কর্নেল অব. অধ্যাপক ডা. জেহাদ খান

কর্নেল অব. অধ্যাপক ডা. জেহাদ খান

এমডি, এমসিপিএস, এফসিপিএস

এফআরসিপি (গ্ল্যাসগো, এফএসিসি (ইউএসএ)

পােস্ট ফেলোশিপ ট্রেনিং ইন কার্ডিওলজি (জার্মান ও ইন্ডিয়া)

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও কার্ডিওলজিস্ট এক্স ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, সিএমএইচ, ঢাকা।


০৭ এপ্রিল, ২০২০ ০৮:১৫ পিএম

চিকিৎসা বিজ্ঞান কোনো স্বপ্নে পাওয়া বিষয় নয়

চিকিৎসা বিজ্ঞান কোনো স্বপ্নে পাওয়া বিষয় নয়

সংক্রামক রোগ সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও প্যারাসাইট দ্বারা হয়ে থাকে। আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এইসব জীবাণু শনাক্ত করা যায় এবং তা সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করলে একই রোগ হয়। নতুন আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে একই জীবাণু আবার শনাক্ত করা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান কোন স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসা নয়। এটা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত জ্ঞান। যেমন- করোনাভাইরাসের জীবাণু রোগীর শরীর থেকে শনাক্ত করা যায়। এটি দেখতে মুকুটের মত। এমনকি রোগী হাঁচি কাশি দিলে ভাইরাস বহনকারী জলীয় কণাগুলো কিভাবে বাতাসে ছড়ায় তাও লেজার বিম দিয়ে দেখা যায়।

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও প্যারাসাইটজনিত সংক্রামক রোগ অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব। কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোন কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।

তবে রাসূল (দরুদ) আমাদেরকে আশার বানী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন- আল্লাহ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেননি। (বুখারী, কিতাবুত তিব্ব)

কাজেই এ রোগেরও চিকিৎসা অদূর ভবিষ্যতে আবিষ্কার হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, সুস্থ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য ঘরে অবস্থান করতে হবে। আর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আইসলেশান। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন তাইওয়ান, জাপান প্রায় সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র এ মহামারীর শুরুতে গুরুত্ব না দেয়ায় রোগে আক্রান্তের পরিসংখ্যান দেখুন: ১ জানুয়ারিতে ১ জন, ১ ফেব্রুয়ারিতে ৭ জন, ১ মার্চ ৭৪ জন এবং সেটা ১ এপ্রিলে গিয়ে দাঁড়িয়েছে- ১৯০০০০ জনে।

অর্থাৎ সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ২ মাসের মধ্যেই এটি মহামারী ধারন করবে আমাদের দেশেও।

রাসূল (সা) বলেছেন- কোন ব্যাক্তি যদি চিকিৎসা সম্পর্কে না জেনে চিকিৎসা করে তবে ভুল চিকিৎসার জন্য সে দায়ী হবে। (আবু দাউদ-দীয়াত অধ্যায়)

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, কেউ কেউ চিকিৎসা বিজ্ঞান না জেনে করোনার ব্যাপারে চিকিৎসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কেউ কেউ রাসূলের হাদিসের অপব্যাখ্যা করে বলছেন যে, সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই! কেউ কেউ বলছেন, বেশি বেশি মসজিদে জমায়েত হয়ে আল্লাহর দরবারে রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতে, তাতেই আশা করা যায় এই মহামারী থেকে আমরা মাফ পেয়ে যাব।

এ ব্যাপারে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি:

১. সপ্তম বা অষ্টম হিজরীতে দামেস্কের বড় বড় মুহাক্কিক আলেমদের কথা উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ গণজমায়েত করে। ঘণ্টা খানেক ধরে তারা প্লেগ মহামারী থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে অনেক কান্নাকাটি করে। এ সমাবেশের পর মহামারীতে মৃত্যুর হার কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

২. হিজরি ৮৩৩ সনে মিশরে প্লেগ মারাত্মক আকার ধারন করে। সাধারণ মানুষ আবার গনজমায়েত করে এই রোগ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে অনেক কান্নাকাটি করে। এ সমাবেশের আগে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন করে মারা যেত। আর এ সমাবেশ থেকে রোগটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল যে প্রতিদিন ১ হাজার জন মানুষ মারা যেতে লাগল।

সম্প্রতি দিল্লীর এক মসজিদে জনসমাগমের কারণে বেশ কিছু মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেন এবং অনেকের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পরে। আধুনিক চিকিৎসার সাথে দোয়ার সম্পর্ক কী এ ব্যাপারে একজন প্রখ্যাত তাফসিরকারক খুব সুন্দর আলোচনা করেছেন- রাসুল (সা) চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবহার করতে কখনো নিষেধ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, আল্লাহ প্রত্যেক রোগের ওষুধ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তোমরা রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ ব্যবহার কর।

রাসূল (সা) নিজেও লোকদেরকে কোন কোন রোগের ওষুধ বলে দিয়েছেন। হাদিস গ্রন্থসমূহে সংকলিত চিকিৎসা অধ্যায়ের কিতাবুত তিব্ব পাঠ করলে এ কথা জানা যেতে পারে। কিন্তু ওষুধও আল্লাহর হুকুম ও অনুমতিক্রমেই উপকারী হতে পারে। নয়তো ওষুধ ও চিকিৎসা যদি সব অবস্থায় উপকারী হতো তাহলে হাসপাতালে একটি রোগীও মরত না। এখন চিকিৎসা ও ওষুধের পাশাপাশি আল্লাহর কালাম ও তাঁর আসমায়ে হুসনা বা ভালো ভালো নাম থেকে যদি ফায়দা হাসিল করা যায়, তা কারো কাছে বিবেক বিরোধী মনে হবে না। তবে যেখানে চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, সেখানে জেনে বুঝেও তা গ্রহণ না করে শুধু দোয়া দরুদের উপর নির্ভর করা কোন ক্রমেই সঠিক পদক্ষেপ বলে স্বীকৃতি পেতে পারে না।

কেউ কেউ চিকিৎসা বিদ্যা না জেনেও করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা দিচ্ছেন। রাসূল (সা) এর কিছু হাদিসের বরাত দিয়ে তারা বলছেন যে, আজওয়া খেজুর বা কালোজিরা খেলে করোনা ভাইরাস আক্রমন করতে পারবে না।

মরহুম ড. ইউসুফ আল কারযাভি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ। তিনি তার সুন্নাহের সান্নিধ্যে নামক বইয়ে লিখেছেন- সুন্নাহকে বুঝতে সন্দেহ ও ভুলের যেসব কারণ ঘটে তা হচ্ছে এই যে, কিছু লোক স্থায়ী উদ্দেশ্য ও অস্থায়ী উপকরণগুলোকে গুলিয়ে ফেলে। উদাহরণ হচ্ছে সুন্নাহর কিছু ছাত্রের মধ্যে রাসূল (দরুদ) এর ওষুধ সম্পর্কে উদ্বেগ। যেমন- সর্বোত্তম ওষুধ হিসেবে যা তুমি ব্যবহার করতে পার তা হচ্ছে রক্তমোক্ষণ। (বুখারী, কিতাবুত তিব্ব) আরেকটি হাদিসে আছে, মৃত্যু ছাড়া এমন কোন রোগ নেই যা কালজিরায় নিরাময় হয় না।

এ ইসলামি চিন্তাবিদ আরো লিখেছেন আমি মনে করি এসব ব্যবস্থাপত্র রাসুল (সা) প্রদত্ত ওষুধের মর্ম নয়। বরং এর মর্ম হচ্ছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পীড়িত হলে চিকিৎসা। এর মর্ম এই যে, চিকিৎসা নেয়া তকদীরে বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়, না আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরশীলতার বিপরীত। এর অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা আছে যা নেয়া সুন্নাত। উপায় ও উপকরণ সময়ে পাল্টায় (যেমন- রক্তমোক্ষণের স্থান নিয়েছে আধুনিক চিকিৎসা) কিন্তু উদ্দেশ্য একই রয়ে গেছে। সুন্নাহের সান্নিধ্যে, ড. ইউসুফ আল কারযাভি।

বর্তমানে করোনাভাইরাস চিকিৎসার উপায় ও উপকরণ হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নীতিমালা, ঘরে অবস্থান, সংক্রমিত রোগীকে চিকিৎসা ও আইসলেশান। কাজেই এই নীতিমালা না জেনে কেউ যদি মানুষকে আরও সমবেত হতে বলে দোয়ার জন্য তাহলে এই ভুল চিকিৎসার জন্য রাসুলের (দরুদ) হাদিস অনুযায়ী তিনি নিজেই দায়ী হবেন।

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত