ডা. কাওসার আলম

ডা. কাওসার আলম

মেডিকেল অফিসার ও রেসিডেন্ট, কার্ডিওলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


০৪ এপ্রিল, ২০২০ ১২:৩৭ পিএম

শ্বাসকষ্ট-জ্বরের রোগীদের চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ, আসলে দায় কার?

শ্বাসকষ্ট-জ্বরের রোগীদের চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ, আসলে দায় কার?

একজন মুক্তিযোদ্ধা ডায়রিয়া ও জ্বরে ভোগছিলেন সাথে একটু কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। তাঁর ছেলেমেয়েরা পাঁচটি হাসপাতালে ১৬ ঘণ্টা ঘুরে বাবাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারেনি। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পাননি আর এ কারণেই মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর সবাই জানলেন উনার কোভিড-১৯ এর আরটি পিসিয়ার পরীক্ষাটি নেগেটিভ ছিল। প্রকৃতপক্ষে উনার মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ। এই মৃত্যুর দায় কার—চিকিৎসকের, স্বজনদের, নাকি সরকারের?
  
দুইদিন আগে একজন চিকিৎসকের মা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। তিনি ক্রনিক কিডনি ডিজিসে ভুগছিলেন। হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো চিকিৎসক রোগীকে এটেন্ড করেনি। চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও কোনো হাসপাতালের চিকিৎসক তাঁকে একটু অক্সিজেন দিতেও রাজি হননি।  

তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগীরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। শ্বাসকষ্টের একজন রোগী সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন, নেবুলাইজেশন ও অন্যান্য চিকিৎসা পাবেন—এটাই একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন চিকিৎসকের মা যদি শ্বাস কষ্ট নিয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান, তাহলে এদেশের কামার কুমার, জেলে তাঁতিরা তথা সাধারণ মানুষ কিভাবে এই পরিস্থিতিতে শ্বাসকষ্ট বা জ্বরের চিকিৎসা পাবেন? 

শ্বাসকষ্ট মানেই করোনা রোগী নয়

শ্বাসকষ্ট হলেই কাউকে করোনা আক্রান্ত রোগী ভাবা কোনোভাবেই ঠিক নয়। শ্বাসকষ্ট উপসর্গটি অনেক রোগের কারণে হতে পারে। হাপানি, ক্রনিক পালমোনারি অবস্ট্রাকটিভ ডিজিস, হার্ট ফেইলিউর, ক্রনিক কিডনি ডিজিস, এমনকি অতি মাত্রায় রক্তশূন্যতা থেকেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। করোনা ছাড়া অন্য শ্বাসকষ্টের রোগীরা কি বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসা পাওয়ার কোনো অধিকার রাখেন না? 

এই অব্যবস্থাপনার নেপথ্যে 

শ্বাসকষ্টের রোগীরা চিকিৎসা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। কিন্তু কেন চিকিৎসা পাচ্ছেন না, কোথায় সেই অব্যবস্থাপনার কথাগুলো তুলে ধরতেই আজকের লেখাটি।

প্রথমে আসি শ্বাসকষ্টের কোন রোগীদের করোনা আক্রান্ত রোগী হিসেবে সন্দেহভাজন তালিকায় রাখবেন চিকিৎসকরা?

১. যদি কোনো রোগীর জ্বরের সাথে শ্বাস কষ্ট থাকে এবং গত ১৪ দিনের মধ্যে বিদেশ গমনের কোনো ইতিহাস থাকে বা বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে থাকেন বা করোনা পজিটিভ কোনো রোগীর সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে তিনি করোনার একজন সন্দেহভাজন রোগী। 

২. বিদেশ গমনের কোনো ইতিহাস নাই বা কোভিড-১৯ এর রোগীর সঙ্গে সংস্পর্শের কোনো ইতিহাস নাই। অথচ জ্বরের সঙ্গে কাশি বা শ্বাসকষ্ট আছে এবং তার জ্বর ও কাশির তীব্রতা এমন যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে এবং এই শ্বাসকষ্ট অন্য কোনো রোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না তাহলে তাকে কোভিড-১৯ এর সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
  
সন্দেহভাজনরা কোথায় চিকিৎসা পাবেন? 

এবার আসি এই সন্দেহভাজন রোগীরা কোথায় চিকিৎসা পাবেন? কোভিড-১৯ এর সন্দেহভাজন রোগীরা ইমারজেন্সিতে এলে তাদের রোগের ইতিহাস দেখে, পরীক্ষা করে যদি সম্ভব হয় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঠানো হবে। আইসোলেশন ওয়ার্ড থেকে তার কোভিড-১৯ সংক্রান্ত পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল কালেকশন করে পাঠাতে হবে। কোভিড-১৯ এর পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে ৪-৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ক্ষেত্র বিশেষে ৪৮ ঘণ্টা সময়ও লাগতে পারে। এই সময় রোগী আইসোলেশন ওয়ার্ডে যথারীতি নিয়মে চিকিৎসা পাবেন। যদি কোভিড-১৯ টেস্ট পজিটিভ হয় তাহলে তাকে অবশ্যই কোভিড-১৯ পজিটিভ ওয়ার্ডে পাঠানো হবে। 

কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসা হয় কুয়েত মৈত্রী আর কুর্মিটোলা এই দুইটি হাসপাতালে। বাকি হাসপাতালগুলো প্রস্তুত হচ্ছে। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড নেই যেসব রোগীদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়েছে এবং রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে কেবল তারাই এই হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন। আর যদি কোভিড-১৯ টেস্ট নেগেটিভ হয় তাহলে রোগীর জটিল কোনো সমস্যা না থাকলে তাকে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হবে। যদি জটিল সমস্যা থাকে তাহলে তাকে আইসোলেশন কেবিনে স্থানান্তর করতে হবে। 

জ্বর-কাশির রোগীরা কোথায় চিকিৎসা পাবেন? 

এবার আসি জ্বর ও কাশির রোগীরা কিভাবে চিকিৎসা পাবেন? কোথায় চিকিৎসা পাবে?

যাদের জ্বর বা কাশি থাকবে তারা সরকারি, বিএসএমএমইউ ও বেসরকারি সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কিছু হটলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে বাসায় চিকিৎসা নিবেন এবং ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।  

এ ক্ষেত্রে তারা যে ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন: 

জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল, 
কাশির জন্য এন্টি হিস্টামিন, 
বেশি করে পানি পান করা। 
 
হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় যদি নিম্নোক্ত উপসর্গ সমূহ থাকে, যেমন: 

ক. শ্বাসকষ্ট হয়, 
খ. জ্বর ও কাশির মাত্রা বেড়ে যায়, 
গ. আবোল তাবোল কথা বলেন, 
তাহলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।  

করোনা মহামারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়ে প্রতিদিন ৩০-৩২ হাজার মানুষ মারা যান বলে ধারণা করা হয়। আর এখন প্রতিদিন প্রায় সারা বিশ্বে ৪-৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। এভাবে যদি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে তাহলে এই ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতাকেও হার মানাবে। 

এই যুদ্ধটি আসলে একটি ভাইরাসের সাথে সমগ্র মানবজাতির যুদ্ধ। এখানে কেউ কাউকে দোষারোপ করে রেহায় পাওয়ার উপায় নেই। জনগণকে সচেতন থাকতে হবে, যাতে রোগটি আমরা সহজে প্রতিরোধ করতে পারি। আবার কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে কখন টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিবেন, কখন হাসপাতালে ভর্তি হবেন। 

আর কোন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে কি কি করবেন—এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে সম্মক ধারণা থাকতেই হবে। তেমনিভাবে চিকিৎসকদের উচিত সকল ধরণের পিপিই নিয়ে রোগীদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসা, কোভিড-১৯ ছাড়া অন্যান্য রোগের মৃত্যুহার যাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে না যায়। যাতে কোনো স্বজনের মনে আক্ষেপ না থাকে আমার প্রিয়জন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়। 

চিকিৎসকদের উৎসাহ প্রদান করা, আর জনগণকে সচেতন করার মুখ্য ভূমিকা সরকারকেই নিতে হবে। আমাদের দেশে সরকার, চিকিৎসক, জনগণ কেউ কারো জন্য বোঝা না হয়ে সবাই তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেই কেবল এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব।
 

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত