০৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০৪:১৬ পিএম

প্রথম ইন্টার্ন প্লেসমেন্ট ছিল মেডিসিন ওয়ার্ডে

প্রথম ইন্টার্ন প্লেসমেন্ট ছিল মেডিসিন ওয়ার্ডে

ডা. যুবায়ের আহমেদ: 

সিপিআর (Cardio Pulmonary Resuscitation) কি জিনিস সেটার সাথে পরিচয় হয় সেখানেই, প্রথমে দেখেছি, এরপর নিজে দিয়েছি বহুবার। মুখে ভেন্টিলেশন ব্যাগ (Ambu bag) দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়ার সাথে সাথে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে রোগীর বুকে দুই হাতে ভর দিয়ে দুই সেকেন্ড অন্তর অন্তর চাপ দিতে থাকা যেন বুকের পাঁজর কমপক্ষে দুই ইঞ্চি দেবে যায়।

শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, স্টপ হয়ে যাওয়া হার্টকে আবার চালু করার এটাই ওয়ে। ডাক্তাররা এই একটা কাজ করতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যায়, যথেষ্ট পরিশ্রম সাধ্য কাজ।

কিন্তু সিপিআর দিয়ে কার্ডিয়াক এরেস্টের বা হার্ট ফেইলিউরের কোন পেশেন্টকে বাঁচতে দেখিনি বা বাঁচাতেও পারিনি।

মোটকথা সিপিআর দিয়ে মরনাপন্ন কোন রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা যায় সেটা শুধু শুনেই গেছি স্যারদের মুখে, চাক্ষুস দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

এরপর প্লেসমেন্ট হয় পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে (শিশু বিভাগ), পুরোপুরি জাদুর ওয়ার্ড।

খোদা তায়ালার বিশেষ রহমত যে বাচ্চাদের ওপর থাকে সেটা চাক্ষুস দেখলাম, একবার না, বহুবার।

সেই সিপিআর এখানেও দিতে হয়েছে, তবে বাচ্চারা যেহেতু এইটুকুন, ওদের চেস্ট কম্প্রেশন দিতে হয় ঠিক আমরা স্মার্টফোন যেভাবে দুই হাতে ধরে দুই বুড়ো আঙুলে টাইপ করি সেভাবে, বুড়ো আঙুলে কম্প্রেশন।

অবাক হয়ে দেখেছি, যে বাচ্চার হার্ট সাউন্ড নাই, নিশ্বাস নিচ্ছে না, ঠান্ডা হয়ে নীল হয়ে গেছে, সেই বাচ্চাকে পনের মিনিট সিপিআর দিতেই বাচ্চা আবার নীলাভ থেকে পুরো টুকটুকে গোলাপি হয়ে যায়, এরপর গগণবিদারি ওঁয়া ওঁয়া শুরু করে। জাস্ট লাইক ম্যাজিক।

এটা যেমন এক দিকে ভাল আরেকদিকে সমস্যাও, সমস্যাটা ডাক্তারের। একবার মাত্র নয়শ গ্রাম ওজনের এক বাচ্চাকে যে কতবার করে সিপিআর দিয়ে দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। তার দরকার ছিল নিওন্যাটাল আইসিইউ, যেটা এমএমসিতে আগে ছিল না, এখন হয়েছে।

জানতাম বাচ্চাটা বাঁচবে না, কিন্তু ডেথ সার্টিফিকেটও দিয়ে দিতে পারছি না, কারণ সিপিআর দিলেই বাচ্চা পিংক হয়ে যায়, কান্নাকাটি করে, আধা ঘন্টা পর আবার নীল হয়ে যায়। কতবার সিপিআর দেব? আর একটা বাচ্চা হলেও হত, পুরো ওয়ার্ড জুড়ে খালি দৌড়াই আর সিপিআর দেই।

এই কথা বললাম এই কারণে - একটা নিউজ বেশ ছড়িয়েছে, বেসরকারি একটা হাসপাতালে ভর্তি শিশুকে মৃত ঘোষণা করে কর্তব্যরত চিকিৎসক। মা কিছুক্ষণ পর বাচ্চাকে নড়ে উঠতে দেখে আবার নিয়ে আসেন, চিকিৎসক বাচ্চাটাকে আবার অ্যাসেস না করেই মায়ের হাতে বাচ্চার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে ধরিয়ে দেয়।

অথচ মুমূর্ষু অবস্থায় বাচ্চাটা আরেক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।

আমি জানি না সেই চিকিৎসক কোথায় ইন্টার্নি করেছে, অথবা বড়দের মত বাচ্চাদের ডেথ যে চট করে ডিক্লিয়ার করা যায় না সেটা সে জানে কিনা, নাকি ঝামেলা এড়াতে বাচ্চাটাকে এমনিতেই মরতে দিয়েছে।

কদিন আগেই লেজারাস সিন্ড্রোম নিয়ে লিখেছি, কিন্তু বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা লেজারাস সিন্ড্রোম বলে উড়িয়ে দেওয়া অন্যায়। যেখানে মা বাচ্চার বেঁচে থাকার কথা দাবি করেছে, সেই চিকিৎসকের উচিৎ ছিল পুনরায় বাচ্চাকে অ্যাসেস করা, সিপিআর দেওয়া। সেটা না করে ডেথ সার্টিফিকেট ধরিয়ে দয়েছে।

এজন্য নব্য ডাক্তারদের প্রতি অনুরোধ, think thrice before you declare death of an infant.

এটা যেমন একদিকে মেডিকেল নেগ্লিজেন্স, অপরদিকে ক্রাইম। বিএমডসির উচিৎ তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।

আমি নিজে একজন চিকিৎসক হয়ে যদি এর প্রতিবাদ না করি তাহলে এই অপরাধের দায় আমার কাঁধেও আসে।

আম জনতা যে ডাক্তারদের ব্যাপারে এত বিষোদগার করে এর দায় কি ডাক্তারদের ওপর বর্তায় না? এর দায় কি বিএমডিসি বা বিএমএ এড়াতে পারে?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না