ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৭:১১ পিএম

ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোম মানসিক রোগ, ভুত-প্রেতের আছর নয়

ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোম মানসিক রোগ, ভুত-প্রেতের আছর নয়

এক.

মিসেস রওশন আরা (ছদ্মনাম) ৬০ বছর বয়স। বেশ কিছু দিন ধরে স্বামীসহ দেশেই বসবাস করছেন। সন্তানরা সবাই দেশের বাহিরে সেটেল্ড। সবাই সু-প্রতিষ্ঠিত যার যার অবস্থানে। তিনিও এতোদিন তাদের সাথে ছিলেন। এখন শেষ বয়সে দেশের বাড়িতে চলে এসেছেন। তার ইচ্ছা শেষ নিঃশ্বাসটুকু যেনো দেশের মাটিতেই নেন। 

ছেলে-মেয়েরা বুঝিয়ে তাদের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি চলে এসছেন স্বামীসহ। 

তারা দুজনেই তাদের পুরাতন বাংলা বাড়িতেই থাকছেন। সেখানে তাদের পুরোনো আত্মীয় ভাই-বেরাদার তাদের দেখাশুনা করেন। টাকা-পয়সা যখন যা প্রয়োজন তা ছেলে-মেয়েরা পাঠাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করছেন না। 

সম্প্রতি রওশন আরা অদ্ভুত কিছু আচরণ করছেন, কথাবার্তা বলছেন। মাঝে মধ্যে তিনি তার স্বামীকে বলেন, ‘কখনো কখনো আমার মনে হয়, আপনি আসল মানুষ নন। অন্য কেউ আপনার রূপ ধারণ করে এসেছে। অবিকল আপনার মতো।’

দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবন তাদের। এমন কথাবার্তায় মি. রহমান সাহেব প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা না দিলেও ইদানীং বেশ বিব্রত হচ্ছেন। 

কারণ রওশন আরা তাকে আগন্তুক ভেবে এড়িয়ে চলেন হঠাৎ হঠাৎ। 

রওশন আরা কখনো বাংলা বাড়ির এদিক ওদিক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলেন, ‘জানেন, এটা নকল একটা বাংলা বাড়ি’, যা আমাদের আসল বাংলা বাড়িটার মতো করে বানানো।’ 

এমন অসংলগ্ন কথাবার্তায় গ্রামের আশপাশের মানুষের পরামর্শে মি রহমান সাহেব ‘ভুত-প্রেতের’ আছর ভেবে নানান কবিরাজ, ভন্ডদের কাছে দ্বারস্থ হয়েছেন। কিছু এলোপ্যাথিক চিকিৎসাও করিয়েছেন। তারা ঘুমের ঔষধ দিয়েছেন। কিন্তু দিন দিন তার এসব অসংলগ্ন আচরণ যেনো বাড়ছেই।

দুই.

তিনি যখন বিদেশে থাকতেন তখন তার ছেলেমেয়েরা তাকে প্রায়ই সাইকিয়াট্রিস্ট’র কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতেন। কারণ তার ভুলে যাওয়ার সমস্যা ছিলো, প্রায়ই নাস্তা বা দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ পর বলতেন, ‘আমি খাইনি, অথবা জিজ্ঞেস করতেন, ‘আমি কি খেয়েছি?’ 

মাঝেমধ্যে তিনি কিছু অদ্ভুত কথা বলতেন। বলতেন, ছেলেমেয়েরা তাকে বিদেশে এনে সম্পত্তির জন্যে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে। সাইকিয়াট্রিস্ট বলেছেন এটা ব্রেইনের রোগ ‘ডিমেনশিয়া’ রোগের লক্ষণ।

মিসেস রওশন আরার বর্তমান যে আচরণগত সমস্যা দেখা দিয়েছে সেটা আসলে 'ভুত-প্রেতের' আছর বলে আদৌ কোনো সমস্যা নয়। ভুত প্রেত, ভীমরতি ইত্যাদি বলে কিছু নেই। এসব মানসিক রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতার জন্যেই এমন ধারণা। মানসিক রোগ নিয়ে মুর্খ অশিক্ষিত মানুষ যেমন অজ্ঞতায় থাকেন তেমন সাইকিয়াট্রি বা মানসিক রোগ নিয়ে অজ্ঞতা অনেক শিক্ষিত জনের মধ্যেও পাওয়া যায়।

তিন.

মিসেস রওশন আরার আসলে কি হয়েছে?

পরিচিত মানুষজনকে অপরিচিত, আগন্তুক ভাবা এর নাম 'ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোম'। এটা অনেক সময় ডিমেনশিয়া রোগে পাওয়া যায়।

ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোমের রোগীরা প্রায়শই পরিচিত কাউকে অপরিচিত মনে করেন। তারা মনে করেন বাহিরের ছদ্মবেশী কেউ আপনজনের (ছেলে-মেয়ে-ভাই-বোন) প্রতিরূপ ধারণ করে এসেছে। মাঝেমধ্যে তারা বলেই ফেলেন, ‘তুমি আমার ছেলে বা মেয়ে নও। ঠিক আমার ছেলে বা মেয়ের রূপ ধারণ করে এসেছো।’

ব্যাপারটা বেশ পীড়াদায়ক বটে আপনজনদের জন্যে।

ডিমেনশিয়া ছাড়াও ব্রেইনের বা মস্তিষ্কের আঘাত, মৃগী রোগ বা ঘোরতর মানসিক রোগ স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের মাঝেও ক্যাপগ্রাস সিম্টম পাওয়া যায়।

চিকিৎসা:

সাইকিয়াট্রিস্টদের মতে রোগীর সাথে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে ব্যবহার করতে হয়। তার সাথে এ নিয়ে তর্ক করাও যাবে না। তাকে পূর্বের মতোই আদর যত্ন করে রাখতে হবে। তার খাবার-দাবার ও শারীরিক যত্ন নিতে হবে। যাদু টোনা বান ইত্যাদি ভেবে অপচিকিৎসার দ্বারস্থ হওয়া যাবে না, তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

ডা. সাঈদ এনাম 
সহকারী অধ্যাপক সাইকিয়াট্রি 
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ 
মেম্বার, রয়েল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্ট ইংল্যান্ড 
মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : মানসিক রোগ
অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা
একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা