০৪ মে, ২০২০ ০৬:০৪ পিএম

‘করোনা সংকটে দেশ, আমি তো বসে থাকতে পারি না’

‘করোনা সংকটে দেশ, আমি তো বসে থাকতে পারি না’

বিল্লাল হোসেন রাজু: মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দেশের এমন স্বাস্থ্য সংকটেও আমি সেবা দিতে যেতে পারছিলাম না। অনেক দিন ধরে পোস্টিং না থাকায় খুব চিন্তিত ছিলাম। তখন ভেবেছিলাম চিকিৎসক হয়েও দেশের এমন সংকটে ভূমিকা রাখতে পারবো না? এর কয়েকদিন পরেই আমার পোস্টিং হয় ফরিদপুরে। কিন্তু তখন সেখানেও যাওয়া যাচ্ছিলো না। যতকিছুই হোক আমি তো আর ঘরে বসে থাকতে পারি না। তাই এক সিনিয়রের সহযোগিতায় কুর্মিটোলা জেলারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে যোগদান করি। 

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল দেশের প্রথম ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল। এ হাসপাতালের এনেস্থেসিয়া পেইন এন্ড ইন্টেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক আহাদ হোসেন। করোনা রোগীদের খুব কাছ থেকে সেবা দেওয়ার নানান অভিজ্ঞতা নিয়ে মেডিভয়েসের সাথে কথা বলেছেন তিনি। 

তিনি বলেন, একটা হাসপাতালে কয়েক শতাধিক করোনা আক্রান্ত রোগী। যাদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো তাদের ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। প্রায় সবার চেহারায় একাকিত্বের ছাপ। তারা খুঁজে ফিরে স্বজনদের। কিন্তু করোনা এমন এক মরণঘাতী সংক্রমণ ভাইরাস, যে ভাইরাস আপনজন, প্রিয়জনদের থেকে সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখে। বিশেষ করে এতে বয়স্করা বেশি ভেঙ্গে পড়ছে। আবার অনেকে মৃত্যুর খবর শুনলে আরও ঘাবড়ে যায়। প্রিয়জনদের কাছে না পাওয়ায় অনেকের মধ্যে তীব্র হতাশা। 

এরই মধ্যে করোনার থাবায় পাল্টে গেছে গোটা পৃথিবী। প্রতিনিয়তই পরবর্তন হচ্ছে আমাদের মানসিকতা। মনে হয় পৃথিবীর এ পরিবর্তন অনেকটা স্থায়ী। করোনার আগে আমরা পৃথিবীর যে পরিস্থিতি দেখেছি, তা হয়তো আর ফিরে আসবে না। পৃথিবী সাজবে নতুন রূপে। পরিবর্তন হবে আমাদের মানসিকতা। এক দেশ আরেক দেশের প্রতি যে যুদ্ধ- বিগ্রহের মনোভাব ছিল, আমার মনে হয় তা থেকে অনেক দেশ সরে আসবে। করোনা পরবর্তী পৃথিবী হবে এক নতুন পৃথিবী।  

মরণঘাতী করোনায় আক্রান্ত রোগীদের উদ্দেশ্যে ডা. আহাদ হোসেন বলেন, প্রথম রোগীদের ধৈর্য্য ধরতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে এটা বৈশ্বিক সমস্যা। বেশির ভাগ দেশই সংকটের মধ্যে আছে। অনেক সময় দেখা যায় সেবা দিতে কিছুটা সময় সময় লাগে, কেননা আমাদেরও নানান সংকট আছে। আমরা শতভাগ চেষ্টা করেও যথাযথ সেবা দিতে পারছি না। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেরই একই অবস্থা। তবে এ সংকট মোকাবেলায় রোগীদের সহযোগিতা বেশ জরুরি। নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি এ সংকট মোকাবেলায় চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে। সবার সহযোগিতায় আমরা খুব দ্রুতই এ সংকট থেকে মুক্তি পাবো।   

পরিবারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা করোনা ইউনিটে সেবা দিচ্ছি, এটা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত না। কেননা এটাই আমার পেশা। যতটুকু সম্ভব সচেতন থাকার চেষ্টা করছি। তবে পরিবারকে নিয়ে সব চেয়ে বেশি চিন্তা হয়। করোনা ইউনিটে ডিউটি করার ফলে পরিবারের সদস্যদের সাথে আগের মতো দেখাও করা সম্ভব হয় না। আমরা হয়তো হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু তারা এজন্য আমাদের যে সহযোগিতা করেছে, তা কোন অংশে কম নয়। তাই তাদেরকে বলতে চাই, ‘আমরা দূরে আছি, শুধু ভালো থাকা এবং ভালো রাখার উদ্দেশ্যে’। তবে তারা যে ত্যাগ করছেন, তাদের এ অবদান কোন অংশেই কম নয়। তারাও যুদ্ধ করছে। 

ডা. আহাদ আরো বলেন, সেবার ব্রত নিয়ে এ পেশায় আসা। রোগীদের সুস্থ করে তুলতে পারলেই হৃদয়ে পুলকিত অনুভব করি। করোনায় আক্রান্ত এসব রোগীদের পাশে আমাদেরই থাকতে হবে। সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হবো জেনেই সেবা দিতে আসছি। সেবা দিতেই আনন্দবোধ করি। 

চলমান এ সংকটেও যারা দুর্নীতি করছে, তাদের জন্য ধিক্কার। তবে এতো প্রতিবন্ধকতার পরেও সরকার নানান উদ্যোগ নিয়েছে। করোনা সচেতনতায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

উল্লেখ্য, ডা. আহাদ হোসেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সমাপ্ত করেছে। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে এনেস্থিসিয়া পেইন এন্ড ইন্টেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিষয়ে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২৭ তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন।

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি