ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

সহকারী কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, যশোর

( ৩৭তম বিসিএস প্রশাসনে মেধা তালিকায় তৃতীয়)

সাবেক সহকারী সার্জন (৩৫তম বিসিএস )

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (২০০৮-০৯)


১৪ এপ্রিল, ২০২০ ০১:৩৭ এএম

করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অগ্রগতি কতদূর?

করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অগ্রগতি কতদূর?
ছবি: বিবিসি

আমরা জানি, করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯ বা কোভিড-১৯, Severe Acute Respiratory Syndrome Coronavirus 2 (SARS-CoV-2) নামক ভাইরাস দ্বারা ছড়ায়। করোনা সর্বপ্রথম ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আঘাত হানে চীনে এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।

২০২০ সালের ১১ই মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যাধিটিকে একটি বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। করোনাভাইরাস শব্দটি ল্যাটিন ভাষার ‘করোনা’ থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ ‘মুকুট’। এখন প্রশ্ন হলো করোনা কি তার নামের সাথে মিল রেখে মুকুট পরে এইভাবেই আমাদের বন্দি করে রাখবে এবং তিলে তিলে ধ্বংস করবে মানবসভ্যতা, নাকি আছে কোন পরিত্রাণ?

না বিজ্ঞানীরা বসে নেই। আপাতত গবেষণায় যে কয়েকটি পদ্ধতিতে এই মহামারী থেকে রক্ষা পেতে পারে বিশ্ব সেই পদ্ধতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. ভ্যাকসিন

যেহেতু কোভিড-১৯ একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এন্টিবায়োটিক দিয়ে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসার মত সহজ নয় তাই অবধারিতভাবে ভ্যাকসিনই এ রোগের বিরুদ্ধে বাজির ঘোড়া। ইতিমধ্যেই এ ক্ষেত্রে অনেকখানি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানি মডার্নার সংক্রামক রোগ সম্পর্কিত এক দল ও মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এমআরএনএ ১২৭৩ ( mRNA-1273)  নামের একটি ভ্যাকসিন তৈরি করে যা ১৬ মার্চ সিয়াটলের জেনিফার হলারের ওপর করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। জেনিফার হলারই বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি যার ওপর পরীক্ষামূলকভাবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। আপাতত এই ভ্যাকসিনটির ওপর পরবর্তী পরীক্ষাসমূহ চলমান আছে।

চীনের তিয়ানজিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যানসিনো বায়োলজিকস ও দেশটির অ্যাকাডেমি অব মিলিটারি মেডিকেল সায়েন্সেসের গবেষকরা একটি কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ভ্যাকসিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে চীনের সরকার।

অ্যাড ৫-এনকোভ নামের এই ভ্যাকসিন এরই মধ্যে প্রাণীর শরীরে পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে এটি নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। উহানের টংজি হাসপাতালে ১০৮ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এ পরীক্ষা চলমান আছে বলে জানা গেছে। ক্যানসিনো বায়োলজিকস চেয়ারম্যান জুয়েফেং উ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, এই ট্রায়াল সফল হলে একটি নিরাপদ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে চীন।

যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে যা প্রাণীদেহে কাজ করেছে বলে তারা দাবি করেছে। ইম্পেরিয়াল লন্ডন কলেজের অধ্যাপক রবিন শ্যাটক বলেন, প্রাণীর ওপর প্রয়োগের ফল বিবেচনায় নিয়ে মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হবে। আপাতত এটি মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছেন যা ইঁদুরের শরীরে প্রয়োগ করে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পিটার্সবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের শল্যবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রে গ্যাম্বোত্তো এক বিবৃতিতে বলেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসটির সঙ্গে সার্স এবং মার্স ভাইরাসটি গভীর সম্পর্কযুক্ত। এ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে স্পাইক প্রোটিন নামের একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন সম্পর্কে, যা করোনা প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পরীক্ষার ব্যাপকতার অভাবের কারণে এটি কতটা কার্যকর তা নিয়ে সন্দিহান গবেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনোভিও ফার্মাসিউটিউক্যালস গত মার্চে ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে আইএনও-৪৮০০ নামক এই ভ্যাকসিনটি তৈরী করতে ব্যাপক অর্থ সহায়তা করছে গেটস দম্পতির বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যেই প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।   

জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জায়ান্ট ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজার একসাথে এমআরএনএ(mRNA) ভিত্তিক একটি ভ্যাকসিন তৈরির ব্যাপারে একসাথে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। আরেক জার্মান কোম্পানি কিউরভ্যাকও এমআরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিন তৈরির জন্য কাজ করছে।

ইসরায়েল ভিত্তিক কোম্পানি মিগ্যাল মুরগীর ব্রংকাইটিস এর জন্য দায়ী অ্যাভিয়ান করোনাভাইরাসের সঙ্গে নভেল করোনাভাইরাসের সাদৃশ্যকে কাজে লাগিয়ে একটি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছে। শীঘ্রই মানুষের দেহে পরীক্ষা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মিগালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডেভিড জিগডন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সবমিলিয়ে প্রায় ২০ টির মত ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলমান আছে। তবে একটি পুর্নাঙ্গ ভ্যাকসিন হাতে পেতে হয়তো আরো ১৮ মাসের মত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

২. সলিডারিটি ট্রায়াল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৮ মার্চ ঘোষণা করেছে যে তারা সলিডারিটি ট্রায়াল নামক একটি গবেষণা পরিচালনা করবে। আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, কানাডা, ফ্রান্স, ইরান, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড এবং থাইল্যান্ড এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছে।

এই পরীক্ষাটিতে রিমডেসিভির, ক্লোরোকুইন এবং হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, রিটোনাভির/লোপিনাভির এবং ইন্টারফেরন বেটার সাথে রিটোনাভির/লোপিনাভির এর কম্বিনেশন ব্যবহার করে ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে।  

এই ড্রাগগুলোর কম্বিনেশন রোগীদের প্রয়োগ করে করোনা আক্রান্ত রোগীর ভেন্টিলেশন বা অক্সিজেন লাগছে কিনা, কখন সেরে উঠছেন বা মৃত্যুবরণ করছেন তা বিবেচনা করে এই কম্বিনেশনের কার্যকারিতা বিচার করা হবে। সলিডারিটি ট্রায়াল এখনও চলমান রয়েছে।

৩. অ্যাভিগান

ফাবিপিরাভির’ (Favipiravir) জাপানে আবিষ্কৃত এক প্রকার এন্টিভাইরাল ঔষধ। এটি প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন না। অর্থাৎ, এটি সুস্থ মানুষের দেহে রোগ সংক্রামণ প্রতিরোধ করে না। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হিসেবে এই ঔষধ বিভিন্ন দেশে পরীক্ষাধীন রয়েছে।

এই ঔষধটি ‘অ্যাভিগান’ (Avigan) নামে জাপানে বাজারজাত করা হয়। মার্চ মাসের শেষে অ্যাভিগান ঔষধ প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠান ফুজিফিল্ম, জাপানে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর উপর এই ঔষধের ৩য় ধাপ (Phase III) পরীক্ষা শুরু করে এবং এপ্রিলের ৯ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রে ২য় ধাপ (Phase II) পরীক্ষা শুরু করে।

এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ধাপগুলো প্রত্যেক রোগীর জন্য ১৪ দিন ধরে চলতে পারে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এপ্রিলের ৭ তারিখে দেশটির ১২০ জন রোগীর উপর অ্যাভিগান প্রয়োগে তাদের রোগের উপসর্গ নিরাময়ে ইতিবাচক ফলাফল পাচ্ছে বলে জানান। তবে গর্ভাবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাবের কারণে এই ওষুধ কতটুকু বাস্তবসম্মত হবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্যাটেন্টের আওতামুক্ত থাকায় এটি দেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে।

৪. প্যাসিভ অ্যান্টিবডি থেরাপি

করোনা আক্রান্ত হয়ে যারা সুস্থ হচ্ছেন তাঁদের দেহে একটা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যার মাধ্যমে তারা ভাইরাস থেকে মুক্ত হন। অন্য কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি সুস্থ হওয়া ব্যক্তির প্লাজমা দেওয়া হয় তবে সেই এন্টিবডি করোনা থেকে রক্ষা করবে।

র‌্যাবিস আক্রান্ত হলে বা হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে যেভাবে প্লাজমা দেওয়া হয়—এটা অনেকটা সে রকম। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এর আগে সার্স, মার্স, ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপও কমানো গেছে। কয়েকটি দেশে প্রাথমিক পরীক্ষায় এই পদ্ধতিতে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে এবং গবেষণা চলমান রয়েছে।

৫. হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity):

কমিউনিটি বা সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যখন কোন সংক্রমণ এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে উদ্ভূত প্রাকৃতিক এন্টিবডি অথবা ল্যাবে তৈরি ভ্যাকসিন দ্বারা সুস্থ হয়ে উঠে তখন সেই সমাজের হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠে যা সবাইকে সেই সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

দীর্ঘদিন করোনা সংক্রমণ চলতে থাকলে একসময় হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠার সম্ভাবনা প্রবল যা ভবিষ্যতে এই রোগ থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষা দেবে। করোনার কোন সম্পূর্ণ নিরাময় আবিষ্কার না করতে পারলে হার্ড ইমিউনিটিই হবে আমাদের একমাত্র ভরসা।

৬. অন্যান্য চলমান ড্রাগ ট্রায়ালসমূহ 


এছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসায় যেসব ওষুধগুলো নিয়ে গবেষণা চলমান আছে সেগুলো নিম্নরূপঃ                                                                                                  

-আইভারমেকটিন (ivermectin)

- হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন/ ক্লোরোকুইন (hydroxychloroquine or chloroquine)

- বেভাসিজুমাব (bevacizumab)

-Recombinant angiotensin-converting enzyme 2

- টোসিলিজুমাব (Tocilizumab)

- লেনজিলুমাব (Lenzilumab)

 পরিশেষে, সৃষ্টিলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান বেশিরভাগ সমস্যারই সমাধান করেছে। গবেষকরা আশাবাদী এই মহামারীর সমাধানও বিজ্ঞানের হাত ধরেই আসবে।

হয়তো দেরি হতে পারে কিছুকাল। ততদিন আমাদের কষ্ট করে পরস্পর থেকে দূরে থাকা থেকে শুরু করে বাকি স্বাস্থ্য পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে। ততদিন Stay home, Stay safe and maintain social distancing.

তথ্যসূত্র:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাকার্তা পোস্ট, বায়োসেঞ্চুরি ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত