প্রতিকার সম্ভব

ইলিয়াস হোসেন:

শুরুতে সনাক্ত করা গেলে সুচিকিৎসার মাধ্যমে মরণঘাতি ক্যান্সারকে বশ মানানো যায়। সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্তন ক্যানসারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং উত্তরণে করণীয়’ শিরোনামের আলোচনায় বক্তারা এ আশার কথা শোনান। ক্যান্সার প্রতিরোধ ও গবেষণাকেন্দ্র এবং ১৯টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত মোর্চা ‘বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরাম’ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সার্বিক সহায়তা দেয় রোশ বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। 

বক্তারা আরো বলেন, দেশে স্তন ক্যানসারের রোগীদের প্রতি সমাজ ও পরিবার এখন পর্যন্ত উদাসীন। সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব ও লজ্জায় নারীরা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি গোপন করেন। তারপর যখন প্রকাশ করেন, তত দিনে রোগটি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন চিকিৎসার খরচ ও সঙ্কট উভয়ই বেড়ে যায়।

সভায় মূল বক্তব্য তুলে ধরেন, বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী ও জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার । তিনি বলেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ক্যানসার গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের প্রতিবেদন বলছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮২২ জন, মারা যান ৭ হাজার ১৩৫ জন।

বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৪ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (২৭ দশমিক ৪ শতাংশ) স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। নারী-পুরুষনির্বিশেষে এই ক্যানসারের স্থান দ্বিতীয় (১২ দশমিক ৫ শতাংশ)। স্তন ক্যানসারের রোগীদের গড় বয়স প্রায় ৪৩ বছর। 

২৩ বছর ধরে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে চলা কবি কাজী রোজী এমপি সাহসের সঙ্গে বলেন, আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী হিসেবে মরতে চাই না। আমার মৃত্যু অন্যকোন ভাবে হোক; সেটাই চাই। এটা এমন একটা রোগ যাকে চিরতরে দূর করা যায় না। তবে তাঁর মতে, সাহস, মনোবল ও শক্তি থাকলে ক্যান্সারকে দমিয়ে রাখা সম্ভব।  

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় কান্সার গবেষণা ও  হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, আমাদের দেশের চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে এখনো অনেক কম। তারপরও রোগীরা সরকারী হাসপাতাল থেকে আরো উন্নত সেবা চান। ্এটা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে আরো এগিয়ে আসতে হবে। তিনি জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বেশ কয়েকটি মেডিকেলে ক্যান্সার থেরাপির যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সেগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না। ঐসব প্রতিষ্ঠানে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হলে, ঢাকায় রোগীর চাপ কমতো বলে মনে করেন তিনি।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন বলেন, আমাদের রেফারেল সিস্টেম খুবই খারাপ। রোগীরা জানেনা কোথায় তাদের যাওয়া উচিত। দেশের অনেক জায়গায় বড় বড় রোগের সুচিকিৎসা হচ্ছে এটা সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা করা দরকার। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াকে অগ্রনী ভূমিকা পালনের দাবি জানান তিনি। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্যান্সার রোগীরা একইসাথে মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫/৭শতাংশ সাধারণ মানুষ উৎকন্ঠায় ভোগেন। পক্ষান্তরে ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে এর হার ১৬/১৯ শতাংশ। বিষন্নতায় ভোগেন ৫/৮ শতাংশ সাধারণ মানুষ। কিন্তু মানসিক রোগীর মধ্যে এর হার ১৬-৩০ শতাংশ। তিনি আরো জানান, প্রথমত: কেউই বিশ্বাস করে না যে তার ক্যান্সার হয়েছে; শারীরিক অবস্থা চরম নাজুক হলে একসময়ে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। স্বামী-স্ত্রী-স্বজনদের সার্বিক সহায়তায় সুচিকিৎসা হলে ক্যান্সারও জয় করা সম্ভব। সবার ভালোবাসায় রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে বলে দাবি করেন ডা. হেলাল। 

আলোচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা. ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে স্তন ক্যানসার অন্যতম। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বিষয়টিও সরকারের ভাবনায় আছে। তবে খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, লাইফ স্টাইলসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকে নজর না দিলে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগে মানুষের মৃত্যুর হার এক তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যে সরকার শিগগিরই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, স্তন ক্যানসারসহ ক্যানসারের রোগীদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা সম্ভব হলে চিকিৎসা খরচ কমানো সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের ডা. মাহ্জাবিন রহমান শাওলী বলেন, কারো ক্যান্সার হলেই বাকীরা মনে করেন, ও-তো শেষ। এবার মরবে। সবাইকে এ মনোভাব বদলানোর আহ্বান জানান তিনি।  

৭১ টিভির পরিচালক বার্তা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মনে করেন, মিডিয়াগুলো পলিটিকস ও ক্রাইম নিয়ে বেশি ব্যস্ত। রোগের তথ্য ভিত্তিক অ্যাপস তৈরি করা হলে, তরুণ প্রজন্ম সেখান থেকে সহজেই নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পারতো। রোগের লক্ষণ বুঝে চিকিৎসকের কাছে যেতো বলে মত দেন এই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। 

এনটিভি’র জহিরুল আলম বলেন, আমাদের পরিচিত অনেক শিল্পী, খেলোয়ারসহ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব ক্যান্সারকে জয় করেছেন। এসব খবর মিডিয়াতে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা গেলে বড় রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি কমতো। 

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক অধ্যাপক  ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার জোর দিয়ে বলেন, স্তন ক্যান্সার সচেতনতায় ধারাবাহিক আলোচনা শুরু হলো- কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছা পর্যন্ত এটা চলবেই। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি