ডা. ওয়াসিফ আদনান হক

ডা. ওয়াসিফ আদনান হক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সেশন: ২০০৭-০৮
রেজিস্ট্রার, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ।


১২ এপ্রিল, ২০২০ ০৩:৩৪ পিএম

যেসব কারণে করোনা রোগীরা তথ্য গোপন করতে চায়!

যেসব কারণে করোনা রোগীরা তথ্য গোপন করতে চায়!

গত বৃহস্পতিবার একজন রোগী দেখলাম বুকে ব্যথা আর চোখে অন্ধকার দেখার কথা বলে ইমার্জেন্সি হয়ে ভর্তি হয়েছেন। প্রথমে হার্ট-অ্যাটাক হতে পারে এরকম একটা চিন্তা ছিল। ইতিহাসও মোটামুটি মিলে যায়। কিন্তু কী ওষুধ খাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন ইনসুলিনের পাশাপাশি দুই দিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিক নিচ্ছেন। আমি তো শুনে আকাশ থেকে পড়লাম।

জিজ্ঞেস করলাম- ‘অ্যান্টিবায়োটিক  কেন?’ তিনি জানালেন- ‘দুই দিন ধরে জ্বর-জ্বর ভাব আর গলা ব্যথা।’ আর ততক্ষণে আমার রোগীর পরীক্ষা করা শেষ।

কোভিড-১৯ সম্পর্কে প্রচার ও প্রসারের জন্যে সবাই এখন কমবেশি জানেন এই রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ কী কী হতে পারে। এ নিয়ে আর বললাম না। তাই দেখা যাচ্ছে যে কারণেই হোক রোগীরা ঐসব লক্ষণ থাকলে বেমালুম চেপে যাচ্ছেন। এতে কার কী লাভ হচ্ছে জানি না। তবে সামগ্রীকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবাই। এভাবে তথ্য গোপন রোগী, রোগীর স্বজন, পাশের রোগী, ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবীসহ সবাইকেই মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দিচ্ছে।

রোগীরা কেন ডাক্তারদের কাছে কোভিড বিষয়ক তথ্য লুকাচ্ছে, আমার মনে হয় সেটা নিয়ে এখনই কাজ করা উচিত। তারা কি হার্ট-অ্যাটাক হলে বুকে ব্যথার কথা লুকান? তাহলে এখন কেন কেউ জ্বর কাশি শ্বাসকষ্টের কথা বলতে চাচ্ছেন না? আমার যেটা ধারণা:

১. প্যান্ডেমিক ম্যানেজমেন্টের প্রথম যে ধাপ, পাবলিক এওয়্যারনেসে আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে। কেন সঠিক তথ্য দেয়া জরুরী আর না দিলে কি কি ক্ষতি হবে (নিজের, পরিবারের, হেলথ টিমের) এটা কি আমরা বোঝাতে পেরেছি? কোভিড ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে। কাউকে কনফার্মড ডায়াগনোসিস করতে পারলে সে তার পরিবার থেকে দূরে থেকে তাদের নিরাপদ রাখতে পারে। এই কথাগুলো কি আমরা যথেষ্ট হাইলাইট করেছি?

আমি এক্সপার্ট  না। কিন্তু আমার মনে হয় টিভি, টকশো, এড, হাসপাতালের গেট, বাজার সব খানে এটা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা উচিত।

২. মানুষ কোভিডকে এইডসের মত স্টিগমা বানিয়ে ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে অনলাইন কোর্স ছিল, ওটাতে বারবার স্বচ্ছতার কথা বলেছিল। আমরা করেছি এর উল্টা। নাম বলা যাবে না, বললে এলাকা লকডাউন হবে। (এর প্রয়োজন আছে অবশ্য)। কোভিড রোগী দেখলে ডাক্তারদের বাসা থেকে বের করে দিতে হবে। এলাকায় হাসপাতাল করা যাবে না। দাফন করা যাবে না। এগুলো সবই কি সোশাল স্টিগমা বা ট্যাবু থেকে আসেনি? এটা কিভাবে দূর করা যায়?

৩. কোভিডের লক্ষণ বললে নন-কোভিড হাসপাতাল থেকে রেফার করে দেওয়া হয়। এজন্যই সম্ভবত বেশির ভাগ রোগী লক্ষণ গোপন করে। কিন্তু সেটা কেন করা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত কেউ কি কোথাও ঠিকমত বলেছে বা প্রচার করেছে? কোভিডের চিকিৎসা যে নন-কোভিড হাসপাতালে সম্ভব না, কনফার্ম করার আগ পর্যন্ত সাস্পেক্টেড রোগিকে কেন আইসোলেট করা দরকার আমরা কি মানুষকে জানাতে পেরেছি?

৪. রোগীকে জনসাধারণের মাঝে না এনে প্রথমেই সঠিক জায়গায় রোগিকে পাঠানোর সবচেয়ে কার্যকরী মডেল এখন টেলিমেডিসিন। এই কনসেপ্টটা আমাদের জন্য অনেকটাই নতুন। এতে মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। কিন্তু সেটা আরো প্রচার করা কি জরুরী না? কেন এখন কোন ডাক্তারের চেম্বার খোলা সেটা না খুঁজে টেলিমেডিসিন সেবা নেওয়া কেন জরুরী আমরা কি জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?

৫. আমার শ্বশুরবাড়ির বিল্ডিংয়ে দুইজন কোভিড রোগি ধরা পড়ে। ঐ বিল্ডিং লক ডাউন করা হয়। রোগি দুইজনকে টেস্ট সেন্টার থেকে সরাসরি কোভিড হাসপাতালে নেয়া হয়। ওনারা জামাকাপড় নিয়ে যেতে পারেন নি। পরের দিন বাসা থেকে জামা চেয়ে পাঠালে এলাকাবাসী সেই চাওয়া সোজা নাকচ করে দেন। লকড ডাউন বাসা থেকে কাপড় দেয়া যাবে না। আমরা কি মানুষজনকে লকড ডাউন কোয়ারেন্টিন আইসোলেশন এসব কঠিন শব্দের প্রয়োগ শেখাতে পেরেছি?

৬. মারা গেলে জানাযা পাবে না- এই ধরনের একটা ভুল কন্সেপ্ট চালু হয়ে গেছে। শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা অনেক রোগি এই ভয়ে কিছুতেই জ্বরের কথা কবুল করেন না। কিন্তু WHO  এর স্পষ্ট সাইটে আছে, মৃত ব্যক্তির লাশ যথাযথভাবে প্যাকেজিং করে তার যথাযথ সৎকার সম্ভব। তবে এই অবস্থায় যারা সংস্পর্শে এসেছেন তাদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের কারণে জানাযায় সরাসরি অংশ নিতে পারবেন না। আর এমনিতেও এখন তিন মিটারের মাঝে থাকা নিষেধ। কিন্তু জানাযা হবে। দাফন হবে। এই কথাগুলি কি যথেষ্ট প্রচার হচ্ছে?

আপাতত আর মনে আসছে না। বিশেষজ্ঞগণ আরো ভাল জানবেন। সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমার মনে হয় যদি উপরের প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, রোগিরা কেন তথ্যগোপন করতে চাইবে না? আমাদের যদি মেডিকেল নলেজ না থাকতো, রোগি হিসেবে আমরা কি এতটা সততা দেখাতাম? এখন কোভিড ট্রান্সমিশনের সর্বশেষ ফোর্থ স্টেজে চলে আসছে। ওদিকে একের পর এক হাসপাতাল আর ডাক্তার কোয়ারেন্টিনে যাচ্ছেন। আক্রান্তও কম হচ্ছেন না। শুধুমাত্র রোগিদের তথ্যগোপনের কারণে। শুরুর দিকে বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস লুকাতো। এখন লুকায় রোগের লক্ষণ।

এই বিষয়গুলি নিয়ে এখন কাজ না করলে আর কবে?

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস