ডা. জামান অ্যালেক্স

ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


০৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০৯:২২ এএম

আত্মগ্লানির অনল

আত্মগ্লানির অনল

প্লট-১ ( Oncology_এর_কেচ্ছা)

সন্ধ্যার পর ফ্রি ছিলাম। বাসার নিচে কিছুটা হাটাহাটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে CP এর ফ্রাইড চিকেন খাচ্ছি। এমন সময় এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে চোখাচোখি হলো এবং সাথে সাথেই মেজাজ খারাপ হলো। উনি নামকরা এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে বেশ ভালো পোস্টে আছেন, Oncology (ক্যান্সার সর্ম্পকীয়) ডিপার্টমেন্টের প্রোডাক্ট-এর বেচাবিক্রির ভালোমন্দ দেখাশোনা করা তার দায়িত্ব। ব্যক্তিগতকারণে আমি তাকে অপছন্দ করি।

ভাই আমার সামনে এসে মেজাজ তিরিক্ষি করে বললেন, "তোমরা ডাক্তাররা আসলে ‘চামার"।

ব্যক্তিগত অপছন্দনীয় একটি লোক আমার সামনে আমি সহ বাকী চিকিৎসকদের চামার বলছে--ব্যাপারটা হজম করা কষ্টকর, ঘাড়ে চিনচিন ব্যাথা করে উঠলো। বাইরে কিছু প্রকাশ না করে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলাম, "কি হইছে, সেইটা বলেন"...

আমার প্ল্যান-আগে তার কথা শুনে দুর্বল পয়েন্ট ধরে সেই অনুযায়ী সাইজ করবো। আশা নিরাশায় রূপান্তরিত হলো। উনি যা বললেন তার সারমর্ম হলো, Oncology র এক চিকিৎসক দেশের বাইরে প্রমোদ-ভ্রমণে যাবার জন্য তার কোম্পানিকে স্পন্সর করতে বললে, উনি সেটা ম্যানেজ করেন। এখন ঐ চিকিৎসক দেশের বাইরে থাকার সময়ে তার খাবার খরচটাও তাকে ম্যানেজ করতে বলছেন। উনি হ্যাঁ ও করতে পারছেন না, না-ও করতে পারছেন না।

কথায় কথায় আরও বললেন, উনার কর্মক্ষেত্রের শতকরা ৮০জন চিকিৎসক কোন না কোন উপায়ে কোম্পানির কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা Expect করে। Expectation গুলো ও সুবিধা আদায়ের পদ্ধতি শুনে আমার বমি আসার দশা...

ভেবেছিলাম দুর্বল পয়েন্ট ক্যাপচার করে ইনডিরেক্ট বানানি দিব, সম্ভব হলো না। চিকিৎসকদের অনৈতিক চাহিদার উনি নিজে সাক্ষী। আর যাই হোক, অপরাধকে সাপোর্ট দেয়া যায় না। বাসায় ব্যাক করার আগে শুধু বললাম, "দোষ আপনাদেরও আছে, স্পন্সর এর মূলা আপনারা কেন ডাক্তারের সামনে ঝুলান- সেটা আমি জানি...."

প্লট_২(প্রমোদভ্রমণ_ও_অদৃশ্য_শেকলের_বেদনা) :

আমি তখন DMC এর সার্জারী ওয়ার্ডের ইন্টার্ন। সিনিয়ররা রাঙামাটিতে প্রমোদ ভ্রমণের ব্যবস্থা করলেন। পারহেড নামমাত্র খরচ, এত অল্প টাকায় রাঙামাটি ট্যুর!! --মনে খটকা লাগলো, পরে বুঝলাম একাধিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইন্যান্স করছে।

আমার মন তখনও এতো কলুষিত হয়নি, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির এহেন বদানত্যায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, এটি আসলে Give and Take system। পরবর্তী ১ মাস সিএ এর নির্দেশে সমস্ত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো লিখতে হয়েছিলো ঐ সুনির্দিষ্ট কোম্পানিগুলোর।

চিকিৎসার সময় ওষুধ লিখি আমি, আমার আঙুলে অদৃশ্য শিকল পড়ানো থাকে ওষুধ কোম্পানির! এ লজ্জা কোথায় রাখি?

প্লট_৩ (অবৈধ_ফ্রি_ওষুধ_কড়চা)

আমার এক কলিগের পিতার ডায়াবেটিস। একটি নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানি প্রতি মাসে ঐ চিকিৎসককে তার পিতার ওষুধের যোগান দেয়, চিকিৎসক লালায়িত চিত্তে দু'হাতে ফ্রি ওষুধের প্যাকেট হাতে নেয়।

কোন এক মাসে এর ব্যতিক্রম হলো, চিকিৎসক সাহেব রাগে অন্ধ হলেন। উত্তপ্ত বাক্যবাণে ওষুধ কোম্পানিকে তুলোধূনো করলেন। ফলাফল-ওষুধ কোম্পানির MR রা একজোট হয়ে আমাদের বয়কট করলো। ভালোই, নিচে নামতে নামতে তলানিও বোধ হয় আমরা স্পর্শ করে ফেলেছি। এখন MR রাও আমাদের বয়কটের সাহস দেখায়!!!

পুরো সময়টা আমি ছিলাম Silent observer. চিকিৎসক সাহেব তার বুদ্ধি লালায়িত চিত্তকে সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহার না করে লেখাপড়ার কাজে ব্যবহার করলে জানতে পারতেন, তার পিতার চিকিৎসায় যে ড্রাগটি তিনি অবৈধভাবে কোম্পানি থেকে পাচ্ছেন-গাইডলাইন অনুযায়ী সেটি সঠিক নয়। ধিক্ সেই চিকিৎসকের প্রতি-যে তার ধান্ধাবাজির কারণে নিজের পিতার চিকিৎসাটাও সঠিকভাবে করতে পারে না।

প্লট_৪উড়োজাহাজের_লোলুপ_ডিনারটি)

তখন গুলশানে এক প্রাইভেট হাসপাতালে জব করি। ডিউটিতে এসে দেখি সব ডাক্তাররা বেশ ফিটফাট। শুনলাম-Ivabradine ড্রাগ এর উপর সেমিনার আছে। তবে সেমিনার ছাড়িয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো--সেমিনার শেষে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি রাতে ডিনারের ব্যবস্থা করেছে।

ডিনারটা হবে, এক পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের ভিতরে। এক্সাইটিং ব্যাপার-স্যাপার!

Ivabradine এর ব্যাপারে একটু বলি। Oxford Handbook of Clinical Medicine এ বলা আছে, Stable Angina (হার্ট ব্লকের প্রাথমিক স্টেইজ) তে এটি দেয়া যেতে পারে যদি Beta blocker (atenolol) দিতে পারা না যায়। দুটোরই Efficacy সমান।

সেমিনার গেলো, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির দেয়া উড়োজাহাজের ভিতর ডিনারও গেলো। আমাদের চিকিৎসায় পরিবর্তন আসলো, আমরা এবার Stable angina তে বিটা ব্লকার এর পরিবর্তে Ivabradine দেয়া শুরু করলাম।

একটা তথ্য দেই- Ivabradine এর একটি ট্যাবলেট এর দাম ৫০ টাকা, Atenolol (beta blocker) এর-একটি ট্যাবলেট ৭৭ পয়সা.... ইয়ে, Efficacy কিন্তু সেইম টু সেইম!

প্লট_৫(মিশনRadisson)

কাজিন এক প্রখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে মিডিয়াম লেভেলের জব করে। আমার নামে চিঠি ইস্যু করে নিয়ে আসলো। হোটেল Radisson এ সেমিনার।

জিজ্ঞেস করলাম,' আমার কাজটা কি?' বললো, 'নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে ধারণা নিবেন'। বললাম, 'নেটে ক্লিক করলেই তো হয়, সব চলে আসে'। কাজিন হেসে বললো, 'আপনাদের হাত দিয়ে ওষুধগুলো লিখা হবে, তাই আপনাদের মনোরঞ্জন এর ব্যবস্থায় এই আয়োজন। Radisson এ খাওয়া-দাওয়া করবেন, আর আমাদের প্রোডাক্ট লিখবেন....'

তিক্ত_সত্যগুলোঃ

মোটা দাগে কিছু কথা বলি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, এ পৃথিবীতে কেউ আপনাকে ১ পয়সা দিলে সে আপনার কাছ থেকে ১০ পয়সা ফেরত চাইবে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গুলোর Business Strategy ও তাই। মিস্টি হাসি দিয়ে তারা আমাদের যে উপকারটা করে সেটা নিঃস্বার্থ নয়। মনে রাখবেন, আপনার স্বার্থ মেটাতে গিয়ে তার ১০ গুণ তারা উঠিয়ে নেয় এই বাংলার জনগণ থেকে।দুঃখের বিষয়, এটা জানার পরও কিছু চিকিৎসক নিজেকে তাদের শোষণের Succer machine হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নিজের মান-মর্যাদা বিসর্জন দেয়। বাইরে ভদ্রতার মুখোশ পড়ে থাকার ব্যাপারটা তারা আবার ভালোই রপ্ত করে।

ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের পিছনে যে ইনভেস্টগুলো করে তার বিভিন্ন রকমভেদ আছে। সবচেয়ে নির্জলা নিরীহ রূপভেদ হচ্ছে- সেমিনার/সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা ও তার খরচ বহন করা। আমার প্রশ্ন: Who the hell are they to arrange a seminar? টাকাটা তারা কেন ঢালেন? কেউ তো স্বার্থ ছাড়া ১০টা টাকা দেয় না। আমরাই বা কেন চাই?

আমাদের কি এটা বুঝতে কষ্ট হয়--যে ১ লাখ টাকা তারা সেমিনারে ব্যয় করলেন তার দশ গুণ তারা জনগণের কাছ থেকে উঠিয়ে নেবেন? যে নলেজটুকু সেমিনারে পাই সেটা কি বই-খাতায় নেই? নেটে নেই? কোন কোন ডাক্তার তো সরাসরি ঘৃণ্য মাসিক টাকার বন্দোবস্ত ও করেছেন এই কোম্পানিগুলো থেকে। মাঝের টিভি, ফ্রিজ ও এসির গিফট্ এর কথা বাদই দিলাম। বছরের পর বছর এই পদ্ধতিগুলো এদেশে চালু রয়েছে, কোন চিকিৎসক বা কোন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির দৃশ্যমান শাস্তি এদেশে হয়েছে বলে মনে হয় না। দুর্নীতিদমন কমিশন করেটা কি?

ক্লিয়ার_মেসেজঃ

আমার মেসেজ অত্যন্ত ক্লিয়ার। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সাথে চিকিৎসকদের এই দহরমমহরম এর কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। একটা ড্যাটাবেজ থাকবে যেখানে সব কোম্পানির নতুন ড্রাগের লিস্ট থাকবে, আমরা সেখান থেকে যেটা দরকার সেটাকে ব্যবহার করবো। এই কাজটুকু করা কষ্টকর কিছু না।

আমার দ্বিতীয় মেসেজ--কোন চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান কোন উপায়ে কোনভাবে যদি কোন কোম্পানির কাছে অবৈধ কিছু আবদার করে, তবে তাকে পানিশমেন্টের আওতায় আনা হোক। এরা চিকিৎসক নামের কলঙ্ক। কড়া দুপুরে যে রিশাওয়ালা পেটের তাড়নায় প্যাডেল মারে, এসব চিকিৎসকদের তাদের কাছ থকে শিক্ষা নেয়া উচিত। অন্যদিকে, যে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এই অবৈধ আবদারে সাড়া দিবে সে কোম্পানিকেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।

BBC তে একটা নিউজ দেখেছিলাম--২০১৪ সালে China তে GlaxoSmithKline(GSK) - মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিকে তাদের অবৈধ এ ধরনের কার্যকলাপের জন্য ৪৯০ মিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিলো। এরকম একটি শাস্তিই যথেষ্ঠ, বাকীরা এমনিতেই ঠান্ডা হবে।

#পরশ_পাথরঃ

২০১৩ সাল। ডিএমসি তে Internal Medicine এ ট্রেনিং করি কিংবদন্তীতুল্য অধ্যাপকের আন্ডারে। একটানা ডিউটিতে একঘেয়েমি লাগছিলো। বিভিন্ন ওয়ার্ড এক এক করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে যাচ্ছে। স্যারের কাছে আমরাও যাবার অনুমতি চাইলে স্যার শর্তসাপেক্ষ রাজী হলেনঃ

শর্ত-১. সকালে গিয়ে বিকেলে ফেরত আসা যায়, এমন স্হান নির্বাচন করতে হবে। (রোগীদের কথা বিবেচনা করে)

শর্ত-২. খরচ নিজেরা বহন করতে হবে, কোম্পানির কাছ থেকে কোন কিছু নেয়া যাবে না, প্রয়োজনে স্যার একটা বড় অংশ শেয়ার করবেন।

এতদিন জানতান, উনি বিদ্যায় কিংবদন্তী, পরে বুঝেছিলাম উনি জীবন্ত পরশ-পাথর, যার স্পর্শে মানুষ খাটি সোনায় রূপান্তরিত হয়। তার স্পর্শে আমি নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম।

শেষ_কথা :

চিকিৎসা একটি নোবেল প্রোফেশন। তবে আমরা এই নোবিলিটি ধরে রাখতে পারি নাই। চিকিৎসক সমাজের অধঃপতনের জন্য আমাদের একাংশ দায়ী- আত্মগ্লানির অনলে পুড়ে এদের খাঁটি হতেই হবে। এ মহৎ পেশার মহত্ব আমাদের ধরে রাখতেই হবে, এর বিকল্প নেই। পরশপাথর রূপ ঐ গল্পগুলো চুপিচুপি আমাদের আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়......

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কৈফিয়তনামা

ভুল কাজ করে, ভুল কথা বলে সরকারকে বিব্রত করবেন না

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কৈফিয়তনামা

ভুল কাজ করে, ভুল কথা বলে সরকারকে বিব্রত করবেন না

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত