২৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০২:২৫ পিএম

পিরিয়ড বা মাসিক

পিরিয়ড বা মাসিক

এই বিষয়টি খুবই সাধারণ, সৃষ্টিকর্তা কতৃক নির্ধারিত, নারী চরিত্রের প্রকৃতিপ্রদত্ত একটি নিয়ম। অথচ এই বিষয়টি কে ট্যাবু একটি বিষয়ে রুপান্তরিত করে রাখা হয়েছে। এর জন্য অন্যতম কারন "অজ্ঞতা"।
.
এই অজ্ঞতার ধরুন একজন নারীকে যেতে হয় লজ্জাজনক এবং অস্বস্থিকর পরিস্থিতির মধ্যে। আর পুরুষদের কাছে ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়ায় "ট্যাবু"। যার ফলে পিরিয়ড শব্দটি শুনলেই অনেকের যৌন সুড়সুড়ি শুরু হয়ে যায়। একজন নারী সাধারণ সেনেটারি ন্যাপকিন কিনতে গেলেও শিকার হতে হয় অস্বস্থতিকর পরিবেশের কিংবা মন্তব্যের।
.
এমনকি অনেক নারীও জানেনা মাসিক চক্রের কারন, নির্ধারিত সময়, মাসিক চলাকালীন সমস্যা।
.
✔পিরিয়ডঃ-
একজন নারী পিরিয়ডের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ মা হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। যা একজন নারীর শারীরিক নিয়মাধীন প্রক্রিয়ার শুরুই নয় বরং নিশ্চিত করে একজন নারীর সুস্থতাও।
.
নারীর পিরিয়ড তাকে প্রতি মাসে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত করে। এই অবস্থা গড়ে ২৮ দিন পর্যন্ত থাকে।
.
✔পিরিয়ড কাকে বলে ?
.
☞প্রতি চন্দ্রমাস পরপর হরমোনের প্রভাবে পরিণত মেয়েদের জরায়ু চক্রাকারে যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায় এবং রক্ত ও জরায়ু নিঃসৃত অংশ যোনিপথে বের হয়ে আসে তাকেই ঋতুচক্র বলে।
.
✔পিরিয়ড ফেজঃ-
এর তিনটি অংশ, ১মটি চারদিন স্থায়ী হয় (৪-৭ দিন) এবং একে মিনস্ট্রাল ফেজ, ২য়টি ১০দিন (৮-১০ দিন) একে প্রলিফারেটিভ ফেজ এবং ৩য়টি ১৪ দিন (১০-১৪ দিন) স্থায়ী হয় একে সেক্রেটরি ফেজ বলা হয়।
.
✔পিরিয়ড (প্রক্রিয়া)ঃ-
মিনস্ট্রাল ফেজ এই যোনি পথে রক্ত বের হয়। ৪-৭ দিন স্থায়ী এই রক্তপাতে ভেঙ্গে যাওয়া রক্তকনিকা ছাড়াও এর সাথে শ্বেত কনিকা, জরায়ুমুখের মিউকাস, জরায়ুর নিঃসৃত আবরনি, ব্যাকটেরিয়া, প্লাজমিন, প্রস্টাগ্লানডিন এবং অনিষিক্ত ডিম্বানু থেকে থাকে। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের যৌথ ক্রিয়ার এই পর্বটি ঘটে।
.
প্রলিফারেটিভ ফেজ ৮-১০ দিন স্থায়ী হতে পারে। শুধু ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এটি হয়। এই সময় জরায়ু নিষিক্ত ডিম্বানুকে গ্রহন করার জন্য প্রস্ততি নেয়।
.
সেক্রেটরি ফেজ টা সবচেয়ে দীর্ঘ, প্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন। একে প্রজেস্টেরন বা লুটিয়াল ফেজ ও বলা হয়। এটিও ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন উভয় হরমোনের যৌথ কারনে হয়। এই সময় নিষিক্ত ডিম্বানুর বৃদ্ধির জন্য জরায়ু সর্বোচ্চ প্রস্ততি নিয়ে থাকে।
.
ডিম্বাশয়ের কোনো ডিম্বানু শুক্রানু দ্বারা নিষিক্ত না হলে জরায়ু আবার মিনস্ট্রাল ফেজে চলে যায়। এভাবেই পূর্ন বয়স্ক মেয়েদের ঋতুচক্র চলতে থাকে।
.
আরেকটি কমন প্রশ্ন আছে যা অনেক নারীরাই সুষ্ঠুভাবে অবগত থাকেন না। যার ফলে অনেকের ভুল ধারনা থেকেই যায়!
.
✔ পিরিয়ডের সময় কি পরিমান রক্তপাত হয়?
.
☞প্রতি পিরিয়ডে গড়ে এক কাপেরও কম রক্ত নিঃসৃতহয়। মেয়েদের হয়ত মনে হয় শরীর থেকে রক্তের বিরাট প্রবাহ বের হয়ে যাচ্ছে, বক্স বক্স প্যাড হয়ত ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিঃসৃত রক্তের পরিমাণ কম।
.
সাধারণত প্রথম দুই দিন বেশি রক্ত নিঃসৃত হয়। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের মতে-প্রতি মাসে কয়েক চামচ থেকে বড়জোর এক কাপ পরিমাণ রক্ত বের হয় শরীর থেকে।
.
যদি ব্যবহার শুরু করার দুই ঘণ্টার কম সময়ে প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যায় এবং বদলানোর মত হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি স্বাভাবিকের বাইরে এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
.
✔পিরিয়ড কালীন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাঃ-
.
☞পিরিয়ডের সময়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা খুবই জরুরি। অস্বাস্থ্যকর বস্তু ব্যবহারের জন্য মেয়েদের দুটি প্রধান সমস্যা দেখা দিতে পারে- প্রথমত, পাইরজেনিক অর্গানিজমে ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন হয়।
.
এই ইনফেকশনে নিচ হতে উপরের দিকে ইউট্রেস টিউব আক্রান্ত করে। এতে টিউব ব্লক হয়ে যেতে পারে। তখন রোগী কনসিভ করতে পারে না। যদিও কখনো কখনো এই সমস্যা নিয়ে বাচ্চা হয়। তবে ইনফেকশনটা বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে যায়, ফলে বাচ্চা রুগ্ন হয়।
.
☞দ্বিতীয়ত, পিরিয়ডের হাইজেনিক ইনফেকশনের জন্য মেয়েদের সব সময় তলপেটে ব্যথা থাকে। একটা অসুস্থভাব সব সময় তাকে ঘিরে থাকে। তাই নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য পিরিয়ডের সময় নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
.
✔সেনিটারী ন্যাপকিন ব্যবহারের নিয়মঃ-
.
☞প্রথমত যেকোন স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড কোনভাবেই তিন বা চার ঘণ্টার বেশি পরা উচিৎ নয়। ঋতুস্রাবের শুরুর দুই ও তিন দিন অতিরিক্ত রক্তস্রাব নিঃসরণ হয়। এসময় অনেকে ছয় বা সাত ঘণ্টা পর পর প্যাড পরিবর্তন করে। কিন্তু চতুর্থ বা পঞ্চম দিন থেকে স্রাব কমে আসায় একই ন্যাপকিন ২৪ ঘণ্টা বা আরও বেশি সময় ধরে অনেকে পরে থাকে
.
ঋতুস্রাবের প্রথম তিন দিন দুই ঘন্টা পরপর প্যাড পরীক্ষা করে দেখা উচিৎ। যদি প্যাড শুকনো না থাকে অর্থাৎ উপরের অংশে রক্ত ভেসে আসতে দেখা যায় তবে সাথে সাথে প্যাড পরিবর্তন করা উচিৎ এবং কোনভাবেই চার ঘণ্টার বেশি একটি প্যাড পরা উচিৎ নয়।
.
ঋতুস্রাবের তৃতীয় দিন হতে যেসব ন্যাপকিনে দ্রুত রক্ত টেনে নেয় এবং উপরের অংশ শুকনো রাখে অর্থাৎ “ড্রাই উইভ” ন্যাপকিন সেগুলো পরা একদম বাদ দিতে হবে।
.
ঋতুস্রাবের শেষের দিকে অল্প রক্তপাত হয় এবং একারনে সেই রক্ত দ্রুত শুকিয়ে সেখানে জীবানুর আক্রমণ হয় যা যোনিপথের সংস্পর্শে এসে চুলকানি, ফোঁড়া, ইনফেকশন ইত্যাদি সৃষ্টি করে।
.
ইদানীং কালে বের হয়ে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য- ড্রাই উইভ প্যাড বা ন্যপকিনে প্যাড শুকনো রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়”সেলুলোজ জেল” নামের একটি উপাদান যা জরায়ুমুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
.
✔✔ ছেলেদের উদ্দেশ্যে লিখছি-
ঠিক একই প্রক্রিয়ায় আমার আপনার মা, মেয়ে থেকে নারীতে রুপান্তরিত হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের সুস্থতার মাধ্যমে আমার আপনার জন্ম হয়েছিল।
.
আশাকরি আজকের পর থেকে পিরিয়ড নামক ব্যাপারটিকে সহজ ও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখবেন। একজন পুরুষ হিসেবে আপনার সাধারণ স্বপ্নদোষের মতোই নারীদের ও পিরিয়ড একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। এটা আপনার শরীরবৃত্তীয় অধিকার, সুস্থতার একটি অংশ।
.
তারপরেও যদি আপনাকে এই সাধারণ বিষয়টি- কামাগ্রতা, মানসিক আনন্দের কারন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বলব আপনি সুস্থ মানুষ নন।

আপনি মানসিকভাবে অসুস্থ। চটজলদি আপনি মানসিক ডাঃ এর শরণাপন্ন হউন কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত