ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


২৭ এপ্রিল, ২০২০ ০৫:৪২ পিএম

গণস্বাস্থ্যের র‍্যাপিড টেস্ট এবং আমাদের অপরাজনীতি

গণস্বাস্থ্যের র‍্যাপিড টেস্ট এবং আমাদের অপরাজনীতি

প্রথমেই র‍্যাপিড টেস্ট সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মন্তব্যটি পড়ব। তার আগে একটু সাধারণ জ্ঞান ঝালিয়ে নেই। র‍্যাপিড টেস্ট হলো এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি নির্ণয় করে যে পরীক্ষা সেটা। এন্টিজেন হলো ভাইরাস এর অংশ। এন্টিবডি হলো ভাইরাস অনুপ্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের শরীর যেটা তৈরি করে সেটা৷ বুঝাই যাচ্ছে এন্টিবডি তৈরি হতে একটু সময় লাগবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এটা তৈরি হতে সময় লাগবে এক সপ্তাহের কিছু বেশি। মানে এন্টিবডি পরীক্ষা করতে হলে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে অসুখের দ্বিতীয় সপ্তাহ অব্দি। এন্টিজেন পরীক্ষা আপনি শুরুতেই করতে পারেন।

পিসিআর হলো বিশেষ পদ্ধতিতে ভাইরাসের ডিএনএ বা আরএনএ কে বড় করে তারপর দেখা। কোভিড-১৯ এর জন্য এখন পর্যন্ত এটাই স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা।

এবার দেখুন র‍্যাপিড টেস্ট নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে-

With the limited data now available, WHO does not currently recommend the use of antigen-detecting rapid diagnostic tests for patient care, although research into their performance and potential diagnostic utility is highly encouraged.

Based on current data, WHO does not recommend the use of antibody-detecting rapid diagnostic tests for patient care but encourages the continuation of work to establish their usefulness in disease surveillance and epidemiologic research.

খুব সংক্ষেপে বললে, হু কোভিড-১৯ এ র‍্যাপিড টেস্ট পেশেন্ট কেয়ারের ক্ষেত্রে রিকমেন্ড করেনা। তবে একে কার্যকর প্রমান করতে বা নতুন উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা ট্রায়াল ইত্যাদি চালানো যেতে পারে।

এই যে হু বলছে তারা রিকমেন্ড করে না, এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি সংগত কারণ আছে। তারা অহেতুক কোন কথা বলবেনা এটাই স্বাভাবিক। সেসব আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

এখানে মনগড়া কথা বা যুক্তি দেবার দরকার নেই। ‘এভাবে করলে এই হবে’ এসব ফেসবুকীয় বাগাড়ম্বর আসলে একধরণের ছেলেমানুষি কারবার৷ অনেক পোস্ট গ্রাজুয়েশনের ছাত্রও দেখি এসব লিখে ভাইরাল হয়ে গেছে, যে হয়ত জীবনে একটা থিসিসও লিখেনাই।

‘মহামারীতে এত প্রটোকল মেইনটেনের টাইম নাই’ বলাটা ভয়ানক অপরিপক্কতা। মেথোডলজি হলো রিসার্চের মৌলিক শর্ত।

তাহলে কী জাফরুল্লাহ সাহেব উদ্ভাবন করে অন্যায় করেছেন? উত্তর- অবশ্যই না। তবে কিছু এমেচার কাজ কারবার তো করেছেনই।

বছর দেড়েক আগে ৫০০ টাকায় ক্যান্সার পরীক্ষার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন বলে শাবিপ্রবির প্রফেসর ড. ইয়াসমিন একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে কোন কিছু উদ্ভাবন করলে যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে তার কার্যকারিতা প্রমান করে সংশ্লিষ্ট অথরিটির এপ্রুভাল নিয়ে তারপর সেটা জানাতে হয়। এর আগে চাইলে সম্ভাব্য প্রস্তাবনা নিয়ে কিছু স্টাডি করে সায়েন্টিফিক আর্টিকেলও লিখে জানানো যায়। কিন্তু এসবের ধার না ধেরে কোন টেকনিক্যাল বোর্ডের উপস্থিতি ছাড়াই এরকম একটি সেন্সিটিভ উদ্ভাবন সম্পর্কে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলা কত বড় অবৈজ্ঞানিক আচরণ তা ভাবলেও কষ্ট লাগে। সব কিছু নিয়ে চমক দিতে নেই। অথচ আমি এই পরিবারের একজন গুনমূগ্ধ ভক্ত৷ মিনিমাম বিজ্ঞান মনস্কতা আমি আশা করেছিলাম।

যাইহোক জাফরুল্লাহ সাহেব এরকমই একটি কাজ করছেন শুরু থেকে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ম্যাচিউরিটির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মূল উদ্ভাবক ড. বিজন শীলকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছেন এবং প্র‍য়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন যা ড. শীল নিজেও স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে উড়িয়ে দেননি।

সর্বশেষ ডা. জাফরুল্লাহ যে কাজটি করেছেন- সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে (!) কিট তুলে দেবার জন্য সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এখন সরকারের লোকজন আসেনি বলে তিনি অভিমানও করেছেন। সেই সাথে অপ্রাসঙ্গিকভাবে কিছু বাজার মাত করা কথাবার্তা বলেছেন ‘আমি কাউকে ঘুষ দেবনা। বিদেশ থেকে আমদানি করলে সরকারের লোক টাকা পাবে তাই আমারটা নিচ্ছে না ’ ইত্যাদি। এখনো সার্টিফিকেশনের প্রসিডিউরেই আসলেন না উনি কমার্সিয়াল প্রোডাকশন নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। উনি কোনরকম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়াই বলে বসলেন এটা শতভাগ সফল। (কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছি বাস্তবে কি বলেছেন জানি না)। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি সর্বজন বিদিত। এটা নিয়ে কথা বলার ভিন্ন জায়গা আছে। সবখানে মেঠো বক্তৃতা চলে না।

এখন এই কিট নিয়ে গভমেন্টের এপ্রোচ কি হতে পারতো?

এটা সাদরে গ্রহণ করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য কয়েকটি সেন্টারে চালু করা যায়। এটাই হতে পারে এই মুহুর্তের সঠিক এপ্রোচ।

দুনিয়ার অল্প কিছু দেশে র‍্যাপিড টেস্ট চলছে। এগুলো সবই ট্রায়াল পর্যায়ের। কিছু দেশে র‍্যাপিড টেস্ট শুরু করা হয়েছিলো পরে সেগুলো বাতিলও করা হয়েছে। আমাদের দেশে ট্রায়াল হতে দোষ নেই। তবে অবশ্যই নিয়ম মেনে। নিয়ম ছাড়া উদ্ভাবন স্কুলের সায়েন্স প্রজেক্টের মতই একটা ব্যপার।

সরকার কিন্তু নিয়েছে। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ এটা গ্রহণ করেছে। ডা. জাফরুল্লাহর প্রগলভতায় মনে হলো ড. বিজনও কিঞ্চিত অপ্রস্তুত। জাফরুল্লাহর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন- এগুলো তার কথা নয়। তিনি কোন অসহযোগিতা পাননি। যেটুকু পেয়েছেন সেটা সরকারি কাজে হতেই পারে।

জাফরুল্লাহর অভিমান, নেটিজেনদের ব্যপক লেখালেখি ও বিএএসএমইউয়ের কিট গ্রহণ মাঝের সময়টুকু খুব বেশি নয়। এর ভেতর ঘটে গেছে লংকা কাণ্ড।

একজন বরেন্য অধ্যাপক, দেশের আরেকজন কৃতিগবেষক বলেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আইনের আওতায় আনা হোক। এই অধ্যাপক সক্রিয়ভাবে একজন সরকার সমর্থক চিকিৎসক। এরকম আরো কয়েকজন বলতে চেয়েছেন যে এটা কিচ্ছু হয় নাই। জাফরুল্লাহ যেমন বলতে পারেন না যে এটা কার্যকর, তেমনি তার বিরোধী পক্ষও বলতে পারেন না এটা অকাজের।

আন্দাজ করি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও ছিল ভয়ে। জাফরুল্লাহকে হেল্প না করাটাই হবে সঠিক আওয়ামীলীগীয় আচরণ, ব্যতিক্রম করলে বিএনপি -এরকম একটা মানসিক বোঝাপড়া কাজ করে থাকবে সেটা অনুমান করাই যায়। কারণ এসব জায়গা অতি আওয়ামীলীগ ও নব্য আওয়ামীলীগে ভরা। খোদ প্রধানমন্ত্রী যেটাকে সমর্থন যোগাচ্ছেন সেখানে তারা অসহযোগিতা করে শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী অন্তঃপ্রান হতে চাইছেন। এটা বাংলাদেশেরই একটা চালু সংষ্কৃতি।

জাফরুল্লাহকে যারা সমর্থন দিচ্ছেন তাদেরও একটা বড় অংশ একইরকম এন্টি আওয়ামীলীগ সেন্টিমেন্ট থেকে কাজটা করছেন। ‘জাফরুল্লাহ উষ্টা খাইলেও আওয়ামীলীগের দোষ’ এরকম একটা মাইন্ড সেটিং চালু হয়ে গেছে৷ এই মাইন্ড সেটিংএ স্বয়ং ডা. জাফরুল্লাহর অবদান আছে। তিনি এক হাতে গণস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের পতাকা ধরে থাকেন আরেক হাতে ধরে থাকেন জিয়া পরিবারের ছবি। তাকে নিয়ে যে অপরাজনীতির দ্বন্দ্ব তার দায় তার নিজেরও। উদ্ভাবন ও ক্ষমতাবদলের রাজনীতি দুইজায়গাতেই তিনি হাত লাগিয়েছেন। এই দ্বান্দ্বিকতা তারই সৃষ্টি। জনতার দোষ দিয়ে কি লাভ?

সবশেষে বলি, করোনা কিট কার্যকর হোক বা না হোক ড. বিজন শীল আমাদের সম্পদ। তাঁর সঠিক পরিচর্যা জরুরি।

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত